রবিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / এস্টি লডার বা এসটে লডার
১০/১৫/২০১৮

এস্টি লডার বা এসটে লডার

- সালেহা চৌধুরী

এস্টি লডার উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কোনো এক কসমেটিক কোম্পানির কথা মনে পড়ে। এই নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তাহলে এই নামটা এল কোথা থেকে? নামটা এসেছে একজন নারীর নাম থেকে। যদিও তাঁর আসল নাম জোসেফিন এসথার মেন্টজার। কিন্তু তিনি পরিচিত এস্টি লডার নামে।
ছোটবেলায় এস্টি লডার বাবার সঙ্গে লোহা-পেড়েকের দোকানে কাজ করত। বাবার অবস্থা ভালো ছিল না। একজন ইমিগ্রান্ট কোনোমতে জীবন চালাতেন। তাঁরা নিউইয়র্কে এসে বসবাস করতে শুরু করেন। মা হাঙ্গেরিয়ান আর বাবা চেক। তখনি বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতে ব্যবসা করবার মতো খানিকটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল এস্টি লডার। এরপর আর একটা কাজ শুরু করেন। চাচা নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে নানাসব ফেসক্রিম তৈরি করতেন। তিনি আসলে ছিলেন একজন কেমিস্ট। এটার সঙ্গে ওটা মিশিয়ে নানা কিছু বানাতে পারতেন। একদিন তিনি ভাতিজি এস্টি লডারকে বলেন, তুমি কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব বিক্রি করতে পারবে না। তখন অবশ্য এস্টির নামের সঙ্গে লডার ছিল না। বিয়ে করবার পর তিনি লডার হন। ভাতিজি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে ঘুরে এগুলো বিক্রি করতে শুরু করে। একবার এমন এক বিক্রির কারণে একটি বিশাল বড়লোকের বাড়ি দেখে। যার স্পা বা সুইমিংপুল এবং অন্যান্য বিলাসী ব্যবস্থা দেখে একেবারে থ খেয়ে যায় ছোট এস্টি। আর দেখে একজন বড়লোক নারী খুব দামি একখানি সিল্কের শার্ট পরে আছে। সে শার্ট থেকে এস্টি লডার চোখ ফেরাতে পারে না। নারী তাঁকে প্রশ্ন করেন- এমন হ্যাংলার মতো তাকিয়ে আছো কেন? এস্টি লডার বলেন, আমি কেবল জানতে চাই, এই যে সিল্কের শার্টটি আপনি পরে আছেন সেটা কোথায় থেকে কিনেছেন? নারী রুক্ষ গলায় উত্তর দেন, শুনে কি করবে? এ শার্ট তোমার জন্য নয়। আমাদের মতো বড়লোকদের জন্য। নারী রেগে বলেন, ভাগো। এইভাবে তাকিয়ে থাকবে না। অবশ্য এমন একটা প্রশ্ন করতে গেলে রীতিমতো সাহস দরকার। সেই আগুনের মতো গনগনে কঠিন চোখে তার দিকে তাকান।
বলেন, আবার- শুনে কি করবে? তোমার তো কখনো সাধ্য হবে না এমন একখানা শার্ট কিনবার। সাহস তো তোমার খুব, আমাকে এমন প্রশ্ন করছো। এই একটি বাক্য! এসস্টি লডার তখনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন- একটা নয় এমন হাজার হাজার শার্ট কিনবার মতো অবস্থা আমার হবে। হতেই হবে। যেমন করে হোক।

নারীর কথায় যে আঘাত ও লজ্জা পেয়েছিলেন তাই তাকে বদলে দিল। চাচাকে বললেন, চাচা আমাকে ভালোমতো শেখান কি করে ফেসক্রিম, বডিক্রিম এইসব বানানো যায়। চাচা বললেন, কেন? চাচা, আমাকে অনেক বড়লোক হতে হবে। তারপর সব কথা খুলে বলে। চাচা বললেন, আমি যা শেখাব সেখানে মেশাতে হবে তোমার বুদ্ধি আর তোমার সৃষ্টিশীল সত্তা। কেবল আমি যা বলব, তা নয়। এরপর চাচার কাছ থেকে শিখলেন কিভাবে ভালো ফেসক্রিম বানানো হয়। এর সঙ্গে সুগন্ধি এসেন্স, লিপস্টিক, পাউডার এবং আরো নানাকিছু। এবং যা বানাতে লাগলেন, সবই মস্ত সাড়া ফেলে দিল। প্রথমে একটি দোকানের একটি কোণ চেয়ে নিলেন। সেখানে সাজিয়ে রাখলেন তার নিজের বানানো জিনিসপত্র। অনেক বড় বড় দামি দোকানের মধ্যে তাঁর জিনিসগুলো বিক্রি হতে শুরু হলো। এরপর অনেকেই বলতে লাগলেন, তাঁর বানানো জিনিসগুলো দারুণ। প্রশংসা আর অর্থ আসতে শুরু করলো প্রপাতের মতো।
তিনি তাদের বললেন, তাঁর সামনে এগুলো ব্যবহার করতে। দু’একজন সেলস গার্ল এইসব খরিদ্দারকে সাজিয়ে দিলেন। তিনি নিজেও সাজালেন। মুখে ক্রিম ঘসে, লিপস্টিক লাগিয়ে, চোখ সুন্দর করে আয়নায় মুখ দেখতে বললেন। সুগন্ধি এসেন্সে খুশিমনে ফিরে গেলেন তাঁরা। এরপর যারা এসব কিনতে আসে তিনি তাদের একটি করে লিপস্টিক উপহার দিতে শুরু করলেন।
এরপর আস্তে আস্তে সারা পৃথিবীতে বড় বড় দোকানে এস্টি লডারের কাউন্টার তৈরি হলো। বিক্রি হতে লাগল দেদার।
নানা জিনিসের সঙ্গে গোসলের তেল বানিয়ে নাম দিলেন- ‘ইউথডিউ’। একেবারে হিট। সকলে ‘ইউথডিউ’ ভালোবাসে। কিনতে চায়। তিনি বানিয়ে আর শেষ করতে পারেন না। এরপর যোগ করলেন পুরুষের জন্য নানা কসমেটিকস। নানাসব এসেন্স। আফটার শেভ। বডি স্প্রে ইত্যাদি।
নিজের কাছে যে প্রতিজ্ঞা করছিলেন তা পূর্ণ হলো। তিনি খুব তাড়াতাড়ি পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মালিক হলেন। এরপর আরো। একটি ঘৃণার ও অহংকারের তিরস্কার এস্টি লডারকে অন্যতম বড়লোক বানিয়ে ফেলল।
এরপর দেখা গেল তিনি আমেরিকার এমন একজন বড়লোক, যার নাম সকলে আনন্দের সঙ্গে উচ্চারণ করে। লক্ষ লক্ষ অমন সিল্কের শার্ট কিনতে পারেন, বিলাতে পারেন। ভাগ্যলক্ষ্মী সমস্ত দরজা খুলে দিয়েছে তাঁকে। তাঁর পরিশ্রম সার্থক ও সফল।
কেমিস্ট চাচার সবকিছু জেনে নিয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে ছিলেন নিজের বিচারবুদ্ধি এবং সৃষ্টিশীলতা। ফলে যেটা করেছেন একেবারে হটকেকের মতো বিক্রি হয়ে গেছে। বলতেই হয় তিনি নিজে ছিলেন একজন প্রতিভাময়ী ব্যবসাবুদ্ধিসম্পন্ন নারী। ১৯৪৬ সালে বিউটি কোম্পানি স্থাপন করেন। তাঁর স্বামী জোসেফ লডার তাঁর সঙ্গে কাজ করতেন। তাঁর দুই ছেলেও মায়ের কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালের পর তাঁর যুগান্তকারী ‘ইউথ ডিউ’ গোসলের তেল এবং পারফিউম তাঁকে প্রচুর লাভবান করে। নানাধরনের সামগ্রী ছিল তাঁর। ক্লিনিক, এস টে লডার, ববি ব্রাউন, ক্রিম ডি লা মার এমনি নানাধরনের সামগ্রী। তিনি জানতেন একজন নিজেকে সুন্দরী দেখাতে টাকাপয়সা খরচ করতে কার্পণ্য করে না। এবং তিনি তাঁদের হৃদয়ে একজন হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত সব নারী তাঁর দোকানে আসতে শুরু করে। গ্রেস কেলি, প্রিন্সেস ডায়ানা, এলিজাবেথ টেলর। সকলেই তাঁর কথা জানতে চায়।
১৯৮২ সালে স্বামী মারা গেলে তিনি স্বামীর নামে একটি বিজনেস ইনসটিটিউট স্থাপন করেন। যেখানে বিজনেস পড়ানো হয়। তাঁর বাবা-মা জুয়িশ ইমিগ্রান্ট ছিলেন। কিন্তু চাচার ছিল বিজনেসের মস্তিষ্ক। সেখান থেকেই এস্টি লডার শিখেছিলেন অনেককিছু সেটা আমি আগেই বলেছি।
তাঁকে অনেক প্রকার মেডেলও পুরস্কার দেওয়া হয়।
এস্টি লডারের জন্ম ১৯০৬ সালে। মারা যান ২০০৪ সালে। এরপর তাঁর দুই ছেলে ব্যবসা দেখাশোনা করেন।
সামান্য একটা বকুনি থেকে একজন এতবড় হতে পারে তার প্রমাণ এস্টি লডার। ভাবা যায়?