মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / বাধা ও মিথ ভেঙে নারী খেলোয়াড়দের অগ্রযাত্রা
১২/০৫/২০১৮

বাধা ও মিথ ভেঙে নারী খেলোয়াড়দের অগ্রযাত্রা

-

আমাদের তুলনামূলক অনগ্রসর সমাজে প্রায় যে কোনো ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অধিক সংগ্রাম করতে হয়। ওঁদের পথে বাধা ও চ্যালেঞ্জ বেশি। ক্রীড়াঙ্গনের কথা আলাদা করে বলতে হয়। গত কয়েক বছরে সফলতার বিচারে ক্রিকেট-ফুটবল মিলে আমাদের মেয়েরা এগিয়ে। দু-মাসের ব্যবধানে এশিয়া কাপসহ তিনটি কাপ অর্জন করেছেন আমাদের ক্রিকেটার বোনেরা। অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল দল। সুইমিং-ভারত্তোনেও মেয়েদের হাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সফলতা এসেছে। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও আমাদের নারীরা পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের প্রথম কোনো সংগঠক হিসেবে ফিফার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাহফুজা আক্তার কিরণ। সাবেক ফুটবলার জয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি হিসেবে স্পোর্টস ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। এগুলো গেল দৃশ্যত সফলতার কথা।

আমরা জানি, ওঁদের জন্য ঘরে-বাইরে সবখানেই বাধা। মেয়েদের খেলাধুলা ইসলামে জায়েজ কিনা এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা লোকের অভাব নেই আমাদের সমাজে। যিনি চোখ বন্ধ করে সুদ-ঘুষ খান, তিনিও বলেন, ‘এই মেয়েদের কারণে দেশে ইসলাম থাকল না!’ অন্ধ-ধর্মীয় বোধ বাদ দিলেও, সামাজিক বোধ থেকেও আমাদের অনেকে মনে করেন মেয়েদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রীড়া না। কিন্তু আশার কথা হলো, এই বোধ ও ধারণা আস্তে আস্তে দূর হয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে মাদ্রাসার ছাত্র ও হুজুরদেরও দেখেছি বাংলাদেশের পতাকা হাতে মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখতে। এই সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এর পেছনে আমাদের সামষ্টিক অবদান তেমন একটা নেই। অবদান খেলোয়াড় মেয়েদের। আর তাঁদের পরিবারের। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁদের সফলতায় অনেকের চোখ খুলে দিয়েছে। আমাদের দেশে সবধরনের খেলাধুলায় অধিকাংশ মেয়ে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। যে-কারণে খেলাধুলায় বেতন-বৈষম্য প্রকট। যখন হয়ত সুযোগ-সুবিধা বাড়বে তখন দেখা যাবে উচ্চবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা আসছেন। এখানে সবসময় ফাউন্ডেশন গড়ে দেয় খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আলটিমেট সুবিধা ভোগ করে শিক্ষিত-নব্যশহুরে ধনিকশ্রেণি। তবে সেটা অন্য-প্রসঙ্গ, আমার বর্তমান আলোচনার বিষয় নয়।


মূল প্রসঙ্গে আসি, সরকারিভাবে নারী-পুরুষভেদে একই কাজের জন্য কোনো বেতন-বৈষম্য থাকার কথা না। পুরুষ ক্রিকেটে বোর্ডের আয় বেশি স্পন্সর, টিভিস্বত্ব, টিকিট বিক্রি ও আইসিসি থেকে তুলনামূলক আয় অনেক বেশি, তাই বেতন-কাঠামোতে পার্থক্য থাকতে পারে। সব দেশেই আছে। তাই বলে ৪ লাখের বিপরীতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা? [যেখানে ভারতে একজন নারী ক্রিকেটার পান বোর্ড থেকে মাসে ৫লাখ রুপি, বছরে ৬০ লাখ]

একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ ১০ বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারবেন। অধিকাংশ ৫ বছরের বেশি না। ফর্ম খারাপ যেতে পারে, ইনজুরি হতে পারে। এই হারে ৫ থেকে ১০ বছরের আয় দিয়ে নারী ক্রিকেটাররা করবেন কি বাকি জীবনে? ঢাকায় এই টাকায় ভালো মতো থাকা-খাওয়াও সম্ভব না। অবসর গ্রহণের পর তো অন্য-পেশায় যাওয়া মুশকিল হবে। নারী ক্রিকেটারদের খেলার বাইরে ক্রিকেটীয় পেশায় সুযোগও কম। মানে কোচ-ধারাভাষ্যকার-আম্পায়ার হওয়ার সুযোগ কম। ফলে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে আয়ের দিকে তাকালে হবে না। শুরুতে কিছু ভর্তুকি দিতেই হবে। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরে এসে বাংলাদেশে নারী স্পোর্টস একটা দাঁড়ানোর মতো জায়গায় এসেছে। আরও সময় দিতে হবে।

এ তো গেল সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে খেলোয়াড়দের সংগ্রাম ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা। ব্যক্তিজীবনেও তাদের আরও একটা সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আমাদের সমাজে বয়সভিত্তিতে ছেলেদের আগে মেয়েদের বিয়ের রীতি। খেলোয়াড় মেয়েরা এখন এই প্রচলিত মিথ ভাঙছে। এর জন্যও তাঁরা বিশেষভাবে ক্রেডিট পাবেন। পুরুষ ক্রিকেটে জাতীয় দলে যেখানে অধিকাংশ খেলোয়াড় বিবাহিত, সেখানে মেয়েদের মাত্র দুজন। [সূত্র : ক্রিকেট বিসর্জনের শঙ্কায় বিয়ে ভাবনা থেকে দূরে তারা, চ্যানেল আই অনলাইন]
চ্যানেল আই অনলাইনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাই বিষয়টির উপর আলো ফেলার জন্য। মাঠে জয়ের বাইরেও মেয়েদের

এই জয়কে উদযাপন করতে হবে। ওঁদের তাতে সাহস বাড়বে। একটা শঙ্কা আছে, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে স্বামী ও স্বামীপক্ষের পরিবার তাঁদের খেলাধুলা চালিয়ে নেওয়াতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। মেয়েদের অনেকে সেই রিস্কটা নিতে চাইছেন না হয়ত। তাঁরা খেলাধুলার ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস। আমরা দেখেছি, আমাদের পুরুষ ক্রিকেটারদের অনেকে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার পরপরই দ্রুত বিয়ে করে ফেলেন অথবা নানাকেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। সর্বশেষ মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেছেন তাঁর স্ত্রী। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে বিয়ে করেন মোসাদ্দেক। তখন তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সদস্য। বিবাহিত নন এমন খেলোয়াড়, যেমন, নাসির হোসেন, আরাফাত সানি, সাব্বির রহমানের কারণেও অনুরূপ অভিযোগে বিব্রত হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সেখানে কোনো ধরনের কেলেঙ্কারি বা শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ ওঠেনি আমাদের নারী ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে। বিয়ে-ইস্যুতে আমাদের মেয়েরা চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছেন।

২৫ বছর বয়সি ক্রিকেটার জাহানারা বলেন, ‘বিয়ে আসলে আল্লাহর হাতে। যখনই তার হুকুম হবে, তখনই হয়ে যাবে। কিন্তু আদর্শ একজন জীবনসঙ্গী মিলে যাওয়া, আর যদি না মিলে, এই দুটি বিষয়ের মধ্যে কনফিউশন থাকে। আমাকে যে বিয়ে করবে সে এবং তার পরিবার ক্রিকেটটা কীভাবে নেবে এসব আমাকে চিন্তা করতে হয়। ক্রিকেট নিয়ে বাইরের ছোট্ট কোনো বাধাও আমি মেনে নিতে পারব না। ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা বা আপসে আমি যেতে পারব না।’ [সূত্র : ঐ]

২৭ বছর বয়সি রুমানার বলেন : ‘আসলে ক্রিকেট ব্যক্তিগত জীবনকে যে ডিস্টার্ব করে না তা নয়। ক্রিকেট সবাই ভালোবাসে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো শ্বশুর-শাশুড়ি বা হাজবেন্ড চায় না তার স্ত্রী বা ছেলের বউ খেলাধুলার সাথে জড়িত থাকুক। একটা ডিস্টার্ব আসবে অবশ্যই। এখনও যখন প্রস্তাব আসে, যখন খেলাধুলার কথা জানতে পারে, তখন একটু হলেও পিছপা হচ্ছে। এটা কষ্টদায়ক। ক্রিকেটটা আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। এটার সঙ্গে কোনোকিছু মেলালে হবে না। এক্ষেত্রে হাজবেন্ড যদি বাধা দেয়, আমি মানতে পারব না।’ [সূত্র : ঐ]


একইরকম প্রত্যয় নিয়ে অন্যতম বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ২৮ বছর বয়সি সালমা খাতুন বলেন: ‘যদি আল্লাহ ভাগ্যে লিখে রাখেন, আর কেউ যদি আমাকে বিয়ে করতে চায়, হয়তো সংসার করবো। কিন্তু যা-ই করি, মাঠ ছাড়তে পারবো না। কারণ আমার কাছে মনে হয় ক্রিকেট এখন আমার জন্য খেলা নয়, দায়িত্ব।’ [সূত্র : ঐ]

বিয়ের বয়স চলে যাচ্ছে বলে পরিবার থেকে বিয়ের বিষয়ে চাপ আসছে বলেও তাঁরা জানান। আমাদের সমাজে বিয়ে করার সময় পুরুষ মানুষ পঞ্চাশোর্ধ হলেও, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বিয়ের ক্ষেত্রেও এখনো ১৮-২৫ বছরের বয়সি মেয়ে খোঁজেন। সেই হিসেবে খেলোয়াড় মেয়েরা তখন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। কিন্তু তাঁদের অনেকে সমাজের প্রচলিত এই ধারণার মূলে আঘাত করে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিয়ে এবং সন্তান জন্মদানই নারীজীবনের একমাত্র লক্ষ্য না। পৃথিবীতে মানুষের প্রবহমানতা বজায় রাখতে সকল নারীকে বিয়ে করতে এবং সন্তান জন্ম দিতে হবে না। পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ৩৮০জন নারী সন্তানসম্ভবা হচ্ছে। [সূত্র: আমার দেহখানি: পূরবী বসু, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স] এর বাইরে কেউ কেউ আসেন বিকল্পপথে হাঁটতে; কখনো কখনো আরও মহৎ কিছু করতে। তাঁদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের, এই পরিবারকে-সমাজ-রাষ্ট্রকে। আরও সাধারণীকরণ করে বলতে চাই, বিয়ে করা, না-করা এবং সন্তান জন্ম দেওয়া, না-দেওয়া একজন নারীর সম্পূর্ণ স্বাধীন সিদ্ধান্ত। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানাদিক থেকে অধর্ম-অধর্মে নামে প্রতিযুক্তি আসবেই। আমাদের সংগ্রামী নারীরা নিশ্চয় মনে রাখবেন: সমষ্টির হাত ধরে পৃথিবীতে কোনো সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হয়েছে অল্পকজন মানুষের লড়াই ও একাগ্রতা থেকে। আমাদের খেলোয়াড় বোনেরা সেই পথেই আছেন।


মোজাফফর হোসেন
ছবিঃ মাহমুদ হোসেন অপু