মঙ্গলবার,১৬ অক্টোবর ২০১৮
হোম / ফিচার / রমা চৌধুরীঃ সর্বংসহা এক বীরাঙ্গনার কথা
১০/০৪/২০১৮

রমা চৌধুরীঃ সর্বংসহা এক বীরাঙ্গনার কথা

-

"মুক্তিযুদ্ধ আমার কাঁধে ঝোলা দিয়েছে। আমার খালি পা, দুঃসহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান। আমার ভিতর অনেক জ্বালা, অনেক দুঃখ। আমি মুখে বলতে না পারি, কালি দিয়ে লিখে যাব। আমি নিজেই একাত্তরের জননী।"

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু মুক্তির স্বাদই দেয়নি, অনেককে দিয়েছে লাঞ্ছনা, সন্তান-সম্ভ্রম হারানোর দুঃখ। সব হারিয়ে মুষড়ে পড়ে হারিয়ে যাওয়া যেখানে অনেকের ভাগ্য ছিল, সেখানে নিরন্তর মাথা উঁচিয়ে সংগ্রাম করে যাওয়া এক অদম্য নারীর উপাখ্যান বলা যায় বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর জীবনকে।

একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী তার সারাজীবনের সংগ্রাম শেষ করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন গত ৩ সেপ্টেম্বর। একজন হার না-মানা সাহসী নারী যিনি একাধারে একজন বীরাঙ্গনা, লেখিকা -- সেই অনন্যা শীর্ষদশ ২০১৩ সম্মাননায় ভূষিত রমা চৌধুরীকে নিয়েই আজকের লেখনী।

পরিচয়
১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালি উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্ম নেন রমা চৌধুরী। অসম্ভব মেধাবী এই মানুষটি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকত্তোর। শুধু এখানেই পড়াশোনায় ক্ষান্ত দেননি রমা চৌধুরী, ১৯৬২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। ১৯৬২ সালেই শুরু করেন কর্মজীবন, কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে। সুদীর্ঘ ১৬ বছর তিনি দেশের বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

সীমাহীন শোকেও হার না-মানা একনারী
শত গুণে গুণান্বিতা অদম্য এই মেধাবী নারীর জীবনটি শুধুই দুঃখ-কষ্ট আর সংগ্রামে ভরা। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান। এসময় রমা চৌধুরী তাঁর তিন শিশুসন্তানকে আর মাকে নিয়ে পোপাদিয়ায় নিজ বাড়িতেই থাকতেন। ১৯৭১ সালের ১৩ মে পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় পাকসেনারা তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর সম্ভ্রম। এতেও ক্ষান্ত হয়নি নরপশুরা, পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের ভিটে। নিজের প্রাণ বাঁচাতে পুকুরের পাশের ঝোপে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। এত অমানুষিক নির্যাতনেও তাঁর দুর্দশা শেষ হয় না, বরং এটি ছিল শুরু। পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের কাছ থেকে জুটতে থাকে ক্রমাগত লাঞ্ছনা আর অপবাদ। একজন ধর্ষিত নারীর কপালে এই সমাজে যা ব্যবহার জুটে তাই জুটেছিল, কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি তাঁর। যুদ্ধের বাঁকি দিনগুলো তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন। দরজা জানালাবিহীন পোড়া ভিটেতে শীতের রাতে বস্ত্রবিহীন নির্ঘুম রাত কেটেছে মাটিতে।

এমনই দুর্দশার মাঝে বিজয়ের ঠিক আগের দিন রমা চৌধুরীর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, সারাদেশ যখন বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা, রমা চৌধুরী তখন সন্তানকে বাঁচাতে মরিয়া। ২০ ডিসেম্বর রাতে সাগর মারা গেল। ঠিক এর ১ মাস ২৮ দিন পর দ্বিতীয় সন্তানও নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়েই মারা গেল। সম্ভ্রম, ভিটে আর দুই সন্তান হারিয়ে রমা চৌধুরী তখন পাগলপ্রায়। তখন থেকেই তিনি জুতা পরা বাদ দেন। খালিপায়ে চলাফেরা করতেন। তিনি বলতেন, ছেলেরা ঘুমিয়ে আছে এই মাটিতেই, জুতা পায়ে কিভাবে হাঁটা যায়? সন্তানহারা এক মায়ের বুকচেরা ভালোবাসা তাকে জুতা পরতে দেয়নি, কিছুদিন অনিয়মিতভাবে সবার অনুরোধে জুতা পরেছিলেন, কিন্তু ১৯৯৮ সালে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া ছেলে টুনুও মারা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে। এরপর থেকে এই নারী আর জুতা পরেননি।

যুদ্ধপরবর্তী কিছু বছর তিনি আবার শিক্ষকতা করেন, তবে সেখানেও প্রতারণার শিকার হয়ে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে টিউশনি করে অনেক বছর চলেছেন, পরে তাও অসুস্থতার কারণে ছেড়ে দিতে হয়। এরপর বেছে নেন লেখ্যবৃত্তি। কারও দয়াদাক্ষিণ্য তিনি গ্রহণ করতেন না। নিজের বই ফেরি করে বিক্রি করতেন তিনি, তাতেই দিন চলত কোনোরকম। চট্টগ্রামের চেরাগি পাহাড় মোড়ের লুসাই ভবনের চার তলার এক কামরায় থাকতেন একা, পুত্রশোক ভুলতে অনেকগুলো বিড়াল পুষতেন। এদের নিয়েই কেটে যেত সময়। জীবনের শেষের দিকে দীর্ঘ সময় নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ভুগেছেন দিনের পর দিন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে যায় তাঁর। সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ তে নেয়া হয়, সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বোয়ালখালির গ্রামের বাড়িতে এই বীরাঙ্গনাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

সৃষ্টিশীলতা আর মুক্তচিন্তার আলোকবর্তিকা
রমা চৌধুরী একজন প্রগতিশীল মুক্তিকামী মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন মুক্তির সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। তাই তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সেই মুক্তির লড়াই চালিয়ে যেতেন। তাঁর রচনা সম্পূর্ণ স্বনির্বাচিত আর স্বতন্ত্র ছিল। নিজের লেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অন্ধ সমাজব্যবস্থা আর অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সমাজসচেতনমূলক বাস্তবধর্মী লেখাই মূলত আমি লিখে থাকি। এর মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার, ভ্রান্তধারণা, সাম্প্রদায়িকতা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ অর্থাৎ শ্রেণিবৈষম্য দূর করাই আমার লেখার উদ্দেশ্য।"

প্রবন্ধ, উপন্যাস আর কবিতা মিলিয়ে মোট ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’ যেন তাঁর জীবনসংগ্রাম আর চিন্তাচেতনার এক জীবন্ত দলিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হলো-

- একাত্তরের জননী;
- ১০০১ দিন যাপনের পদ্য;
- আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন;
- ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ;
- অপ্রিয় বচন;
- লাখ টাকা;
- হীরকাঙ্গুরীয়;
- সপ্তরশ্মি;
- চট্টগ্রমের লোক সাহিত্যের জীবনদর্শন প্রভৃতি।

রমা চৌধুরী ছিলেন মুক্তবুদ্ধির মানুষ, তিনি সমাজের কুসংস্কার আর পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার বিপক্ষে ছিলেন। নিজের সন্তানদের শব তিনি পোড়াননি, কেননা তা মানতেন না। তাঁর বদলে মাটিচাপা দেন তাদের। আর এজন্যই খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতেন।

আত্মসম্মানবোধের একজ্বলন্ত উদাহরণ ছিলেন। শত দুঃখ কষ্টেও কারও দান নেননি কোনোদিন। মাথা উঁচু করে চলতে চেয়েছেন জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। নিজের বই বেঁচে চালাতেন খরচ। নিজের পোড়া ভিটেতে ‘দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয়’ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন হাজার অভাবের মাঝেও। সমাজসেবার মহানব্রত এই মহীয়সী নারীর মধ্যে বিদ্যমান ছিল সর্বদা।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, লাখো বীরাঙ্গনার আত্মদান বা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াই- যাই বর্ণনা করা হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত ইতিহাস আজও অলিখিত। সেই ইতিহাসের সাক্ষী রমা চৌধুরীরা, যারা সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাঙালির মুক্তির লড়াই রমা চৌধুরীর সব কেড়ে নিয়েছে, তবু তাঁর চোখের স্বপ্ন আর সংগ্রামী চেতনাকে ক্ষয় করতে পারেনি একটুও। রমা চৌধুরী তাঁর লড়াকু চেতনা আর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে বেঁচে রইবেন সকলের মাঝে, যুগ থেকে যুগান্তরে।

- তানভীর ইসলাম