মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / দিল্লিকা লাড্ডু সাতকাহন
১২/০৫/২০১৮

দিল্লিকা লাড্ডু সাতকাহন

-

‘যে করেই হোক বিয়ে করুন। কপাল ভালো হলে আপনি সুখী হবেন। আর কপাল খারাপ হলে আপনি একজন দার্শনিক হবেন।’ এটা গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথা। বিয়ে নিয়ে অনেক ধরনের স্যাটায়ার বা কৌতুক প্রচলিত আছে। কৌতুকগুলো বেশিরভাগই পুরুষদের লেখা বলে সেগুলোতে স্ত্রী-বিদ্বেষও থাকে অত্যন্ত বেশি। তবে কিছু কিছু আছে জেন্ডার নিরপেক্ষ। যেমন মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী কার্ল বাউম্যানের মতে, ভালোবাসা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত বিভ্রম আর এই বিভ্রম সারানোর উপায় হচ্ছে বিয়ে। একথা বর-বধূ উভয়ের ক্ষেত্রেই সত্য। কারো কারো মতে, বিয়ে আসলে তিন রিংয়ের সার্কাস-এনগেজমেন্ট রিং, ওয়েডিং রিং আর সাফারিং।

বিয়ের পরে কথিত ‘সাফারিং’ থাকলেও বিয়ে হচ্ছে ‘দিল্লিকা লাড্ডু’। বাংলায় ‘বিয়ে’ শব্দটি এসেছে ‘বিবাহ’ থেকে। শব্দটির মূলগত অর্থ হলোÑকাউকে বহন করে আনা। একইভাবে ‘বধূ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে যাকে বহন করে আনা হয়েছে। বিয়ে ও বউকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করার নেপথ্যে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। যদিও বিয়ের ইতিহাসের সঙ্গে প্রধানত মিশে আছে অনুসৃত ধর্ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বিয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজাতিরক্ষার বিষয়টিও। তবে সৃষ্টির আদিতে প্রজাতি রক্ষার দায়টি না ছিল পরিবারের, না ছিল বিয়ে নামক এ সামাজিক চুক্তির। সেমেটিক পুরাণ বলছে, পৃথিবীর প্রথম হত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল সঙ্গী বাছাইকে কেন্দ্র করেই। সমাজবিজ্ঞান বলে, সম্পত্তি রক্ষা আর নিজের সঙ্গী ও সন্তানকে একান্তই ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতেই বিবাহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। আর, এখন বিয়ে হলো যে-কারো ব্যক্তিজীবনের সবচাইতে প্রভাব-বিস্তারকারী ঘটনা। এই উপমহাদেশে বিংশ শতকের শুরুতেও বিয়ে ছিল যথেষ্ট অনাড়ম্বর। ঘটা করে বিয়ে করার ব্যাপারটি প্রাচীনকালে একমাত্র রাজা-উজিরদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। তবে বতর্মান সময়ে বিয়ের আড়ম্বর আর সামাজিক স্ট্যাটাস যেন পরিপূরক হয়ে গেছে। বিয়ের আড়ম্বরে সবাই-ই এখন রাজা-উজির হতে চায়। অর্থনৈতিকভাবে আমরা যত বেশি উন্নত হচ্ছি, ততই আমাদের বিয়েতে কথিত আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগছে। বিয়েতে এখন থিম-বেজড ডেকোরেশন, বিশেষ ভেন্যু রিজার্ভেশান, চমকপ্রদ আলোকসজ্জা, সিনেমাটিক ফটোগ্রাফি-ভিডিও, ডিজে পার্টি, দোল-পালকিÑ যেন শেষ নেই আড়ম্বরের। বলা যায় ‘বিয়ে বাজার’ এখন অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু বাজারগুলোর অন্যতম। আর ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি সরগরম হয়ে ওঠে এই বাজার। আর্থিক সংগতি অনুযায়ী এখন বিয়ের আড়ম্বরও আকাশ সংস্কৃতির কারণে নতুন নতুন মাত্রা অর্জন করছে। বর্তমানে লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজি জড়িয়ে আছে এই বিয়ে বাজারের সঙ্গে। সুতরাং এরও একটি বিশেষ অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে।

শেষ করা যাক একটি জনপ্রিয় কৌতুক দিয়ে। সিংহের বিয়ে হবে, ভেড়া খুব লাফাচ্ছে। একজন বলল, ‘সিংহের বিয়ে তো তুই ভেড়া লাফাচ্ছিস কেন?’ ভেড়া বলল, ‘আরে, বিয়ের আগে আমিও তো সিংহ ছিলাম।’

একজন পুরুষ সকৌতুকে নিজেকে দার্শনিক ভাবুন কিংবা ভেড়া মনে করুন তাতে কারো কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু দয়া করে বধূ নির্যাতন করবেন নাÑএর ভেতরে কোনো পুরুষত্ব নেই। জগৎটাকে দেখুন মায়ের চোখ দিয়ে। নিজেকে মানবিক হিসেবে গড়ে তুলুন। সুস্থ-সুন্দর দাম্পত্যের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে ভালো প্রজন্ম। আর ভালো প্রজন্মই উপহার দেয় একটি উন্নত ও সুন্দর রাষ্ট্র।

তাসমিমা হোসেন