মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / বিনোদন / ‘অনন্যা’ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা
১১/০৯/২০১৮

‘অনন্যা’ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা

-

এত এত ভালো চরিত্রে অভিনয় এক জীবনে খুব কম অভিনেত্রীর জীবনে ঘটে। শুধু তো চরিত্র অভিনয় নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে একের পর এক ব্যবসাসফল ছবিইবা এই সময় কয়জন অভিনেত্রী দিতে পারেন। বাংলা সিনেমার জগতে ঋতপর্ণা সেনগুপ্তা এখানে অদ্বিতীয়া, অনন্যা।

একদিকে, বাণিজ্যিক অন্যদিকে একের পর স্মরণীয় সব চরিত্রে অভিনয়- কীভাবে সম্ভব হলো। উত্তরে বলেন, আমি কখনোই চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করিনি। অনেকেই অভিনয় বন্ধ করে চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করেন। আমি সেই কাজটি কখনোই করিনি। আর সবসময় তরুণ, নবীন পরিচালকদের ছবিতে কাজ করেছি।

সম্প্রতি, ঢাকা ক্লাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপন্যাস অবলম্বনে ‘গাঙচিল’ ছবির মহরত শেষে নিজের অভিনয় ভাবনা নিয়ে কথা বলেন অনন্যার পাঠকদের জন্য। এমন ব্যস্ত তিনি, কথা বলার ফুরসত মিলছিল না। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সেলফি শিকারিদের হট্টগোল, রিপোর্টারদের ভিড় থেকে সময় বের করা যাচ্ছিল না। পরে আলাদা করে সময় দিলেন এসময় ভারতের বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা।

‘আপনার অভিনয় জীবন চলচ্চিত্রের দুটি ধারাতেই যেভাবে এগিয়েছে, এই অবস্থানে এই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে আর কাউকে দেখা যায় না। এই সাফল্যের কোনো রহস্য নেই?’ একটু চুপ করে থাকলেন ঋতুপর্ণা। চোখের দৃষ্টি যেন দূরে কিছ খুঁজে বেড়াল। মুখ নামিয়ে বললেন, প্রথমত, মানুষের আগ্রহের জায়গাটা বুঝতে হয়। কখনো মারপিটের সিনেমা খুব চলে, কখনো পারিবারিক কাহিনির টান দেখা যায়। এখন যেমন নারী-পুরুষ বা পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কের টানাপড়েন, নানা ডাইমেনশনে সম্পর্কের দেখা- এসব গল্প দর্শক পছন্দ করছে। এসবের পাশাপাশি মোবাইলেও সিনেমা দেখছে মানুষ। পরিবারের সঙ্গে বসে সিনেমা দেখার দিন চলে গেছে। এখন একা সিনেমা দেখার সময় চলে এসেছে। তাই খুব ব্যক্তিগত মুহূর্ত, অনুভূতির প্রকাশ প্রাধান্য পাচ্ছে চলচ্চিত্রে। অভিনেত্রী হিসেবে আমার কাজ হচ্ছে সেইসব চরিত্রের জন্য নিজেকে তৈরি রাখা।

পারমিতার একদিনের পারমিতা, দহনের রোমিতা, প্রাক্তনের সুদীপা, চারুলতার চারু- প্রতিটি চরিত্র যেন খেলা করছিল তাঁর মুখের ভাঁজে, কথার সুরে। ভুরুর ভাঁজে সুদীপার ঝলক। নিস্পৃহ দৃষ্টিতে কী পারমিতার ছাপ ফুটে উঠল খানিক! কিংবা দহনের রোমিতার শান্ত কথার আড়ালে যে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তার ঝলকও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো সবই তো সিনেমার চরিত্র। তাহলে! আমার সামনে বসে থাকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তার কথা বলতে গিয়ে সেইসব চরিত্রগুলো উঠে আসছিল সামনে।

ঋতুপর্ণা বললেন, আমি এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই যাতে মানুষ ঋতুপর্ণা নামে নয় আমাকে সেইসব চরিত্রের নামে মনে রাখে। চলচ্চিত্র জীবনের আয়না। সেখানে আমরা নিজেদের সমাজকে তুলে ধরি। সেই জায়গা নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে দর্শকদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করি।

সত্যিই তাই, এই তো ১৫ বছর পর প্রসেনজিৎ-এর সঙ্গে ২০১৬ সালে ‘প্রাক্তন’ করে সুপারহিট। সেই জুটিই এবার ২০১৮-তে উপহার দিলেন ‘দৃষ্টিকোণ’। এটাও হিট। এখনও জুটি হিসেবে তার সফলতা ব্যবসাসফল ছবি দেওয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছেন এই অভিনেত্রী। বাংলা চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত সব চরিত্র এসেছে আপনার হাতে। হিন্দিতেও ‘ম্যায় মেরি পত্নী ঔর উও’ রাজপাল যাদবের বিপরীতে আপনার অভিনয় ছিল অনন্যসাধারণ। কিন্তু হিন্দি ছবিতে সেভাবে সফলতা ধরা দিল না। কিন্তু ভারতে সব অভিনয় শিল্পীর স্বপ্ন থাকে হিন্দি ছবির জগতে সফল হওয়ার। উত্তরে বলেন, বাংলা আমার প্রথম পছন্দ। এই বাংলা ছবিই আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দিয়েছে। তবে এটা ঠিক হিন্দি সিনেমার জগতে সফল হওয়ার স্বপ্ন সবার থাকে।
ঋতুপর্ণার প্রথম ছবি শ্বেতপাথরের থালা মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ছবিতে তিনি অভিনয় করেন সহ-অভিনেত্রীর চরিত্রে। তিনি তখন আধুনিক ইতিহাসে স্পেশালাইজেশনসহ এমএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী। এরপর তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রভাত রায়ের এই ছবিটি সেইবছর শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসাবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

ঋতুপর্ণা ঘোষের দহন (১৯৯৭), উৎসব (২০০০), অপর্ণা সেনের পারমিতার একদিন (২০০০) ও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মন্দ মেয়ের উপাখ্যান (২০০২) ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে বাংলা চলচ্ছিত্রের চিরস্মরণয়ি অভিনেত্রীর কাতারে নিয়ে যায়। দহন ছবিতে ধর্ষণের শিকার এক নববিবাহিতা রোমিতা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ১৯৯৮ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসাবে অর্জন করেন জাতীয় পুরস্কার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও ঋতুপর্ণা খুব জনপ্রিয় একনাম।
বাংলাদেশে আমার অনেক স্মৃতি। এপার বাংলা বলি আর ওপার বাংলা কোথাও না কোথাও এটা এক হয়ে যায়। আর এই এক হওয়ার পথে কোথাও না কোথাও আমি যোগসূত্র। সত্যিই তাই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তার অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবি আছে। ঋতুপর্ণা বলছিলেন, শাবানা আপার প্রোডাকশনে কাজ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শুরু করি। এরপর তো বেশ নিয়মিত কাজ করেছি বাংলাদেশে। বললেন, বাংলাদেশে এলে এখন মন খারাপ হয়। যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তাদের অনেকেই নেই। মান্না ভাই, জসীম ভাই, হুমায়ূন ফরীদি, দিলদার। তবে বাংলাদেশে কাজ করতে ভালো লাগে।
আবারো যেন নতুন করে বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করলেন ঋতুপর্ণা। ‘গাঙচিল’-এর শুটিং শুরু হবে আগামী মাসেই, নোয়াখালিতে। নতুন রূপে দেখা মিলবে প্রিয়ংবদা ঋতুপর্ণার।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ ও লেখালিখির সঙ্গেও জড়িত ঋতুপর্ণা। জন্ম কলকাতায়। খুব অল্পবয়সেই চিত্রাংশু নামে একটি শিল্পবিদ্যালয় থেকে অঙ্কন, নৃত্য ও হাতের কাজে দক্ষতা অর্জন করেন। মাউন্ট কারমেল স্কুলে তাঁর পড়াশোনা। পরে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। আনন্দলোক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলামও লিখেছেন। ১৯৯৯ সালে বাল্যপ্রেমিক সঞ্জয় চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন।

- আসিফুর রহমান সাগর