সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / ভ্রমণ / ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে একদিন
০২/২০/২০১৯

ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে একদিন

- নাহিয়ান ইসলাম

বাঙালি জাতির মননে আমাদের মহান ভাষাআন্দোলন বেশ গুরুত্বপূর্ণ একস্থান দখল করে আছে। বিশ্বের একমাত্র জাতি হিসেবে ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলাম আমরা। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসেও এর অবদান অনস্বীকার্য। পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে অধিকার আদায়ের স্পর্ধা সে ভাষা আন্দোলনই তো দিয়েছিল আমাদের! ভাষার জন্য আমাদের এ অনন্য অর্জনকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজে রয়েছে ভাষাআন্দোলন জাদুঘর।


জাদুঘরটি উদ্বোধনের দশম বছরে পদার্পণ করলেও লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে খানিকটা নিভৃতেই নিজের বুকে আগলে রেখেছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিগুলোকে। এর সিংহভাগ দায় প্রচার বিমুখতার। জাদুঘরটি সম্পর্কে আগ থেকে না জেনে বাংলা একাডেমিতে পা রাখলে হয়তোবা না তার দর্শনলাভের আগেই ফিরে আসতে পারেন। জাদুঘরটির উপস্থিতি জানান দিতে এর আশপাশে কিংবা বাংলা একাডেমিতেও নেই কোনো নির্দেশক কিংবা সাইনবোর্ড।

জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত আছে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র-জনতার বিভিন্ন মিছিল ও তাতে বাধা দিতে উদ্ধত পুলিশ বাহিনীর আলোকচিত্র, রেসকোর্স ময়দানের সমাবেশে বক্তৃতারত মুহম্মদ আলী জিন্নাহর আলোকচিত্র এবং তৎপরবর্তী বিক্ষুব্ধ বাংলার চিত্র, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের প্রেসবিজ্ঞপ্তি, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের অংশবিশেষ, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতির আলোকচিত্র, ভাষাশহিদদের পূর্ণ পরিচিতি এবং স্মারকবস্তু, প্রথমশহিদ মিনারের আলোকচিত্র।
চার কামরাবিশিষ্ট এই জাদুঘরের আবছা আলোয় ঐতিহাসিক সব আলোকচিত্র, প্রচারপত্র, সংবাদপত্রের অংশবিশেষ, পুস্তিকার প্রচ্ছদ, ভাষাশহিদদের বিভিন্ন স্মারকবস্তু এবং চিঠিপত্র নিমিষেই দর্শনার্থীদের বায়ান্নোর উত্তাল ফাগুনে ভাষা আন্দোলনের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে দেয়।

এখানে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন কবিদের ভাষাচিন্তার ফসল যা পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের মননে ভাষাগত চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। আছে ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বাংলাভাষা নিয়ে বাঙালি মুসলিমদের দ্বন্দ্বের ইতিহাস নিয়ে প্রবন্ধ যেখানে বিশ্বকবি লিখেছিলেন, যদি বাংলাকে কোণঠাসা করে উর্দু চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে তা বাঙালিদের জিহ্বা কেটে নেওয়ার সমান হবে। সমকালীন এবংপূর্বতন কবি-সাহিত্যিকদের এমন রচনায় উদ্দীপ্ত হয়েই ভাষা আন্দোলনের অনন্য ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। এছাড়াও এখানে মাহবুবুল আলাম চৌধুরীর সেই ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার হস্তলিখিত কপি, ১৯৫২ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে কবি আলা উদ্দিন আল আজাদের হস্তলেখা কবিতা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা প্রথম গানসহ আরো অনেক রচনার আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে ভাষাআন্দোলন জাদুঘরে।

মাত্র চারটি কক্ষ নিয়ে গঠিত হওয়ায় স্থানসঙ্কুলানের অভাবে অনেক আলোকচিত্র সংরক্ষণ করে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি এখানে।
জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মচারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ফেব্রুয়ারি ছাড়াও নিয়মিত চলে এর প্রদর্শনী। মজার ব্যাপার হলো, ফেব্রুয়ারিতে প্রদর্শনীর সময়সীমা বিকেল তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত হলেও বছরের বাকি সময়টায় বাংলা একাডেমির স্বাভাবিক সময়সীমা মেনেই চলে ভাষাআন্দোলন জাদুঘরের প্রদর্শনী। তবে দর্শনার্থীর অভাবের কথাটিও ফুটে উঠল তাদের বক্তব্য।
তবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে এই জাদুঘরের স্কুল-কলেজভিত্তিক আলাদা কোনো প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেই বলেও জানা গেল। অথচ নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা আন্দোলনের স্বরূপ, এর নেপথ্য গল্প ছড়িয়ে দেয়া এবং আমাদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলনের দারুণ প্রভাবের বিষয়টি ভাববার উদ্দীপনা সৃষ্টি করিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব বাংলা একাডেমি এড়িয়ে যেতে পারে না কোনোভাবেই। দর্শনার্থীদের জাদুঘরমুখী করে তাদেরকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আগ্রহী করতে বাংলা একাডেমির আরও জোরদার ভূমিকাই কাম্য।



ছবি : ফুয়াদ তানভির অমি