শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / ফিচার / একুশের ফুলগুলো কোথায় যাবে
০২/২০/২০১৯

একুশের ফুলগুলো কোথায় যাবে

তাই নিয়ে যত ভাবনা

- মালেকা খান

একুশে ফেব্রুয়ারি মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসায় ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহিদমিনারের পুরো বেদিটা। নানারঙের ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে বেদির বুকে আঁকা হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। মানচিত্র ঘিরে থাকে ফুলের আল্পনায়। কিশোর তরুণরা দুহাতে অঞ্জলিভরে পুষ্পার্ঘ নিবেদনের মধ্যে আঁকছে মনের মাধুরী মিশিয়ে বিচিত্র ফুলের আল্পনা। একুশে ফেব্রুয়ারি আসে বাংলার ফাল্গুন মাসে। ২০শে ফেব্রুয়ারিতে ফাল্গুনের হিমেল সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত চলে নিবেদিতভাবে শহিদমিনারকে বর্ণে-ছন্দে সাজানোর প্রচেষ্টা। যদিও শান্তি-প্রশান্তির প্রতীক সাদা রং; প্রয়াত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবার প্রতীক সাদা রং, কিন্তু যখন একুশ আসে ফাল্গুনে, ধরিত্রী তখন নানান রঙে সজ্জিত। গাছে গাছে রঙিন ফুল। একুশের জন্য বাংলাদেশের মানুষ ফাল্গুনের যত রঙের ফুল ফোটে তা সব এনে ঢেলে দিতে চায় শহিদমিনারের বেদিতে। ভাষার জন্য লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া বাঙালির যে কত বড় ত্যাগ, এ যে কত বড় সাংস্কৃতিক চেতনার ঐশ্বর্য তা দেখে পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে বসবাসকারী বাঙালি অহংকারবোধ করে থাকে। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে বাঙালির এই প্রত্যয় দেখে, ছোট দেশটার মানুষের সাহস দেখে। দেশটার মানুষের মাতৃভাষার প্রতি ভক্তি দেখে।

আমি ১৯৫২ সনের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি আমার স্কুল ঢাকার অভয় দাস লেনের কামরুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ছোটখাট ছিলাম বলে মিছিলের সামনের দিকেই ছিলাম। অভয় দাস লেন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা পর্যন্ত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, স্লোগানে মুখরিত ছিল আমাদের মিছিলটি। পথের দুধারের মানুষ করতালি দিয়ে উৎসাহিত করছিল আর আমাদের সঙ্গে, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করছিল বাতাস, একাত্মতা ঘোষণা করছিল ছাত্রীদের প্রতিবাদের সঙ্গে। সে এক অবিশ্বাস্য চেতনার উন্মেষ ঘটানোর স্মৃতি। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সংস্কৃতিমনা করে গড়ে তোলার জন্য একটি দিক-নির্দেশনা। কিশোর বয়সে আমরা এই মহান আন্দোলনে শরিক হতে পেরেছি, যা সারাজীবনের জন্য গর্ব হয়ে আছে। একুশ আমাদের জন্য অনেক কিছু। একুশ যেন আমার চেতনার উন্মেষ ঘটানোর একটি রবির কিরণ। আমার একান্ত বিশ্বাস একুশ মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে। ফুলে ফুলে ঢাকা শহিদমিনারটি ও একুশে যেন মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে।
শহিদমিনারের একুশের ফুলগুলো নিয়ে আমার রাজ্যের ভাবনা। আমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সুবাদে দীর্ঘ সময় ফুলার রোডে থাকার সুযোগ হয় আমার, সেই সময় খুব কাছে থেকে দেখেছি একুশের পর পবিত্র ফুলগুলোর কি অসহায় আর করুণ অবস্থা।
কৈশোরে নগ্নপায়ে প্রভাতফেরিতে শহিদমিনারে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করেছি পাড়ার বড়ভাই বোনদের সঙ্গে। সকলের হাতে থাকত বাগান থেকে সংগ্রহ করা দুতিনটে ফুল। বেশ কয়েক বছর ধরে একুশের ফুলগুলো নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি। নানাস্বপ্ন আমার ভাবনা ঘিরে থাকে।
একুশের সারাদিন সারারাত আনসার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডেট দল, স্কাউট, পুলিশ শহিদমিনারকে পাহারা দেবে। কেউ যেন ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি না করে। একুশে মানুষের ভালোবাসা যেমন ছিল তেমনি থাকবে অন্তত ২২শের দুপুর পর্যন্ত। পাহারাটা দেবে এমনভাবে ১২টা থেকে ৬টা, ৬টা থেকে ১২টা, আবার ১২টা থেকে ৬টা এমনি করে শেষ হবে একুশের দিনটা।

২২-শে ফেব্রুয়ারি থাকবে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ফুলগুলোকে বিদায় জানাবার পালা। বিকেল ৩.০০টায় শহিদমিনার থেকে সোহারাওয়ার্দী সবুজ উদ্যান পর্যন্ত পথের দু’ধারে নীরবে মানববন্ধন করে দাঁড়াবে ছাত্র-ছাত্রী ও জনতা। ২২শে ফেব্রুয়ারি ভোরে পাশের সোহরাওয়ার্দী সবুজ উদ্যানের একপাশে লম্বা করে তিন থেকে পাঁচটা (ফুলের পরিমাণের উপর) ট্রেঞ্চ কাটা হবে। একুশের ফুলের সমাধি হবে সেখানে। বেলা ৪.০০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্য তার দল নিয়ে উপস্থিত থাকবেন শহিদমিনারে। ধীরে ধীরে ৩টা-৪টা ট্রাক আসবে। ট্রাকে থাকবে বাঁশের ঝুড়ি। বাঁশের ঝুড়ি ভরে ভরে ক্লান্ত বৃন্তচ্যুত ফুলগুলো ট্রাকে তোলা হবে। উপাচার্য ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে থাকবে আনসার, ক্যাডেট, স্কাউট, পুলিশ সদস্য তারা সকলে ফুলগুলোকে স্যালুট করে দাঁড়িয়ে থাকবেন ততক্ষণ, যতক্ষণ না ধীরে ধীরে ট্রাকগুলো এগোবে সোহরাওয়ার্দী সবুজ উদ্যানের দিকে। সোহরাওয়ার্দী সবুজ উদ্যানে নগর প্রধান সুশৃঙ্খল একটি দল নিয়ে দাঁড়াবেন স্যালুট দিয়ে। ট্রাকে করে ঝুড়ি ভরে ভরে আনা ফুলগুলো ঢেলে দেওয়া হবে ট্রেঞ্চে। এই কাজটি ক্যাডেট, স্কাউট, গাইড ও স্বেচ্ছাসেবকের দল অনায়াসে ভক্তিভরে করতে পারবে। ট্রেঞ্চ কয়টি ফুলে ফুলে ভরে গেলে মাটিচাপা দেওয়া হবে। বিউগলের অন্তিম সুর বাজানো হবে। সেই সঙ্গে শেষ হবে একুশের শ্রদ্ধাঞ্জলির পুরো আনুষ্ঠানিকতা। এ-দৃশ্য দেখতে ছাত্র জনতা নীরবে আর সুশৃঙ্খলভাবে। যে-ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে ভাষার জন্য রক্ত ঝরানো শহিদ ভাইদের প্রতি সে পবিত্র ফুলগুলোও শ্রদ্ধার সঙ্গে বিদায় নেবে। একদিন আপামর জনতার কাছেও এ বার্তা চলে যাবে। মানুষের অন্তরে সাংস্কৃতিক চেতনা জাগরুক করার একটি নক্ষত্র হয়ে জ্বলতে থাকবে একুশের আনুষ্ঠানিকতার শেষ এই পর্বটি। প্রতিটি বাঙালি যতœবান হবে মাতৃভাষার প্রতি।
আমি এই স্বপ্নই দেখি একুশের পুষ্পাঞ্জলি নিয়ে। একুশের ফুলগুলো কোথায় যাবে তাই নিয়ে আমার যত ভাবনা।
আমার ভাবনা, সবার হাতে যেন অন্তত একটি ফুল থাকে। হুড়াহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি করে নয়, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নীরবতা রক্ষা করে যেন পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। যে একুশ আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে, তার জন্য। আবার আরেকটি একুশের জন্য অপেক্ষা করব। ততদিনে নতুন ঘাসে ছেয়ে যাবে সোহরাওয়ার্দী সবুজ উদ্যানের ফুলের সমাধিগুলো। ফুলগুলো মাটিতে মিশে যাবে ছয় ঋতুর আবর্তনে। একুশের ফুলকে এইভাবে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কোনো জমি বন্দোবস্ত বা একোয়ার করা লাগবে না। শুধু চাই একটু মানসিকতা।
একুশের ফুল নিয়ে খোকাখুকুরা ছড়া বানাবে, কবিতা লিখবে, রচনা লিখবে। প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দলবেঁধে মাঝে মাঝে আসবে সোহরাওয়ার্দী সবুজ উদ্যানে। একুশের ফুলগুলোর মানুষের হৃদয়ে ভক্তি-শ্রদ্ধা ভালোবাসা জাগানোর প্রতীক হয়ে থাকবে। এ-আমার স্বপ্ন, এ-আমার ভাবনা।
আর অপেক্ষায় থাকব আরেক ফাল্গুনের জন্য, আরেক একুশের জন্য।