সোমবার,২৭ মে ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজম সামলাবেন কী করে?
০১/১৩/২০১৯

কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজম সামলাবেন কী করে?

-

ইদানীংকালে আমাদের সমাজে যৌন হয়রানির ব্যাপারটি যতো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় ঠিক ততোটাই অবহেলা করা হয় সেক্সিজমকে। অথচ প্রভাবের কথা মাথায় রাখলে এ মাত্রা ঠিক যৌন হয়রানির মতোই গুরুতর! যেহেতু আমাদের সমাজ এখনো সেক্সিজম প্রতিরোধ কিংবা এর গুরুত্ব অনুধাবন করার মতো পরিপক্ক হয়ে উঠে নি, তাই এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধের শুরুটা হতে হবে আপনার-আমার থেকেই।

সেক্সিজম সম্পর্কে ধারণা
কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজম কী তা বুঝার আগে জরুরি সেক্সিজম কী তা জানা। সেক্সিজম বলতে এক কথায় লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলা চলে। কোনো লিঙ্গের মানুষের প্রতি গৎবাঁধা কিছু ভুল ধারণা এবং এর ভিত্তিতে মন্তব্য, আচরণ, লিঙ্গবৈষম্য, ভেদাভেদ বা যৌনহয়রানিমূলক কাজকে সেক্সিস্ট আচরণ বলা যেতে পারে এবং এই কনসেপ্ট সেক্সিজম নামে পরিচিত। সেক্সিজম প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবে সংঘটিত হতে পারে। প্রত্যক্ষ সেক্সিজম হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত যৌন ইঙ্গিত কিংবা হয়রানির চেষ্টা করা।

অন্যদিকে পরোক্ষ সেক্সিজমের ব্যাপারটি ছদ্মবেশে আমাদের সমাজে লুকিয়ে থাকে। এর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এটি আপনি খুব ‘কাছে’ থাকা লোকজনের কাছ থেকেও এর শিকার হতে পারেন। ধরুন, আপনার পাশের ডেস্কের একজন সহকর্মী আলাপের ফাঁকে একটা সেক্সিস্ট কৌতুক ঝেরে দিল যেটা আপনার হজম করতে বেশ কষ্ট হয়েছে। এখন ব্যাপারটি নিয়ে আপনি অফেন্ডেড হলে আপনার সহকর্মী সেটাকে খুব সহজেই কৌতুক বলে উড়িয়ে দেয়ার অবকাশটা পেয়ে যান। দুঃখজনক হলেও সত্যিই এ ধরনের সেক্সিজম আমাদের কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

কিংবা চায়ের আড্ডাতেও অহরহই ঘটে যাচ্ছে।

নারী যখন কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজমের শিকার
‘সেক্সিজম যৌন হয়রানির চেয়ে সহনীয় মাত্রার’ সেক্সিজমের ক্ষেত্রে এমনটাই আমাদের সমাজের ধারণা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনটাও ধারণা করা হয় যে, এর তেমন কোনো কার্যকর প্রভাবই নেই। কিন্তু ব্যাপারটা কি আদৌ তাই? কর্মক্ষেত্রে বস বা সহকর্মীর সেক্সিস্ট আচরণের শিকার হন আমাদের সমাজের অনেক নারী। যেখানে আপনি দিনের অনেকটা সময় কাটাচ্ছেন সেখানে এমন কোনো উসকানিমূলক কথা, বিদ্রুপ বা নারী বলে আপনার অর্জনকে ছোট করে দেখার মতো এ ধরনের সেক্সিস্ট আচার-আচরণ নিশ্চিতভাবেই আপনার মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের এই অঞ্চলগুলোতে নারীর সাফল্য ঠিকভাবে মেনে নিতে পারেন না অনেক বিকৃত মনের মানুষরা। যেমন ধরুন, একজন নারী যদি সহকর্মী পুরুষদের থেকে দ্রুত প্রমোশন পান, অনেকেই ভেবে নেন কেবল নারী বলেই তিনি এই সুবিধা পেয়েছেন বা বসের সঙ্গে নিশ্চয়ই অন্য কোনো সম্পর্ক রয়েছে। এটি কিন্তু আমাদের সমাজে সেক্সিজমের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর সঙ্গে যৌনহয়রানি, বিদ্রুপ ইত্যাদি মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজমের প্রকট শিকার আমাদের সমাজের নারীরা। আর ঠিক এ কারণেই সেক্সিজম প্রতিরোধ করা প্রয়োজন, সেটা যত ছোট পরিসরেই হোক না কেন। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন।

ডাবল স্ট্যান্ডার্ডে ছাড় নয়
কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজমের শুরুটা হয় খুবই সূক্ষ্ম পন্থায়। যেমন ধরুন আপনার কোনো সহকর্মী অন্য পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যবহার করছে একরকম আর আপনার কিংবা নারীদের ক্ষেত্রে অন্যরকম। হতে পারে সেটা সম্বোধন কিংবা অন্যান্য ব্যবহারে। যদি আপনি তাতে তেমন গা না করেন তবে সেক্সিজমের প্রথম ধাপকে আপনি নিজেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এইসব ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করুন। সহকর্মীটিকে জিজ্ঞেস করুন তার এই দ্বিমুখী ব্যবহারের হেতু কি? তাতে তো ব্যাপারটিকে আলোর মুখ দেখানো হবেই সাথে সাথে আপনার সহকর্মীটিও আপনার সচেতনতা সম্পর্কে একটা বার্তা পাবেন। তাতে হয়তো ব্যাপারটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে পারবেন আপনি!


সহযোগী খুঁজে বের করুন
কর্মক্ষেত্রে এমন কাউকে খুঁজে বের করুন যার কাছে আপনি এসব ক্ষেত্রে সাহায্য পেতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হয় নারী সহকর্মী হলে। তাহলে হয়তোবা তার কোনো অভিজ্ঞতার ভাগও পেতে পারেন। তবে ‘সহযোগী’ কথাটি কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে কার্যকর দিকটি হচ্ছে আপনার দল ভারি করা। যেন আপনি প্রতিবাদ করলে আপনার পক্ষে বলার মতো সহকর্মী আপনার পাশে থাকেন। যদি তাই হয় কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি আপনার জন্য সহজ হয়ে যায়।

এইচ আর-এর শরণাপন্ন হন
অফিসে মানবস¤পদ বিভাগে কর্মরত ব্যক্তির কাজই থাকে কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করা। কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজমের শিকার হলে এইচ আর অ্যাডমিনের শরণাপন্ন হতে ভুলবেন না। এতে আপনার সেক্সিস্ট সহকর্মীটির মোকাবিলায় আপনি সপক্ষে আরও জোর পাবেন।

প্রত্যক্ষ সেক্সিজম রোধে
কর্মক্ষেত্রে সেক্সিজম যে-কোনো অবস্থাতেই অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু যদি প্রত্যক্ষ সেক্সিজমের শিকার হন? যদি যৌন হয়রানি কিংবা তার কাছাকাছি কিছুর শিকার হন তবে দেরি না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে অফিসিয়ালি নালিশ দাখিল করুন।

সেক্সিস্ট বসকে সামলাতে
কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হচ্ছে বসের কাছ থেকে সেক্সিজমের শিকার হওয়া। যদি তা হয় প্রত্যক্ষ সেক্সিজম, তবে অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বেনামি নালিশ দায়ের করে দেখতে পারেন। এরপরও যদি সমস্যা চলতে থাকে তবে একই সমস্যায় ভুগছেন এমন সহকর্মীদের নিয়ে একজোট হয়ে এইচ আর বা সুপারভাইজারের শরণাপন্ন হতে পারেন।

সেক্সিস্ট ক্লায়েন্টকে সামলাতে
যদি আপনার মক্কেল সেক্সিস্ট হন তবে ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়ায়। মক্কেল যদি হয় খন্ডকালীন ক্লায়েন্ট তবে তার সঙ্গে কাজ শেষ করে পরে একই প্রজেক্ট হাতে নেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি ঐ ক্লায়েন্ট-এর কাজ লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে তবে বিষয়টি দ্রুত বস কিংবা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান এবং বুঝিয়ে দিন ঐ ক্লায়েন্টের প্রজেক্টে কাজ করা আপনার জন্য বিপজ্জনক।

- নাহিয়ান ইসলাম
- ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী