বৃহস্পতিবার,২০ Jun ২০১৯
হোম / ফিচার / শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকবেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি
০১/০২/২০১৯

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকবেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি

-

তারামন বিবি- দুর্ধর্ষ, সাহসী, অকুতোভয়; যেই বিশেষণই এই বীরনারীর সাথে যোগ করা হোক না কেন, হয়তো কম হয়ে যাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের হাজারো সাহসী গল্প আর বীরত্বগাথা জানা আছে আমাদের, তবে তারামন বিবির বীরত্বের উপাখ্যান স্বমহিমায় ভাস্বর।

বীরপ্রতীক তারামন বিবি সবাইকে ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন গত ১ ডিসেম্বর। সম্মুখযুদ্ধে একা একজন নারী হয়ে পুরুষের সাথে সমানভাবে বুক চিতিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করা বা ছদ্মবেশে শত্রুশিবিরে গিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করাÑ শুনে কোনো গল্প বা চিত্রনাট্য মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে এমনই সাহসী সব ভূমিকা ছিল তারামন বিবির। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার রান্না করা থেকে শুরু করে অস্ত্র চালানো আর গুপ্তচরের কাজ করাÑ কোনো কাজই তিনি বাদ দেননি মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য। মুক্তিসংগ্রামে এতভাবে অবদান খুব কম মানুষই রাখতে পেরেছেন।

তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে, কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বিবি। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় তিনি নিজ গ্রামেই ছিলেন, তখন তাঁর বয়স সবে ১৩ কিংবা ১৪ বছর। ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। তারামনকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উৎসাহ দেন মুহিব হাবিলদার, যিনি পাশের গ্রামের এক ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার রান্না করার জন্য দশঘরিয়া ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। পরবর্তীসময়ে তারামনের সাহসের পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার সহযোদ্ধাদের সাহায্যে তারামনকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেন। এরপরই তারামন বিবি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়া শুরু করেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন তারামন বিবি। এই যেমনÑ একদিন মধ্যদুপুরের কথা। ক্যাম্পে সবাই খেতে বসেছে, তাঁর কাঁধে পড়েছিল ক্যাম্পে শত্রুর আগমন হয় কিনা তা দেখা। সুপারি গাছে উঠে তিনি দুরবিন দিয়ে নজর রাখছিলেন। একটি গানবোট আসতে দেখে সবাই সতর্ক পজিশনে গেল, সন্ধ্যা পর্যন্ত সেদিন যুদ্ধ করেই তবে তারা জিতেছিলেন। এমন অনেক লড়াইতে তারামন সামনে থেকে অংশ নেন।

শুধু সম্মুখযুদ্ধ নয়, গুপ্তচরবৃত্তিও করতেন তিনি। ছদ্মবেশ আর কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সরাসরি পাক ক্যাম্পে গিয়েছেন অনেকবার। শরীরে কাঁদা, মাটি, চক-কালি এমনকি মানুষের মল মেখেও পাগল সেজেছেন, পাকিস্তানি আর্মির সামনে করেছেন অভিনয়, প্রতিবন্ধী সেজে ঘুরেফিরে অজ¯্র গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছেন, নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে এমন সাহসী পদক্ষেপ আর আত্মত্যাগ ক’জন করতে পারে? তাঁর মতো এমন সাহসী আর অকুতোভয় লড়াকুদের হাত ধরেই আসে আমাদের স্বাধীনতা।

দেশ স্বাধীনের পর তিনি রাজীবপুরে ফিরে আসেন, শুরু করেন নতুন জীবন। পরিবারকেও খুঁজে পান। তবে অভাব তাঁর পিছু ছাড়েনি, কোনোরকমে মানুষের বাড়িতে কাজ করে দিন চলত তাঁর। ১৯৭৫ সালে একই গ্রামের আবদুল মজিদের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। দীর্ঘদিন যক্ষায় ভুগেছেন চিকিৎসার অভাবে, যার ফলে তাঁর ফুসফুস অকেজো হয়ে যায়। দীর্ঘদিন নানা রোগশোকে ভুগে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু তাঁর হাতে সেই সম্মাননা তুলে দিতে অপেক্ষা করতে হয় ২২টি বছর। নিভৃতে থাকা এই নারী প্রায় হারিয়েই গিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে তাঁকে খুঁজে পান। পরবর্তীকালে তাঁকে নারী অধিকার সংগঠনগুলো ঢাকায় নিয়ে আসে। ১৯৯৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর তাঁর হাতে বীরত্বের পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। সেসময় তাঁকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। সরকারের সহায়তায় তিনি কুড়িগ্রামে নিজের জমি পান, একটি এনজিও সেখানে ঘর তুলে দেয়। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই মুক্তিযোদ্ধা সারাজীবনই অভাব আর নদীভাঙনের কারণে কষ্ট পেয়েছেন। স্বাধীনতাপরবর্তী ২৪ বছর পর্যন্ত তাঁর কাছে কোন রাষ্ট্রীয় সাহায্য পৌছায়নি। নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে অবহেলিত হয়েছেন, এমন অভিযোগ করেছেন অনেকবার।

দেশ আর জাতিকে নিয়ে তিনি ভাবতেন সবসময়, নতুন প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সোনার বাংলাদেশ পাওয়ার জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছি৷ এই দেশকে যেন সবাই ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে৷ এই দেশে যেন আর খুন, খারাবি না হয়৷ ভবিষ্যতে আর কখনও যেন যুদ্ধ না হয়।’

যুদ্ধের দিনগুলোতে তাঁর সাহসী কাজগুলো এক স্বাধীন দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর উপাখ্যান। ১৪ বছরের এক ছুটন্ত বালিকার ভেলা নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী পার হয়ে শত্রু শিবিরের খবর নিয়ে আসা বা স্টেনগান হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়াÑ সাহসী এক মুক্তির নায়ক তারামন বিবি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন এমনই সব দুঃসাহসিক কাজের স্মৃতিচারণায়। পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা তারামন বিবির জন্য।

তানভীর ইসলাম