মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / প্লাস সাইজ, সমাজ ও সৌন্দর্যের পরিমাপক
১১/০৫/২০১৮

প্লাস সাইজ, সমাজ ও সৌন্দর্যের পরিমাপক

-

‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’, নারীর যৌগ্যতা পরিমাপের মানদন্ড হিসেবে যুগ যুগ ধরে এই কথাটি রীতিমতো আপ্তবাক্য হিসেবে চলে আসছে আমাদের সমাজে। নারীকে দর্শনধারী হতেই হবে, আর তা হতে গেলে একেবারে প্রাথমিক দুটি যোগ্যতা হলো গায়ের ফর্সা রঙ এবং স্লিম ফিগার। নারীর সৌন্দর্যকে নির্দিষ্ট শারীরিক কাঠামোতে মেপে যাচাই-বাছাই করার যে কুৎসিত প্রতিযোগিতা আমাদের সমাজে রয়েছে তা দেখে বলতেই হয় আদৌ কি আমরা সভ্য হয়েছি? যে বিবেকবোধ মানুষকে অনন্য করেছে এমন দৃষ্টিভঙ্গি কি তাতে চরম চপেটাঘাতের সামিল নয়?

বলিউড, হলিউড কিংবা ফ্যাশন দুনিয়া সম্পর্কে খোঁজখবর যারা রাখেন তারা নিশ্চয়ই ‘জিরোফিগার’ কনসেপ্ট সম্পর্কে জানেন। ‘প্লাসসাইজ’ সম্পর্কে কি জানেন? প্লাসসাইজ হলো মূলত মেদবহুল বা সোজা বাংলায় মোটা শরীরকে বোঝায়। তবে নেহাতই শারীরিক আকার-আকৃতির পরিমাপক হিসেবে এই কনসেপ্ট সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের নানাপ্রান্তে প্লাস সাইজের স্ব-স্ব দেশিয় ভাষায় নারীকে বারবার অবজ্ঞাসূচকভাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশে তা আরো তীব্র, প্লাস সাইজকে রীতিমতো ইভটিজিং-এর অন্যতম টার্গেট বানিয়ে নারীকে প্রায় প্রতিদিনই অপমান করা হয় আমাদের সমাজে। মেদবহুল শরীর এখানে নারীর জন্য শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ঝুঁকি নয়, বরং কিছু বিকৃত মানসিকতার পুরুষের অযাচিত কটূক্তি ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌনহয়রানির শিকার হওয়ার একটা বিশাল সম্ভাবনাও বটে। বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে মেয়েরা নিরাপদ নয়, এটা বুঝতে হলে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না, পরিবারের কোনো নারী সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেই হয়। আর নারী যদি হন স্থূলকায় তবে তাকে উত্যক্ত করাটা যেন এক নতুন মাত্রা পায় এবং বলাই বাহুল্য যে উত্যক্তকারীর ভাষা শোনার যোগ্য নয়, মেনে নেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

ইয়াহুর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, শতকরা ৯৪ ভাগ নারী নিজের শারীরিক আকার-আকৃতি নিয়ে কখনো না কখনো অন্তত একবার বাজে মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। আর যদি নারী স্থূলকায় হয় তবে তা প্রায় শতভাগ বলাই যায়। নারীর প্রতি এমন অনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল উন্মোচন করতে গেলে ঘুরেফিরে সেই একই কারণই আসে। এই প্রায় একই কারণে নারী ঘরে-বাইরে যৌনহয়রানির শিকার; ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শেঁকড় ও এই কারণের মধ্যে পোঁতা। এক কথায় এই কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং বিশ্বের সর্বত্র মহামারীর আকার ধারণ করা লিঙ্গবৈষম্য। এর সঙ্গে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার যে প্রবণতা ও প্রতিযোগিতা রয়েছে তার প্রভাব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে নারীকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা এবং এর প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট একটি শারীরিক আকৃতিতে সৌন্দর্য পরিমাপের অনৈতিক প্রক্রিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে এসেছে। আঠারো শতকের শুরু দিক থেকে পশ্চিমা ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নারীদের Stays নামের ফিতাযুক্ত শরীরবন্ধনী পরিধান করতে হতো। পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে, নারীর শরীরের উপরি ভাগকে সরু দেখানোর জন্যই মূলত এই ফিতা পরিধানের চল শুরু হয়। পরের শতাব্দীর শেষভাগে এসে নারীরা পোশাকের পেছনে উঁচু প্যাড ব্যবহার করতে শুরু করেন যা Bustle নামে পরিচিত। এর সাথে সাথে শরীরের উপরিভাগ সরু দেখানোর প্রবণতা তখনো অব্যাহত ছিল।

বিংশ শতাব্দীতে এই শরীরবন্ধনীর হাত থেকে মুক্তি পেলেও ততদিনে নারীকে একটি নির্দিষ্ট দৈহিক কাঠামোতেই সুন্দর দেখায় এমন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে পোশাক হয়ে উঠে ফ্যাশনের প্রধান উপকরণ। হাতেগোনা কয়েকটি দৃষ্টান্ত বাদ দিলে এই ফ্যাশন শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট দৈহিক কাঠামোর নারীদের জন্যই প্রযোজ্য থেকেছে, প্লাস সাইজ নারীদের এখনো এর মধ্যে সার্বিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বিনোদনের প্রায় সব কয়টি মাধ্যমে মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন ছিপছিপে গড়নের নারী। এরপর একেবারে মেদহীন শারীরিক আকারের কনসেপ্ট নিয়ে আসা ‘জিরো ফিগার’-এ গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বুঁদ হয়ে আছে বিশ্ববাসী। প্লাসসাইজ- তাই কোনোভাবেই সৌন্দর্যের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।

লাইফস্টাইলের পার্থক্যের কারণে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মেদবহুল মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই এটা বড় ধরনের একটা স্বাস্থ্য সমস্যা। তবে এই প্লাস সাইজের বৃদ্ধি ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সব লিঙ্গের মানুষদের মধ্যেই প্রায় সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। একজন পুরুষ মানুষের বেঢপ আকার ধারণ করা ভুঁড়ি নিদেনপক্ষে হাস্যরসের জন্ম দেয়, কখনোই তা শারীরিক ত্রুটি কিংবা যৌন হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। বিপত্তির শুরু হয় ব্যক্তি যদি একজন নারী হন। সমাজের এমন দ্বিমুখী আচরণের ফলে নারীর মনের মধ্যেও এই তথাকথিত সৌন্দর্যের ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে। ২০১৬ সালে ডাভের বৈশ্বিক রিপোর্টে দেখা যায় নিজেদের শারীরিক আকৃতি ও সৌন্দর্য নিয়ে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী অসন্তুষ্টি এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা আরো ভয়ংকর। মোটা হয়ে গেলে বিয়ে হবেনা জীবনে এমন উদ্ভট কথাবার্তা শোনেননি এমন নারী এদেশে খুঁজে পাওয়া মুশকিল!

প্লাস সাইজ বা মেদবহুল শরীরের অধিকারী কোনো নারীকে সুন্দর বলতেই হবে এমনটা কিন্তু নয়। সৌন্দর্য পরিমাপের একক হিসেবে ঠিক কী কারণে দৈহিক আকৃতি বিচার করা হবে! তবে কি যে বিবেক, বুদ্ধি এবং মনন মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীবের স্বীকৃতি দেয় তা মোটেও সুন্দর নয়? সভ্যতার বিকাশের সর্বোচ্চ শেখর স্পর্শ করতে চলা মানবজাতি যখন পৃথিবী পেরিয়ে মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে তখন এই প্রশ্নের উত্তরগুলো বের করা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। নাহলে আরো কয়েকশ বছর পরেও মঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রহে বসবাস করা মানুষ ঘুরেফিরে ঠিক একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলবে এবং ফলাফলের খাতায় শূন্যই মিলবে।

- নাইব রিদোয়ান
ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী