শুক্রবার,১৯ Jul ২০১৯
হোম / ফিচার / মায়ের কাছেই শিখুক মায়ের ভাষা
০২/২০/২০১৯

মায়ের কাছেই শিখুক মায়ের ভাষা

-

আজকাল মায়েরা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য ভীষণ উদ্বিগ্ন থাকেন। কেবল মায়েদের কথা বলছি কারণ উদ্বিগ্ন বাবা তেমন একটা দেখিনি। বাচ্চা যত ছোট উদ্বেগের মাত্রাও যেন তত ব্যাপক। তার উপর ‘আমার সন্তান তো বাংলা তেমন বলতে পারে না’ এক ধরনের নকল অহংবোধে আক্রান্ত বর্তমান বাবা-মায়েরা।
একজন মা তাঁর সন্তানকে স্কুলে দেবার আগে থেকেই ইংরেজি জ্ঞানে পরিপক্ক করে তোলার পণ করেছেন। স্বামী বাজার থেকে মাছ এনেছেন তা নিজের তিন বছরের মেয়েকে ডেকে বলছে, ‘দেখো দেখো, এটা হলো ফিশ’। অথবা রাস্তা দিয়ে যাবার সময় গরু দেখা গেল, ‘দেখো বাবু কাউ,কত সুন্দর কাউ’ আরেকদিন গাড়ির সামনে ছাগল পড়ল, বলে, ‘দেখো ওগুলো গট গট’। যদিও নিজের বাংলা উচ্চারণই শুদ্ধ নয়, কিন্তু বাচ্চাকে ইংরেজিতে পারদর্শী করতে চিন্তার শেষ নেই। একদিন দুঃখ করে বলছে, এত কিছুর ইংরেজি নাম আছে আপেলের ইংরেজি নামটা পেলাম না কোথাও। আপেলের ইংরেজি না পেয়ে অবাক হই না। অবাক হই এই প্রবণতাটা দেখে।
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এসব উদ্বিগ্ন কথোপকথন কিছুক্ষণ শুনলে আপনার মনে হবে দেশে আর যত সমস্যা আছে সব নস্যি। শিশুদের বিদ্যাসাগর বানাবার উপর কোনো কথা নাই। অন্য জ্ঞান যাই হোক, বাচ্চার কচিমুখ দিয়ে যদি ফট ফট করে ইংরেজি কথা না বেরোয়, চলবেই না। যার ফলে সঠিক বা শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে পারা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে চলার মতো বাংলাটাও আমাদের সন্তানরা এখন ঠিকমতো বলতে পারে না। ভাষার মাসে যখন আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলছি, ভালোবাসা-শ্রদ্ধা দেখাচ্ছি, তখন কি একটু ভাবতে বসেছি আমাদের সন্তানরা কী শিখছে? কতটুকু শিখছে?

চার বছরের রঙ্গন বাবাকে কাজে সাহায্য করছে,আর মুখে বলছে ‘যবষঢ় সু ঢ়ধঢ়ধ’ বাবা জিজ্ঞেস করল ‘হেল্প’ কি রঙ্গন? ‘মদদ’ বাবা। হেল্পের বাংলা প্রতিশব্দ জানেই না এই শিশুটি। এমন ঘটনা এখন প্রায় পরিবারেই দেখা যাচ্ছে। কারণ, প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর পরিবর্তে হিন্দি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান বেশি দেখেন মায়েরা। শিশুদেরও হিন্দি কার্টুন চ্যানেলগুলো দেখতে দেন আর এতে হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি মিশ্র ভাষায় কথা শিখছে শিশুরা। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বাংলা ভাষা শিক্ষার গুরুত্বহীনতা, দায়িত্ববোধের অভাব ইত্যাদি নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
শুদ্ধ ভাষায়,শুদ্ধ উচ্চারণ এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর প্রথম পর্ব বাড়ি থেকেই শুরু করা উচিত। এ ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। যদি পরিবার এ দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তবে শিশুটি পরবর্তীসময় তার শিকড়কে ভুলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। বাড়ির পরিবেশ সেভাবেই তৈরি করতে হবে। মাকে বুঝতে হবে সুন্দর করে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলাটাও কিন্তু যোগ্যতা। নিজ ভাষা না জানলে একটা শূন্যতা সব সময়ই থেকে যাবে, তা সে যতই অন্য ভাষায় পারদর্শী হোক না কেন। এক্ষেত্রে ছুটির দিনে শিশুকে ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শহিদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, বইমেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো দেখাতে নেওয়া উচিত। বাসায় মাঝেমধ্যে সিডিতে বাংলা কবিতা, শিশুতোষ গান ছেড়ে রাখলে অবচেতন মনেই বাংলার প্রতি আকর্ষণ বাড়বে। এছাড়া মায়েরা প্রতিদিন শিশুকে বাংলা ছড়া, গল্প ও কবিতা পড়ে শোনাতে পারেন। পরিবারের মাঝেই শুদ্ধ বাংলাচর্চার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া আমাদের বিদ্যমান বাংলা স্কুলগুলোর মান উন্নত করতে হবে। ইংরেজি স্কুলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা কারিকুলাম রাখতে হবে। যে জ্ঞান ১০ বছর বয়সে পেলেও চলে, সেটা পাঁচ বছর বয়সি বাচ্চাকে ঠেসে কেন গেলাতে হবে। তাই শিশুদের পাঠ্য তালিকা থেকে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পড়াশোনা বাদ দিতে হবে। সবগুলো স্কুলের কারিকুলাম এক হতে হবে। এক দেশে নানা জাতের বিদ্যাসাগর বানানোর চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। শিশুর মুখে ফুটুক শুদ্ধ বাংলা, বেড়ে উঠুক বাংলা চর্চার মাঝেই, আর সে চেষ্টা শুরু হোক বাড়িতেই, মায়ের কাছেই।

-রিয়াদ খন্দকার