সোমবার,২৭ মে ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / চুরির ফজিলতনামা বা অপূর্ব কিচ্ছা
০১/১৫/২০১৯

চুরির ফজিলতনামা বা অপূর্ব কিচ্ছা

-

প্রিয় পাঠক, কেমন আছেন? সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে কিছু চুরিটুরি যাওয়ার ব্যাপারের মধ্যে পড়েছেন কি? খোয়া গেছে কিছু?
এই যেমন, মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগ বা ল্যাপটপ বা ঘরের ভেতরে সযতনে রাখা আধুনিক রকমে তৈরি করা টিভিটা, চুরি গেছে কি?
বা হৃদয়ের লকারটা থেকে দামি কয়েক ডজন দীর্ঘ্শ্বাস, বা আপনার চোখে দেখা দেয়া হঠাৎ খুশির ঝলকটা বা আবার নতুন করে জেগে ওঠার সাধটা, খোয়া যায়নি নিশ্চ্য়ই?
আছে সবকিছু ঠিকঠাক? যদি ঠিক থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। লোকচক্ষে আপনি অতি ভাগ্যবান। কারণ আপনি খোয়ানি যাবার যাতনার মধ্যে নেই। আপনার সব ঠিক আছে। বাহ!
আমিও ঠিক আছি!
না নাÑ ভুল বললাম! ঠিক ছিলাম! তবে আজকে তিনদিন হয়, আমার দুইশো টাকা চুরি গেছে! যদিও আমি এখনো মনস্থির করতে পারি নি, এটাকে চুরি বলবো –নাকি খোয়ানি বলবো! তবুও আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে চুরি কথাটাই লাগালাম এইখানে।
কেমনে কী ঘটলো, সেই কথা বলার জন্য্ই এতো কথা বলা!
হয়েছে কী, তিনদিন আগে; একটা কাজে আমাকে নারায়ণগঞ্জে যেতে হয়েছে। যেখান কাজটা ছিল, সেই জায়গাটা টাউন থেকে অনেকদূরে। অনেকটা পথ রিকশায় গিয়ে, তারপর অনেকখানি হাঁটাপথ পার করে, তবে যদি সেইখানে পৌঁছুনো যায়।
যাবার বেলায় গেছি সুভালাভালি। বেলা এগারোটায়, নারায়ণগঞ্জ্ টাউনের দুই নম্বর গেটে বাস থেকে নেমে, রিকশা পেতে কোনো সমস্যা হয় নি। হাঁটাপথও পেরুনো গেছে সুন্দর ঢিলামি দিয়েই।

কিন্তু ফেরার পথেই ঘটতে থাকে হিসাব ছাড়া সব গ্যাঞ্জাম।
প্রথমত কাজটা সারতেই বড্ড দেরি হয়ে যায়। একদম সন্ধ্যা হয় হয় টাইম। এদিকে সামনে তখন পড়ে আছে নানা রকমের রাস্তা পেরোনোর জটিলতা! হাঁটাপথ, রিকশাপথ, বাসপথ!
তখন আর ঢিলেঢালা আয়েস নিয়ে হাঁটাপথ পেরুবার অবস্থা থাকে? থাকেই না। সেই পথ শেষ করে আসি ইট-বাঁধানো উঁচু রিকশার রাস্তায়।
সেইখানে উঠে দেখি, কোনো রিকশা নেই। নেইই।
নেই তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে থাকা বৃথা। ওইখানে নিয়মই এই যে, এই রাস্তার মুখে যদি রিকশা পাও তো পেলা। নয়তো হাঁটা ধরো। রিকশা নেই মানে, সকলে হয় জিরাতে গেছে, নয় টাউনে আছে।
তাহলে আর কী করা, সন্ধ্যাকে ঘনিয়ে আসতে দেখে, আমি একদ-্ও দাঁড়াবার ভরসা পাই না। নিয়ম মান্য্ করে ছোটা শুরু করি।
তবে আমার আবার ছোটা! হাঁটার গতিই যার পিঁপড়ের মতোন দ্রুত, তার ছোটার গতি আর কতটুকু! বড়োজোর একটা পাঁতিহাসের চলার মতোন ধাইধাই!
সেইরকম পাঁতিহাসের গতিতে ছুটে আমি যখন টাউনের মর্গ্যান গার্লস স্কুলের সামনে পৌঁছুই, তখন ঘোরঘুট্টি অন্ধকার। রাস্তায় রাস্তায় টিমটিমা স্ট্রিট লাইট আছে, কিন্তু কী কারণে কে জানে, কোনো আলোই তখন আমার চোখে পড়ছিল না!
হতে পারে, দীঘ্র্দিন পরে, অমন ধাই-তুমুল ছুট দেওয়ার কারণে আমার চোখের ভেতরেই গুঁড়া গুঁড়া, হলুদ হলুদ আলোর নাচন চলছিল! সেই কারণেই অন্য্ কোনো জাগতিক আলো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না।

বা হতে পারে অন্য্ কোনো অশৈলী কারবার! সেই কারণেই জগৎ-সংসারের সবটাকে তখন কেবল ঘোরঘুট্টি কালোই ঠেকছিল।
টাউনের পথ মোটামুটি চেনাই। সেই কারণেই ভাঙাচোরা ফুটপাতকে পায়ের নিচে রাখতে কোনো সমস্যাই হচ্ছিল না।
তাই মর্গ্যান স্কুলকে পেছনে ফেলে, একটু এগিয়ে, হাতের বামে মোড় নিয়ে ফেলি হাইরে-মাইরে পাঁতিহাস ছুট দিয়ে। এই তো পাবলিক লাইব্রেরী! দুই নম্বর গেট আর দূরে নেই!
তো, মোড় নেয়ার পরেই সেই তাজ্জ্বের বিষয়টা ঘটে।
আমার মনে হতে থাকে যে, মর্গ্যান স্কুলের সামনের সরু লিকলিকে ফুটপাতটির মতোই পাবলিক লাইব্রেরীর সামনের ফুটপাতটুকুও ফাঁকাই আছে। তাই কোনো হিসাব-কিতাব ছাড়াই ধুড়ধাড় মোড় নিই। এবং পলকেই কার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, কাকে যেন কিসের ওপর ধুপ্পাত করে ফেলে দিই!
কা-্ বোঝো। এমন টিমির টিমির ল্যাম্প্ পোস্টের নিচে দুবুর-দাবুর, ঘোলাটে শিখা-অলা কুপি জ্বেলে কিনা, কোনো এক লোক বই বেচতে বসেছে!
আশপাশে একটা মানুষের চিহ্ণ্ সুদ্ধো নেই, তারপরেও সেই বইঅলা উপুড় হয়ে হয়ে, নানামতে, তার নানাজাতের বই সাজিয়ে যাচ্ছে। আমি এসে কিনা ধাক্কা দিয়েছি সেই উপুড় অবস্থায় থাকা বইঅলাকে। আর, সে কিনা ঝুপ্পুর করে পড়ে গেছে, তার আধা-বিছানো বইদের ওপর।
ওহ! আমার চোট লাগল কী লাগল না, সেটা আমি চিন্তা করার ফুরসত পাই না। কুপির দবদবা ঘোলা আলোয় দেখি, সেই লোক বিষম বৃদ্ধ্! এমন তেমন বুড়ো নয়। যেন এই সন্ধ্যায় তার পূর্ণ্ হয়েছে একশো বছর।
তার মুখের চামড়াকে কেবল কুঁচকানো বলা যাবে না। কুঁচকে কুঁচকে সে চামড়া দীঘল দীঘল ফালি ফালি হয়ে উঠেছে। এবং সেই ফালিরা ঢেকে দিয়েছে তার ঠোঁট ও নাক ও দুই চোখের অনেকখানি।

ইসস! এমন বুড়া মানুষটাকে এমন জোরে ধাক্কাটা দিলাম! দুঃখে ও অপরাধবোধে জটিল অবস্থা হয়ে যায় আমার! এমন যে বেগতিক লোক, তারে তো স্য্রি বলতে যাওয়াই আরেকটা অপরাধ। তার কাছে মাফ চাওয়া ছাড়া গতি নেই!
‘মাফ কইরা দেন, মামা!’ আমি শরমিন্দা গলায় বলি! কিন্তু সেই লোক আমার কথার কোনো উত্তর করে না। কেবল লম্বালম্বি উঁচিয়ে থাকা বলিরেখার ভেতর থেকে কোনোরকম একটু খোলা চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘মাফ চাই মামা! খেয়াল করি নাই!’ তার সেই অধ্র্ উন্মীলিত চোখের দিকে তাকায়ে আমি আবার বলি!
এবং দেখতে পাই যে, আমার মুখের দিকে পেতে রাখা তার চোখ হঠাৎই যেন কেমন জুলজুলিয়ে উঠছে!
‘মানে কী! এটা আবার কেমন কী! এমনে তাকায় ক্যান!’ ভয়ে আমার শরীরে আবার একটা ধাক্কা লাগে। ধাক্কাটা আমার অন্তরকেও থরথরানি দিতে থাকে।
এমনিতেই ভূতে আমার বেজায় ভয়। যদিও আজ পয্র্ন্ত একটা আস্ত্ ভূত কী নিদেন একটা জ্যান্ত্ জ্বীন-দেখার ভাগ্য্ পেলাম না! তাতে কী! তাদের নিয়ে ভয়কে তো হরদম পাই! এখন যেমন পাচ্ছি!
এইটা তেনাদের কেউ না তো!
আমি মাফ-পাওয়ার কোনো রকম ধার না ধেরে, জোর কদমে হাঁটার উদ্যোগ নিই। মাগ্গো মা! জগতের রহস্যের যে শেষ নাই, এই কথা কে না জানে!
আমি কেবল ভয় পেয়ে পেয়েই সন্তুষ্ট্ থাকতে চাই। আর কিছু দেখতে চাই না। বুঝতে চাই না! না না।
কিন্তু আমি ছুটবো কী! সেই লোক তেড়েবড়ে উড়ে এসে আমার পথ আগলে দাঁড়ায়। হায় হায়! আমার উপায় কী! এবার না জানি কোনো সব্র্নাশ ঘটে। জ্বীনে না এখন আবার উড়ায়ে উড়ায়ে কোন অচিন মুল্লুকের বাঁশঝাড়ে নিয়ে ফেলে!

ওই তো হাজারেবিজারে রিকশা বোঝাই লোকÑওই তোÑ একটু ফারাকের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই ফুটপাতে একটা মানুষের আসার তো নাম নেই! ওরে! লোকেরা! একজন কেউ আসো! আমারে তো মাইরা ফেলতাছে!
‘দেইক্ষাই চিনছি আমি!’ সেই লোক আমারে খেঁজি দেয়।‘ ভাল্টি দিয়া দিয়া আর কয়দিন! আমার চউখরে ফাঁকি দেওন? দুনিয়াত কেউ অই পারব না! পারে নাইক্কা কুনুদিন!’
আমি হ্যাবলা-ভ্যাবলা চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কী করতে পারি! এই কথার কী উত্ত্র হয়!
‘আউজকা দুইটা মাস অইলো কিতাবখান আইন্না থুইছি, নেওনের নামগন্ধ নি আছে? ক্যা? জবান দেন নাই? কন নাই যে, দুইদিনের মিদে আইয়া নিবেন? এইটা কিমুন জবান? হ্যাঁ? আউজকা কিতাব না লইয়া এক পাও আউগ্গান তো দেহি? আমি মানুষ জমাইয়া বিছার যুদি না জমাইছি, তয় আমার নাম বদলাইয়া থুমু!’
কিতাব! কিতাব কী! বই? আমি আবার কবে, এই নারায়ণগঞ্জে এসে, বইয়ের বায়না দিলাম! গত ছয় মাসে তো একদ-ের জন্য্ও আসি নাই! এই লোক কী বলে এইসব!
যাক, আমি টাসকি খেয়ে খাড়া হয়ে থাকলে কী, সেই লোক আমার কাছ থেকে ঠিকই দুইশো টাকা আদায় করে এবং আমার হাতে তার সেই কিতাবখানা ধরায়েও দেয়।
কাঁপতে কাঁপতে বাসে উঠে, কোনোরকম একটু থির হয়ে চেয়ে দেখি; হায়রে কারে কিতাব বলে! এটা তো প্রথম পাতা নাই হয়ে যাওয়া, ছেঁড়া-লড়বড়ে একটা খাতা! সব পাতা বিষম ধূসর-হলুদ! বোঝা যায়, একটু কোনোরকম গুঁতা লাগলেই এরা গুঁড়া গুঁড়া হয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।এবং এও বোঝা যায়, সেরকম একটু গুঁতা ও চাপ পাওয়ার জন্য্ খাতাটা একদম মুখিয়ে আছে!

দেবো নাকি গুঁড়া করে? এই খাতা অথবা আজগুবি কিতাব দিয়ে আমার কী!
কিন্তু দুই দুইশোটা টাকা অকারণ খোয়ানির যাতনায় থাকি বলে, ওটি করার জন্য্ আঙুলে কোনো শক্তি পাই না। যেমনকার খাতা তেমনই ধরা থাকে আমার হাতে!
পাঠক, এইই হচ্ছে সেই তিনদিন আগেকার ঘটনাটা।
তবে আজকে সকালে অন্য্ একটা আশ্চর্য বৃত্তান্ত ঘটেছে।
খাতাটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ছুঁড়তে যাবার সময়ে আচমকাই চোখে পড়ে যে, ভেতরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বাঁকা-তেরা করে করে কী সব যেন লেখা!
গুঁড়ি গুঁড়ি অক্ষরগুলো দেখতে যেন গোলানো কচি আমের মতো। আমার চোখের সামনে দোলা শুরু করে তারা! দোল খেতে থাকে !
শেষে, আমি না- পেরে ওই হস্তাক্ষরদের পাঠ করতে বসে যাই। এবং অল্প্ ক্ষণের মধ্যেই বুঝে যাই যে, এই কিতাব যাহা তাহা কোনো কিতাব নয়। এই কিতাব সমাজবিরোধী কথাবার্তায় ঠাসাÑ এক অতি সব্র্নাশা কিতাব।
এটি পড়লে যে-কোনো সুস্থ্ মানুষ বুক ধড়ফড়ানির ব্যাধি পেতে বাধ্য্। এই যেমন আমি পেয়েছি! এই যে আমি এখন সমাজের ভালাইয়ের চিন্তায় ও নানাবিধ ভয়ে ধড়ফড়াচ্ছি! সেটা কেন?
সেটা ওই কিতাবের কারণেই তো!
ভয় না-পাই কেমনে? এই কিতাব স্প্ষ্ট বলছে যে, চুরি স্বাস্থ্য্কর। সংসারে চুরি নেই তো, শরীরে জোয়ানকি নেই! এটা কেমন কথা! এমন কথা কে কবে শুনেছে!
এখন, পাঠক সুহৃদগণ; এমন ভয়াবহ বইপড়ার ভয়ঙ্কর চাপ আমি একা সহ্য্ করতে পারছি না কিনা; তাই আপনাদেরও কিতাব-কথা তন্ন্ তন্ন্ করে

শোনাতে যাচ্ছি। দেখি, তাতে আমার উপকার কিছু হয় কিনা!
কিতাব কথা।

এই আমি গেদী। এই দেওভোগ গেরামের একমাত্র্ মাইয়া, যেয় কিনা দস্ত্খত করিতে জানে! তাহার উপরে আমি হালকার মিদে ঝাপসা পড়িতেও পারি।লিখিতেও পারি। ইহার জন্য্ই গেরামের মাথার ধন গোলেনূর বিবি খালায় যাহা যাহা আদেশ করিয়াছে, আমি মাথায় তুলিয়া লইয়াছি।
খালায় অতি দিলঅলা মুরুব্বি। তাহার মায়ার সীমা নাই। কিন্তুক বুইদ্দা চোরায় তাহা বুঝিল না। সেয় খালার কথা গেরাজ্জ্ করিল না। অখন সেয় উহার ফল ভোগ করিতেছে! উহা তাহাকে করিতে হইবেই।
ময়মুরিব্বিগো কথা মান্যি না করিবার ফল অতি খারাপ। ইহা আমার কথা নহে। এই কথা ডাকের মায় নিজ মুখে কহিয়া গিয়াছে! কহিয়া গিয়াছে যে, লঘু-গুরু যে না বাছে; ছারেখারে যায়!
লিখিবার কালে আমার বড়োই বাঞ্ছা হয় যে, বাছিয়া বাছিয়া ডাকের মা-র কথাগুলা লিখিয়া থুই। কিন্তুক খালার চোপার ডরে করিতে পারিতেছি না। খালায় কয়, মারফতি কতা থুইয়া, আসল কতা লেখ। আসল কতা আবার কী! সেই তো বুইদ্দা চোরার কতা!
সেয় আমাগো এই যে এতাটুক গেরামটারে, আর গেরামের পরতিটা জনেরে, একদিন হুদা খাড়ার উপরে রাখিয়াছিল! একদা আউজকা কতো কাল হয়, সেইসোমে দেওভোগের একটা মাইনষেও শান্তিহালে চউখটা বন্দ করিবার কোনো ফুরসত পায় নাই।
এই না গোলেনূর বিবি খালায় হের হাউরির আমোলের পিতলের বদনীটা মাইজ্জা ঝকঝকা করিয়া রইদে দিয়াছে। দিয়া সেয় খাড়াইয়া পাহারা দিতাছে। ওম্মা! খালার পিছনে আঁতকা কাউয়ায় ক্যান ডাক দেয়! কোন কুখবর লইয়া আসিয়াছে কাউয়ায়? খালায় তাহা দেখিবার জন্য্ চউখ ফিরাইয়া সারে না, বদনী দেহো নাই হইয়া গেছে! হায় হায় হায়!
এতো বড়ো কইলজা-কাটা, চশমখোর চোরাটা কেটায়?
কেটায় আবার! বুইদ্দায়।
খালায় হইমই করিয়া লউর দেয় বুইদ্দা গো বাড়ির দিকে। তাহার পিছে পিছে লউরায় পুরা দেওভোগ গেরাম!
বুইদ্দার ঘরের বুইদ্দা, তুই নি গিলতে পারবি এই জিনিস? কার জিনিস নিলি, বুইজ্জা নিলি না?
লোকেরা হাসি-তামাশা করিতে করিতে কতার বুড়বুড়ি তুলিতে থাকে। তাহাদের সগলতের কতাই সত্য্!
বুইদ্দায় বমাল ধরা খাইয়া যায়। সেয় পিতলের বদনীখানা তাগো পুষ্কুনীতে ডুবাইয়াও সারে নাই তহন, পোংটা পোলাপাইতে একডুবে সেইখানরে তুলিয়া আনে।
কিরে নাককাটা দাগা? তর লাজ-শরম নাই? খালায় জিগায়।
বুইদ্দায় কতার জব দেয় না।
লোকে কয়, বুইদ্দা চোরায় আগের জনমে ছ্যাত বিলাই আছিল! এই কারোনেই উয়ে এমন ছুতানাতা যহন-তহন চুরি কইরাই যাইতে থাকে। গেরামের একটা লোকেরেও চইন দেয় না। কেউইরে সেয় শান্তি দেয় না।
আমি যে গেদী, একলা মা-র একলা ঝি; সেই আমারে সুদ্ধা না!
আমার নতুন পাছা-পাইড়া নিলাম্বরি কাপোড়খান ঘরের ভিতরে, চকির উপরে রাখা আছিলো। আঁতকা দেহা যায় অইটা নাই। হায় হায়! নতুন কাপোড়খান! সগলতে তহন আবার লৌড় লৌড়।
বুইদ্দায় কই? সেয় যাইতাছে সোনাকান্দার হাটে। মতলব কী! মতলব হইলো কাপোড়খান বেচোন!
সগলতে তারে কয়, কাপোড়খান ফিরত দে। বুইদ্দায় কয়, কিয়ের কাপোড়?
শেষমেষ সগলতে অরে জাইত্তা ধরিয়া, তবনে টান দিয়া দেহে; কাপোড় কোমরে পেচাইন্না রহিয়াছে!
পিছামারা বুইদ্দা! আমার লগে তর কি দুশমনি?
সেইবার বৈশাখ মাইস্যা আমাবইস্যা রাইতে, সেয় আরো বড়ো কুকামখান করে। করে কী, গেরামের সগলতের তেনে বড়োলোক যেয়, সেই টুনু মিয়া বেপারীর পুষ্কুনীতে সেয় ঝাঁকিজাল ফেলে। একটা টিমির টিমির কুপি সেই কোন ঝোপড়ার আউইলে। সেই বাত্তি আছে নামকাওয়াস্তে। আদতে পুরাই আনধার।
সেই কালাকুষ্টি রাইতে হাঁটু পানিতে নামিয়া সেয় ততখোনে তিন ডুলা মাছ ধরিয়া ফালাইছে। আরো হয়তো ধরিত। কিন্তু ডাকের মায় বলিয়াছে না, চোরের দশদিন, আর সাউধের একদিন?
বুইদ্দার লাগিয়া ধর্মের ডোল বাতাসেই বাজাইয়া দেয়। সেই রাইতে কী মনে করিয়া, মোকসার মা মামীয়ে তাগো ঘাটলায় যায়, লোটা ভরিতে। গেরামে এই একটা মাত্র্ মস্ত পুষ্কুনী। তাহার চারিদিক ঘেরাও দিয়া সগলতের বাড়িঘর।
মোকসার মা মামীয়ে চউক্ষের পাতাটা না ফালাইয়াই ধরিয়া ফালাইতে পারে, পুষ্কুনীর পুবের দিগে ঐটা কিয়ের লড়াচড়ি। তাহার পরে ডাকে-চিৎকারে পুরা গেরাম জাগনা হইতে কতখোন!
হায় হায় হায়! দেখছো কারবার! একে কিনা আমাবস্যা, তাহার উপরে আবার মাইঝ রাইত! বুইদ্দার নি জানের মায়া আছে! বাতাসে যে বুইদ্দারে জানে মাইরা, পেঁকে ঘাড় গুঁজিয়া, ফালাইয়া থুইয়া যায় নাই! তাহাই ত সাত কপালের ভাগ্গি!
সেই তিন ডুলা মাছ লইয়া গেরামের সগলতের বড়ই অশান্তি হয়। আমাবস্যার রাইতকালে ধরা মাছ! কোনো বাড়ির মাইনষেরই পাতে নিবার কোনো উপায় নাই। আবার উহা ফালাইয়া দিয়া গুনার কর্মও কেহ করিতে রাজি না।
তখন কি উপায়?
তখন সগলতে মিলিয়া, সেই সগল মাছেরে তারে বিন্ধাইয়া বিন্ধাইয়া শুটকি বানান্তি সাব্য্স্ত করিল। গেরামের বাতাসে বাতাসে শুটকির গন্ধ! সগলতের জান বাহির হইবার দশা।
সগলতে সেই শুটকি ইষ্টি-কুটুমের বাড়িতে পাঠাইয়া পাঠাইয়া নিজেরা খালাস পাইল। উহা কুটুম বাড়িতে কে লইয়া গিয়াছিল? গেছিল বুইদ্দা চোরায়। চুরির সাজা তো তাহারে ভোগ করিতে হইবেই! যাও এখন গেরামে গেরামে! ইহাই আছিল বুইদ্দার সাজা।
কিন্তুক এই কুটুমবাড়িতে তাহারে পাঠানিটাই গেরামের লাগিয়া কাল হইল। বেহুলার লোহার ঘরে যেমুন সুতানলি সর্পে ঢুকিয়াছিল, বুইদ্দার অন্তরেও তেমুন এক সুতানলি ঢুকিলÑএই কুটুম বাড়ি বাড়ি শুটকি দিতে গিয়া!
শেষ ইষ্টির বাড়িত শুটকি দিয়া ফিরিবার কালে, সেয় দেখে, এক গিরস্থের বাইর বাড়ির উঠানে একঝাঁকা পিতলের থাল রইদ দেওয়া। বুইদ্দা কোনো দিগে না চাহিয়া, তগনগদ সেই ঝাঁকা মাথায় তুলিয়া হাঁটোন দেয়। তবে লগে লগেই সেয় ধরা পড়ে।
কী বুদ্ধিনাশার বুদ্ধিনাশা বুইদ্দায়! কেমনে তুই এমন আকামটা করলি? তুই কি অইটা নিজের গাঁও পাইছিলি? কিন্তুক সেই কতা তাহারে কে বুজায়!
ইষ্টি গাঁওয়ের মাইনষেরা অরে তেমন কিছুই করে না। খালি মজিদে নিয়া তওবা করায় আর কিরা কাটায়। শুনা কতা এই যে, আল্লা বাবুদরে হাজির নাজির কইরা উয়ে বোলে কিরা কাটে এই জিন্দিগীতে আর চুরির পোথে যামু না।
সেয় কি কিরা কাটিয়াছিল, তাহা সেয়ই ভালা জানে। তয় গেরামে ফিরলে দেখা যায়, যেই বুইদ্দায় কুটুম গেরামে গিয়াছিল, সেই বুইদ্দায় ফিরতি আসে নাই।
যে ফিরতি আসিয়াছে, সেয় ঘরের বাইর হইতেই যেন শরমায়। লোকের দুয়ারে টুসকি-ফিচকি দিবো কি, সেয় চউখ তুলিয়াও যেন দুনিয়ারে দেখার তাকত রাখে না।
সেইদিন হইতে দেও ভোগ গেরামে চুরির গ্যাঞ্জাম বন হইল। কিনতুক তাহাতে ফল কি হইল?
গোলেনূর বিবি খালায় কহিল যে, এইবার হাছা হাছাই কুদিন আইল দেওভোগ গেরামে। এতদিন এই যে বুইদ্দার পিছে লৌড়ান্তির ঠেকা আছিলোÑ কুদিন আসিবার কোনো ফাঁক পায় নাই! এখন ওই সগল ঠেকা আর লৌড়ান্তি ফুরাইছে না? এইবার যমে গেরাম চিনিব।
সত্য্ সত্য্ই গেরামে বিপদ দেখা দিলো। মুরুব্বিদিগকে আগে মুরুব্বি লাগিত, কিন্তুক বুড়া লাগিত না! বুইদ্দায় যেই চুরি ছাড়িল, অমনেই গোলেনূর বিবি খালারে বুড়ার বুড়া- তেবুড়া দেখাইতে লাগিল।
খালার কি দোষ? গেরামে লৌড়-ঝাঁপ বলিতে আর কিছুই নাই!
বুইদ্দায় নি আসিয়া সব্বনাশ করিয়া থোয়Ñ এই চিন্তা নিয়া যখন তখন বাড়ির চৌসীমারে পাঁক দেওয়া নাই, হাউকাউ নাই।তাইলে, এই খালা মানুষটার দিন যায় কি পরকারে?
যেই টুনু মিয়া বেপারি চিরদিন ঘোমের কষ্টে আছিল, যেয় কিনা নিজ সিন্দুকরে শিকল দিয়া পেঁচাইয়া, সেই শিকলরে নিজ কোমরে আনিয়া বান্ধিত; তাহার পরে এক কাইত হইয়া কোনো মতে একঘুম দিত; তাহার তো বুইদ্দার বদলান্তিতে আহলাদ করিবার কথা।
এখন তাহার আর শিকল কোমরে বান্ধিবার কোনো ঠেকা নাই। সেয় নিঃস্বাধীন।
কিন্তুক অখন গেরামের লোকে তাহার মোখের পানে চউখ রাখিতে পারে না। সেই মোখ য্যান পঁচা পুষ্কুনীর পানির মতোন দুঃখী দুঃখী দেখায়!
কান সজাগ রাখিয়া, আঁতকার মধ্যে চিল্লানি দিয়া উঠিবার দুঃক্ষের দিন তাহার চলিয়া গিয়াছে। টুনু মিয়া বেপারির সগল দুঃক্ষের দিনই তো চলিয়া গিয়াছে!
তয় মনে হয় য্যান, দুঃক্ষের দিনেরা একলা যায় নাই! তাহারা টুনু মিয়া বেপারীর অন্তরের জোশটারেও লগে লইয়া গিয়াছে। বাঁচিয়া থাকিবার কামড়টারেও যেনো লইয়া গিয়াছে।
অখন তাহারে, এই টুনু মিয়া বেপারী মামারে, দেখিলে ডর করে। সেয় কেমনে জানি পরদাদাগো মতন ঠুনঠুনা বুড়া হইয়া গিয়াছে। লাগে য্যান, এই না তাহার জান কবজ হইয়া যায়!
তাইলে বুইদ্দার ভালা হইয়া কি ফল হইল? তাইলে তো আগেকার চুরির দিনকালই ভালা আছিল!
তহন, বুইদ্দার জ্বালা আছিল! আর ঘরে ঘরে লোকের অন্তরে চুরি রুইক্ষা দেওনের তাগাদাটাও আছিল! জোশটা আছিল। শইলে ছুটান্তি দেওনের হিম্মত আছিল! অখন আর কিছুই নাই। খালি শান্তি আছে। গোরস্তানের শান্তি।
হায় হায় বুইদ্দা! তুমি ভালা হইয়া এইটা কি অনিষ্ট্ করিলা? তোমার গেরামের এত্তা বড়ো দুশমনি তুমি করিতে পারিলা?
এখন এই বুড়া থুত্থুরা লোকেগো লইয়া দেওভোগ গেরাম কি করিবে? কোনোখানে তো একটা জোয়ান মুখের চিন্নও চউখে পড়ে না!
আমি যে গেদী, সিয়ান মাইয়া; আমার মোখ দেখিয়া তো আমিই ডর পাইতে থাকি! এই মোখে তেজ নাই জান নাই! য্যান একটা মরা কই মাছÑএই মোখ!
হায় হায়! বুইদ্দা! আসল বুইদ্দা, তুমি আবার আইস! আমাদিগের তেজ ফিরিয়া পাইতে হইলে তোমাকে আসিতে হইবে! তোমার চুরির দিনকে আসিতে হইবে!
বুইদ্দারে, ওরে চোর, তোমার চুরি করিবার তাকতখানা আর ইচ্ছাখানা লইয়া তুমি আস আরেকবার। লোকরা আরেকবার জ্যাতা জীবনেরে চিনিয়া লউক।তাহারা আবার জুয়ানকিতে ভরিয়া উঠুক।
এখন বুঝিতেছি চুরির ফজিলত! আহারে, দিন থাকিতে উহার কোনো মর্মই বুঝিতে পারি নাই! দেওভোগ গেরামের কোনোজনেই বুঝিতে পারে নাই!
ইতি গোলেনূর বিবি খালার হুকুমে এই কিতাব লিখিল
গেদী
বাং ১৩৪৩ সন
সাং দেওভোগ

শেষকথা : এখন প্রিয় পাঠক, এই যে আপনাদের সব কথা শুনিয়ে নিলাম, এখন আর আমার পরানে কোনো ধড়ফড়ানি ধাক্কা দিচ্ছে না। আমি মুক্ত্!
কিন্তু ভেবে থই পাচ্ছি না, এই কিতাব বা ছেঁড়া খাতাটাকে নিয়ে কি করবো আমি? আমার দুইশো টাকা খোয়ানি গেছে তো গেছে, ওই দুঃখে আর উতলা নই! তবে বেতালা লাগছে এই চিন্তায় যে, এই কিতাবখানা নিয়ে কী করবো!

- আকিমুন রহমান