মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / বিনোদন / দেবীঃ থ্রিলার ঘরানায় অনন্য সংযোজন
১১/১০/২০১৮

দেবীঃ থ্রিলার ঘরানায় অনন্য সংযোজন

-

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছে অনম বিশ্বাসের প্রথম নিবেদন ‘দেবী’। প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনায় অভিনেত্রী জয়া আহসান, প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলিকে নিয়ে বড়পর্দায় প্রথম কাজ অথবা মিস্ট্রি-হরর থ্রিলারজনরা নিয়ে ঢালিউডে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে নির্মিত চলচ্চিত্র; তাই বলা যায় অনেক প্রথমের মিশেল এই ‘দেবী’।

ছবিটি সরকারি অনুদান পাওয়ার পর থেকেই দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। আর শেষ দিকে চলচ্চিত্রটিকে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিনব প্রচারাভিযান দর্শকদের আগ্রহ ও প্রত্যাশার পারদকে নিয়ে গিয়েছিল অনন্য উচ্চতায়। তাইতো মুক্তি পরবর্তী কয়েকদিন সিনেমাহলগুলোতে টিকিটের জন্য বিশাল লম্বা লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।

এবার আসি সিনেমার কথায়, গল্পটি রানু নামের এক মেয়েকে নিয়ে। রানু ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। সে স্বপ্নে যা দেখে তাই সত্যি হয়। আবার একটি অদৃশ্য শক্তির ভয়ে প্রায়শই বিচলিত হয়ে পড়ে। রানুর এই সমস্যাগুলো নিয়ে তার স্বামী আনিস যোগাযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মিসির আলির সঙ্গে। রহস্য সমাধানে নেমে পড়েন মিসির আলি। একে একে উন্মোচিত হতে থাকে ধুলোয় মলিন ইতিহাসের পাতাগুলো।

হুমায়ূন আহমেদের বহুলপঠিত ও জনপ্রিয় একটি উপন্যাসকে বড় পর্দায় উপস্থাপনের যে সাহস নবাগত পরিচালক অনম বিশ্বাস দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাছাড়া এমন একটি জনরা নিয়ে কাজ করা, যেটি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশী সিনেমায় কোনো কাজ হয়নি, তার জন্যেও বাহবা পাবেন তিনি। এককথায় বললে, অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই চলচ্চিত্রটিতে হাত দিয়েছিলেন এই নির্মাতা। তবে সিনেমাটি দেখার পর মোটামুটি সবাইই একমত হবেন যে, অনম বিশ্বাসের মাঝে একজন সম্ভাবনাময় নির্মাতাকে খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশী সিনেমা।

উপন্যাসটিকে চিত্রনাট্যে মোটামুটি সফলতার সাথে অ্যাডাপ্ট করা, থ্রিলার জনরার সাথে মানানসই পেসিং ও নির্মাণশৈলীর প্রদর্শন, সাউন্ড ও ভিজুয়ালের অসাধারণ কম্বিনেশন তৈরি করে স্ক্রিপ্টের ভৌতিক উপাদানগুলোর সদ্ব্যবহার করা, এসব কিছুতে বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন অনম।

সিনেমায় রানু চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান আর মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী। দুই বাংলায় বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান তার অভিজ্ঞতার পুরোটা ব্যবহার করে রানু চরিত্রটিকে নিজের করে নিয়েছেন। হোক অঙ্গভঙ্গি অথবা ডায়ালগ ডেলিভারি, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তার কাজ বিমোহিত করবে সিনেমাপ্রেমীদের। রানু চরিত্রটি করা জয়ার জন্য শুরু থেকেই বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কেননা উপন্যাসে রানুর বয়স ও জয়ার বয়সে বিস্তর ফারাক, আর তাই অনেকেই রানু চরিত্রে জয়াকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক হৃদয়ে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। আর প্রযোজক হিসেবেও প্রথমবারেই বাজিমাত করেছেন জয়া। সিনেমার প্রচারণায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন তিনি, যা অন্য প্রযোজকদের জন্যে আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

হূমায়ূন ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মিসির আলি চরিত্রটি। প্রথমবারের মতো এই বিখ্যাত চরিত্রটি বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে বড় পর্দায়। চরিত্রটি রূপায়ণ করেছেন ‘মনপুরা’ ও ‘আয়নাবাজি’ খ্যাত চঞ্চল চৌধুরী। তিনি মনপুরায় সোনাই ও আয়নাবাজিতে শরাফত করিম আয়না চরিত্রগুলো দিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের যতটা মুগ্ধ করেছেন, মিসির আলি চরিত্রটি দিয়ে ঠিক ততটা মন জয় করতে পেরেছেন বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়নি। তবে নিজের জায়গা থেকে চঞ্চল চৌধুরীর সর্বোচ্চ চেষ্টা দর্শকের নজর এড়াবে না।

এছাড়া নিলু চরিত্রে শবনম ফারিয়ার ভালো অভিনয় তাকে নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের আশান্বিত করবে বৈকি। আহমেদ সাবের চরিত্রে ইরেশ যাকের বেশ ভালো কাজ করেছেন। তবে আরেকটু বেশি স্ক্রিনটাইম পেলে হয়ত চরিত্রে আরও প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন তিনি। রানুর স্বামীর চরিত্রে অনিমেষ আইচ হতাশ করেছেন।

কারিগরি দিকগুলোর মাঝে শব্দ ও চিত্রগ্রহণে বাহবা পাবেন দেবীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা। মনপুরা ও স্বপ্নজাল-খ্যাত চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরু দেবীর প্রতিটি দৃশ্য অত্যন্ত যত্নের সাথে ফ্রেমে বেঁধেছেন। সিনেমার ভৌতিক টোনের সাথে সাদৃশ্য রেখে ক্যামেরার মুভমেন্ট ও আলোর যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে দৃশ্যগুলোতে যেন প্রাণের সঞ্চার করেছেন তিনি। ছবিটির অভিনব সাউন্ড ইফেক্ট দর্শকদের রোমাঞ্চিত করেছে। সাউন্ড নিয়ে এত নিখুঁত কাজ বাংলা সিনেমায় এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি।

মিস্ট্রি-হরর জনরা আর সাথে কিছু সাইকোলজিক্যাল টুইস্ট সমৃদ্ধ দেবী বাংলা সিনেমার একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। রূপালী পর্দার দেবী অবশ্যই ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। তবে বাংলা সিনেমার নবজাগরণের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সিনেমাটি দর্শকদের স্মৃতিতে থাকবে অনেকদিন। আর তাই যবনিকায় একটা কথাই বলা যায়, দেবী স্বপ্ন দেখায় বাংলা সিনেমার নতুন দিনের!

- হোসাইন মাহমুদ আব্দুল্লাহ