মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / জীবনযাপন / ছেলেকে 'ফেমিনিস্ট' মানসিকতায় বড় করতে চান?
০৯/২৩/২০১৮

ছেলেকে 'ফেমিনিস্ট' মানসিকতায় বড় করতে চান?

-

ইদানীংকালে যৌনহয়রানি ও যৌনসহিংসতার মতো গুরুতর ইস্যুগুলো তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের কল্যাণে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের আলোচনায় আটকে নেই যেন। যৌনহয়রানি, নারীবাদ, নারীঅধিকার, মুক্তচিন্তা এসব ধারণাগুলো শিশুতোষ বিষয় না হলেও তথ্যের অবাধ চলাচলের যুগে এসে ছোটদের কাছ থেকে এসব গুরুতর বিষয়গুলো থেকে দূরে রাখাটা একটু কঠিনই বটে। তবে যতটা সহজে এসব গুরুগম্ভীর বিষয় ছোটদের কানে পৌঁছাচ্ছে, তাদের কাছে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করাটা ততটা সহজ না-ও হতে পারে। কারণ নারী অধিকার বিষয়ে বেশিরভাগ মানুষের নিজেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। নিজের ছেলে, এমনকি মেয়ে সন্তানটিকেও নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতন বা ফেমিনিস্ট মানসিকতায় গড়ে তোলার জন্য তাই আপনার নিজেরই উদ্যোগ নিতে হবে।

অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বদের তালিকায় বৈচিত্র্য রাখুন
আপনার ছেলে সন্তানটিকে নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য তাকে শুধু অনুসরণীয় নারীদের জীবনী বা গল্পই শোনাতে হবে, এমন নয়। বরং তাকে বলুন যে, ছেলে বা মেয়ে কেউই কারো চেয়ে লিঙ্গের ভিত্তিতে এগিয়ে নেই। ছেলে সন্তানদের এমন সব পুরুষ ব্যক্তিত্বদের কথা জানান, যারা নারী অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার, যেমন- কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। যেসব গল্প ও সাহিত্যে নারী-পুরুষ সমতার কথা রয়েছে সেসব গল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে সন্তানদের পরিচয় করিয়ে দিন।

আপনি নিজে কথা বলার সময় কী বলছেন লক্ষ্য রাখুন
‘ছেলেদের কান্না করতে হয় না’ জাতীয় কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকুন। নারী অধিকারের মূলমন্ত্র হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা। তাই সন্তানকে সবসময় বলুন ছেলেমেয়ে প্রত্যেকে সমান। একজন ছেলে যা কিছু করতে পারে তার সবকিছুই একজন মেয়েও করতে পারে। আবার একজন মেয়ে যেসব কাজ করতে পারে তা একজন ছেলেও করতে পারে। আপনি নিজেও বিভিন্ন কাজে ও কথাবার্তায় এটি প্রকাশ করুন। কারণ আপনি যা বলছেন এবং করছেন, তার সবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিখছে আপনার সন্তান।

সম্মতি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করুন আগেই
কারো সম্মতি ছাড়া তার শরীরে হাত দেওয়াটা অনুচিত, এটা সন্তানকে যত শিগগিরই শেখানো যায় ততই উত্তম। শুধু নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই যে এটা জানা জরুরি তা-ই নয়, বরং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকাটা সবার জন্যই জরুরি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরই, বিশেষ করে পুরুষদের ‘ব্যক্তিগত দূরত্ব’ সম্পর্কে ধারণাই নেই। দু’জন মানুষের মধ্যে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে ঠিক কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখতে হবে তা-ই তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনার সন্তানকে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি আদরের ছলে ধরতে এলে তাদেরও আপনি বিরত রাখুন এবং তাদের বলুন, অনুমতি ছাড়া আপনার সন্তানকে না ধরতে। এছাড়া এমনকি পরিচিত কারো আদরে যদি আপনার সন্তান অস্বস্তি বোধ করতে থাকে তাহলে আপনার সন্তানকে সেই ব্যক্তির কাছে যাওয়ার জন্য জোর করবেন না।

অন্যান্য অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করুন
আপনার সন্তানের সঙ্গে নারীবাদ, যৌননিপীড়ন, সমকামিতা, মুক্তচিন্তা প্রভৃতি জটিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কীভাবে আলোচনা করবেন সে-বিষয়ে অন্যান্য অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করুন। এর মধ্যে দিয়ে আপনি নতুন কোনো উপায়ে কথা বলার কৌশল জেনে নিতে পারেন, যা আপনি হয় তো আগে ভাবেননি। তাছাড়া অভিভাবকদের মধ্যে এসব বিষয়ে আলোচনার ফলে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণাও দূর হওয়ার পথ তৈরি হয়।

মহৎ সাহিত্য ও জীবনীগুলো পড়ুন একসঙ্গে
আপনার সন্তানকে নেলসন ম্যান্ডেলা, অ্যালেন টিউরিং, ফ্রিদা কাহলো, রোজা পার্কসের মতো লড়াকু নেতা ও মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পড়তে দিন। তবে পড়তে দিয়েই দায়িত্ব শেষ বলে মনে করবেন না। মহৎ ব্যক্তিদের জীবনীগুলো সন্তানের সঙ্গে বসে নিজেও পড়ুন, সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন তাদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে। এছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য একসঙ্গে পড়লে ও আলোচনা করলে সন্তানের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটানোর সুযোগও মিলবে আপনার যা সন্তানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আপনার সন্তান কী দেখছে লক্ষ্য রাখুন
আকাশ সংস্কৃতির যুগ ছাপিয়ে এখন অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ফলে সবার জন্যই সব ধরনের বিনোদন এখন উন্মুক্ত। এই অবাধ সুযোগের যুগে সন্তান কী দেখছে, কী নিয়ে খেলছে, কী শুনছে সেদিকে খেয়াল রাখুন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সন্তানের নিজের একটি ব্যক্তিগত জগৎ তৈরি হয়ে ওঠার আগেই এই জগতের বিপজ্জনক দিকগুলো সম্পর্কে তাকে জানিয়ে রাখুন।

গতানুগতিক ধ্যানধারণাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলুন
গতানুগতিক ধ্যানধারণাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন। এজন্য গতানুগতিক ধারণাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভ্যাস তৈরি করুন নিজের ভেতর। ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও মেধাবী- এমন ধারণা মেয়েদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে ছেলেদের মধ্যে অহেতুক আত্মম্ভরিতার জন্ম দেয়। তাই ছেলে সন্তানটিকে মনে করিয়ে দিন যে শুধু ছেলে বলেই সে বুদ্ধিমান তা ধরে নেওয়া যাবে না। মেয়েদের মতামতও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

এছাড়া প্রচলিত কিছু ধ্যানধারণা, যেমন- ছেলেদের কাঁদতে নেই, ছেলেদের রং নীল মেয়েদের রং গোলাপি, ঘরের বাইরের কাজ ছেলেদের আর ভেতরের কাজ মেয়েদের, ছেলেরা মাঠেঘাটে ফুটবল খেলবে, যন্ত্রপাতি, গাড়ি নিয়ে খেলবে আর মেয়েরা ঘরের ভেতর পুতুল, হাঁড়িপাতিল নিয়ে খেলবে প্রভৃতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। ছেলে সন্তানকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে বলুন এবং তাতে উৎসাহ দিন। মেয়েদেরকে মাঠে খেলতে পাঠান এবং শরীরচর্চায় উৎসাহ দিন। কান্না আটকে রাখা অথবা ছিঁচকাদুনি অভ্যাস কোনোটিই কারো জন্যই ভালো নয়, তাই ছেলেমেয়ে উভয়কেই তাদের আবেগ প্রকাশের যথাযথ পরিবেশ দিন এবং তাদের মনোভাবের কারণ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন।

আলোচনা করুন সব বিষয়েই
সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন সব বিষয় নিয়ে। এমনকি যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে আপনি অস্বস্তিবোধ করছেন সেসব বিষয়েও আলোচনা উঠলে সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দিন যথাসম্ভব গুছিয়ে। সন্তানকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন। আপনার সন্তানের সঙ্গে আপনার খোলাখুলি আলোচনা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, যা ভবিষ্যতে কঠিন সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে।

- কাজী শাহরিন হক
ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী