মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / বিবিধ / পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন
১১/১৯/২০১৮

পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন

-

প্রশ্ন:
আমি একজন ৬০ বছর বয়স্ক নারী। প্রায় ২০ বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছেন ৩টি সন্তান রেখে। আমি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। এখন অবসর নিয়েছি। আমার এবং আমার স্বামীর সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে আমি আমার সন্তানদের মানুষ করেছি। আর্থিকভাবে আমি স্বাবলম্বী। সন্তানরা সবাই বিবাহিত এবং পেশাগত জীবনে অনেক সফল। তাঁদের কাছে আমার চাইবার কিছু নেই। কিন্তু তাঁরা তাঁদের সাংসারিক এবং পেশাগত কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকে। তাঁদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি তাঁদের সর্বাত্মক মঙ্গল কামনা করি। কিন্তু বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার কারণে সন্তানদের অনুপস্থিতি একটু বেশি অনুভব করি। তাঁদের সঙ্গ কামনা করি। প্রত্যেক সন্তানের জন্যে মা-বাবার সেবা করা নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অনেক হতভাগ্য বাবা-মায়েরা যখন সন্তানদের নিদারুণ অবহেলার শিকার হয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করেন তখন কী এর কোনো আইনি প্রতিকার আছে?

ইয়াসমিন
বনানী, ঢাকা।


উত্তরঃ
মা-বাবা বার্ধক্যে উপনীত হলে সন্তানের কাছ থেকে সেবাযতেœর প্রয়োজনীয়তা একটু বেশি অনুভব করেন। তখন প্রত্যেক সন্তানের জন্যে মা-বাবার সেবা করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অনেক হতভাগ্য বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিদারুণ অবহেলার শিকার হয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করেন। সন্তানদের দ্বারা অবহেলার শিকার হয়েও তারা সন্তানদের সুখের কথা ভেবে সবকিছু মেনে নেন। আমাদের দেশে বৃদ্ধ পিতামাতার ভরণ-পোষণ দেওয়া একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে 'পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩' নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটি সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা নেই। আমি আইনটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারার উপর আলোকপাত করছি।

পিতামাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা এবং এবং তাদের সাথে সন্তানের বসবাস করার বাধ্যতামূলক বিধান রেখে সরকার ২০১৩ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করেন। পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩-এর ৩ ধারায় বলা হয়, প্রত্যেকটি সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং একাধিক সন্তান থাকলে প্রত্যেককে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে।

আইনে আরো বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। সন্তানরা তার মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে সন্তানকে বাধা দেয় তাহলে তারাও একই অপরাধে অপরাধী হবে। তাদেরকেও একই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ৩-এর (৭) অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সহিত বসবাস না করে আলাদাভাবে বসবাস করলে, সেই ক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তার প্রতিদিনের আয়-রোজগার, বা মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমতে, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে। অথবা মাসিক আয়ের কমপক্ষে দশ ভাগ পিতামাতার ভরণপোষণে ব্যয় করবে।

কোন ব্যক্তি পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন আমান্য করলে এ-ধরনের অপরাধ প্রথম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচার করা হবে। কোনো আদালত এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমলে নেবে না। আইনে আপস-নিষ্পত্তির ধারাও সংযুক্ত করা হয়েছে।

পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তার সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদন্ডেরর বিধান রাখা হয়েছে।



ব্যারিস্টার মিতি সানজানা একজন কর্পোরেট ল’ইয়ার। তিনি লিগ্যাল কাউন্সেল নামক একটি কর্পোরেট ল চেম্বার-এর পার্টনার। লিগ্যাল কাউন্সেল বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য কর্পোরেট চেম্বারস। এই ল ফার্মটি কোম্পানি আইন, ব্যাংক আইন, সিভিল আইন, জমিজমা, আরবিট্রেশন, বিদেশি বিনিয়োগ, আইটি, শ্রম আইন, চাকরি সংক্রান্ত আইন, পারিবারিক আইনসংক্রান্ত সব ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০-র উপর বিভিন্ন দেশি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আইনি সেবা দিয়ে আসছে লিগ্যাল কাউন্সেল। কর্পোরেট ল’ইয়ার-এর পাশাপাশি মিতি সানজানা একজন মানবাধিকারকর্মী। তিনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন সানজানা।