মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / আমি মোটা, তবে কুৎসিত নই
১১/১০/২০১৮

আমি মোটা, তবে কুৎসিত নই

-

বর্তমান সময়ে আমরা মেদবহুল শরীরেরকে ‘প্লাস সাইজ’ বলে আলাদাভাবে আখ্যায়িত করি। আর একজন নারী যদি প্লাস সাইজের অধিকারী হন, তবে আমাদের সমাজে অনেকেই তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা আর বাজে মন্তব্যে মেতে উঠেন। যারা এমন বিষয়ে ঠাট্টা বা কটূক্তি করেন তাদের চিন্তা-চেতনাইবা কতটুকু স্বাভাবিক? তবে কি সৌন্দর্যের সংজ্ঞা ফিগারের হিসেবের মতো এতটাই সংকীর্ণ?

সকালে বাসের লাইন থেকে শুরু করে ঘরে ফেরার আগ পর্যন্ত অন্যরকম ভয় কাজ করে রুমার মধ্যে। স্বাভাবিকের চেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হওয়ায় ঘরে-বাইরে প্রতিদিনই অপমান বা কটূক্তি সহ্য করতে হয় তাকে। ব্যাপারটা রীতিমতো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে যখন রাস্তায় চলতে গিয়ে সমবয়সি এমনকি কখনো বয়সে ছোট ছেলেদের মুখ থেকে তার শারীরিক আকৃতি নিয়ে অশ্রাব্য কথা শুনতে হয়। দু’একবার যে সে প্রতিবাদ করেনি তা নয়; তবে তাতে লাভ হয়নি কিছুই, উল্টো কথা শুনেছে রমা। একদিন বিরক্তি ও কষ্ট চেপে ফেসবুকে বিশাল একটা স্ট্যাটাসই লিখে ফেলল সে। চলুন জেনে নিই, কী ছিল তাতে।

সাধারণত একজন নারীর শরীরের আকার ১২ থেকে ১৪ ‘সাইজ’-এর মধ্যে থাকে। অন্যদিকে ফ্যাশন মডেলদের শরীর শূন্যতেই অর্থাৎ ‘জিরো ফিগারেই’ সীমাবদ্ধ। আর ‘প্লাস সাইজ’ তথা অতিস্থূল ফ্যাশন মডেলরাও কোনোভাবেই ৬ থেকে ১৪-এর বাইরে যেতে দেন না শরীরকে। আমি কোনো ফ্যাশন মডেল তো নই-ই, কোনো প্লাস সাইজ মডেলও নই।

আমি বিশাল শরীরের অধিকারী একজন নারী এবং এই বাস্তবতা আমি কখনোই অস্বীকার করতে চাইনি। আমার শরীরে মেদ আছে তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ আসলে নেই। প্রায়শই আমি আমার শরীর নিয়ে বাজে মন্তব্যের শিকার হয়েছি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কারো কারো বাজে কল্পনারও হয়তো শিকার হয়েছি। আমি এমনও শুনেছি যে, পুরুষেরা মেয়েদের শরীরের ভাঁজ পছন্দ করে, যে-ভাবে কুকুর হাড় পছন্দ করে। তার প্রমাণ আমি পেয়েছি ঢাকা শহরের রাস্তায়, বাসে, পাড়ার গলিতে এমনকি অভিজাত রেস্টুরেন্টেও।

হাইস্কুলের ১০ সাইজের শরীরের আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকোতেই ১৮ সাইজে পৌঁছে গেলাম। দেখলাম, সত্যিকার অর্থেই শরীরের এই অবস্থা নিয়ে আমি সমস্যায় আছি। সেই কিশোরী বয়সেই আমি ম্যাগাজিনের কভারে দেখা মডেলদের শরীরের সাথে নিজের শরীরকে কোনোভাবেই মেলাতে পারতাম না।

তবে আমি আমার শরীরকে আসলেই ভালোবাসি এবং নিজেকে সুন্দর ভাবি। নিজের শরীরকে কোনো সাইজের হিসেব-নিকেশে আটকে ফেলার মতো চিন্তা আমার নেই। আমার বন্ধুরা চায় আমি যেন গ্ল্যামারের প্লাস সাইজ ইস্যুর কভারে অ্যাশলি গ্রাহামের ছবি নিয়ে আলোচনায় বুঁদ হয়ে থাকি, নিজেকে স্বান্তনা দিই। কিন্তু আমি মোটেও তা চাই না, আমি শুধু অন্য দশজন মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন চাই।

প্রতিবার একা অথবা কারো সাথে শপিং-এ গেলে আমি বেশ অস্বস্তিতে ভুগি। বারবার মনে হয়, আমি আসলে এই জায়গার সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নই। এমনকি শহরে যে হাতেগোনা প্লাস সাইজ ফ্যাশন হাউজ আছে তাতে গেলেও আমার একইরকম মনে হয়। কেননা এই দোকানগুলো স্থূলকায় মানুষদেরকে হালকা-পাতলা হওয়ার চাপ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করলেও তারাও আসলে একধরনের ‘আদর্শ’ সাইজ চাপিয়ে দিতে চায়, যার সাথে আমি নিজেকে মেলাতে পারিনি।

এভাবে দিন পার করতে করতে একদিন বাসায় এসে ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভাবলাম। একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম সমাজের সাথে আমার নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টাটা কতটা হাস্যকর ছিল। এবং সাথে এটাও বুঝলাম সমাজের তৈরি করে দেওয়া আকার-আকৃতির লেবেল এবং ক্যাটাগরিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখার কোনো মানেই নেই। নিজেকে আমার কোনো আকারে এমনকি প্লাস সাইজ ভাবারও দরকার নেই। জীবজগৎ তো আর সমাজের তৈরি করা ছোট-বড়-মাঝারি আর স্থূল আকারের হিসেব মেনে চলে না! ওজন আর আকার-আকৃতির ভিত্তিতে তৈরি এই বিভাজনকে গুরুত্ব দেয়ার কোনো মানে হয় না। মানুষের শরীরের আকার-আকৃতির বৈচিত্র্যে যে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাকেই বরং প্রাধান্য দেওয়া উচিত আমাদের। একজন নারী হিসেবে আমার শরীরের নিজস্ব ধরন এবং ধাঁচ আছে এবং আমার শরীরের মতো হুবহু শরীর আর কারো নেই। তাহলে কেন শুধু শুধু মানুষের শরীরকে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করার প্রয়াস চলছে? কবেই বা তা বন্ধ হবে। আমি মোটা, তবে কুৎসিত নই।

রুমার মতো এমন প্রতিবাদের চিত্র আমাদের সমাজেও বেশি করে দেখা যাক, নারীর সৌন্দর্যকে নির্দিষ্ট শারীরিক আকারে নিরিখ করার কুৎসিত বাসনা বন্ধ হোক।

- সানজিদা রহমান