মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / আবাদ করলে ফলত সোনা
১১/১৪/২০১৮

আবাদ করলে ফলত সোনা

-

ডারউইনের বিবর্তনবাদের একটি বহুল প্রচলিত মতবাদ হলো, সারভাইভ্যাল অফ দ্য ফিটেস্ট। অর্থাৎ যোগ্যতমরাই টিকে থাকবে। যা কিছু ত্রুটিপূর্ণ, অযোগ্যÑতা ঝরে যাবে। মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক মানবতাবাদ ভিন্ন কথা বলে। মানবতাবাদ বলে যে, যারা তুলনামূলক কম যোগ্য তাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে করে তারা মিশতে পারে মূলস্রোতে; যাতে করে তারা হারিয়ে না যায়, অকালে ঝরে না পড়ে। ডারউইনের মতবাদ অনুযায়ী অটিস্টিক শিশুদের টিকে থাকার কোনো অধিকার নেই, সুযোগও নেই। কিন্তু মানবতাবাদ বলে ভূপেনের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েÑ‘বলো কি তোমার ক্ষতি/জীবনের অথৈ নদী/পার হয় তোমাকে ধরে/দুর্বল মানুষ যদি।’

ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে অটিস্টিক শিশুর জন্মকে দেখা হয় বাবা-মায়ের পাপের ফসল হিসেবে! বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন আপত্তিকর ভাবনা যে-সমাজ বহন করে, সেই সমাজের অটিস্টিক শিশুর বাবা-মাকে অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হয়। একটি অটিস্টিক শিশুর বাবা অথবা মা হওয়ার জন্য তিলে তিলে মানসিক যন্ত্রণায় নিঃস্ব হতে হয়। অথচ অটিজম কোনো রোগ নয়। এটা বংশগত বা মানসিক রোগও নয়। এটা মূলত একটি শিশুর ¯œায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। প্রকৃতপক্ষে অটিজম কেন হয়Ñতার সঠিক কারণ আজও উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের সাত নম্বর ক্রোমোজমের অস্বাভাবিকতার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে। এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশু কারো সঙ্গেই সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় না। এ ধরনের শিশুরা আপনমনে থাকতে পছন্দ করে। নিজের ইচ্ছের মতো চলে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুই হয়ে উঠতে পারে আমাদের সমাজের গর্ব, মহাতারকা। রামপ্রসাদের একটি গানের পঙ্ক্তি অটিস্টিক শিশুদের জন্য দারুণভাবে প্রযোজ্যÑ ‘মন রে কৃষি কাজ জানে না। এমন মানবজমিন রইল পতিত / আবাদ করলে ফলত সোনা।’ অটিস্টিক শিশুদের দিয়েও সেই সোনা ফলানো সম্ভব। কারণ, অটিস্টিক শিশুরা কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শিতা অর্জন করে। এদের কারো হয়তো থাকে গণিতের ওপর অসাধারণ জ্ঞান, কারো বিজ্ঞান, কেউবা অসাধারণ সব ছবি আঁকতে পারে, কারো আবার মুখস্থবিদ্যায় থাকে বিস্ময়কর দক্ষতা। অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন ছিলেন অটিস্টিক। এমন কী আইজ্যাক নিউটনের মধ্যে অটিজমের বৈশিষ্ট্য ছিল। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী এমন অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিকের উদাহরণ দেওয়া যাবে, যারা কমবেশি অটিজমে আক্রান্ত।

সুতরাং অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সুযোগ দিতে হবে বিকশিত হওয়ার। কার মধ্যে কোন প্রতিভা সুপ্ত আছে, সেটা জানা সম্ভব নয় তাদের যথাযথভাবে শিক্ষার সুযোগ করে না দিলে। সুতরাং নিজেদের কথিত সুস্থ দাবি করে আমরা যেন তাদের বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ না করি। আনন্দের কথা হলো, আমরা অটিজমের ব্যাপারে ক্রমশ সচেতন হয়ে উঠছি।
আলোর রোশনাই ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ুক অটিস্টিক শিশুর অলিন্দে।

-তাসমিমা হোসেন