মঙ্গলবার,১৬ অক্টোবর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / কুয়াশা ছেঁড়া রোদ
০৯/২৩/২০১৮

কুয়াশা ছেঁড়া রোদ

- দীলতাজ রহমান

আয়োজন শেষের মণ্ডপের মতো সুরম্য প্রাসাদের বিশাল পরিসরটি খা খা করছে। তাজা ফুলের সাজানো ডালাগুলো যেন বিদ্রুপ করছে ‘সবাইকে তোমার চেনা হয়নি মোহাম্মদ জামিল! আকাশছোঁয়া দম্ভে ঘড়ির কাঁটাটি রাত বারোটার ঘরে ছুটতে দেখে অসহ্য হয়ে ওঠে জামিল। কেন সে এভাবে পতিত হয়ে গেলো? তার ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে ওই কালো মেয়েটিকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কীসের এত দম্ভ তোমার? দু’হাতে কপালের দু’পাশের রগ চেপে অন্ধ আক্রোশে ধপাস করে নিজের বিছানায় গিয়ে পড়ে থাকলো জামিল।

কঠোর পরিশ্রম আর নিরন্তর সাধনায় আজিজ সাহেব দাঁড় করিয়েছেন বেশ কয়েক রকমের ব্যবসা। কম্পিউটার সেন্টার, গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরি এবং গাড়ির ব্যবসাসহ আরো কত কী! বাধ্য কর্মচারীদের নিয়ে তিনি এতদিন একাই সবদিক সামলেছেন। অবশ্য সব ক্ষমতা নিজের হাতে রেখে। ইদানীং মূল অফিসটিতে নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়ে বসিয়েছেন একটি মেয়েকে। অপাত্তস্নেহ শুধরে নিচ্ছেন তার পেশাগত সব ত্রুটিও। কী দেখলেন তিনি মেয়েটির মধ্যে, যার ঘাটতি রয়েছে নিজের একমাত্র ছেলে এবং ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীর মধ্যে?

আজিজ সাহেবের চার-চারটি মেয়ে। আর সবেধন নীলমণি ত্রিশোত্তীর্ণ এই একটিই মাত্র ছেলে জামিল। মোহাম্মদ জামিল। চার বোনের মধ্যে বড় সে। পরিশ্রমী, ধর্মপ্রাণ আজিজ সাহেবের ইচ্ছে, ছেলেটিকে তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়বেন। নিজের মতো শুধু ব্যবসায়ী করে রাখবেন না। ছেলেকে তিনি সুযোগ দিয়েছেন লেখাপড়ায় খুব ভালো করার। বেশি মানুষের সঙ্গে মেশার। ছেলেটিকে জীবনযাপনে তিনি আধুনিক এবং রুচিশীল দেখতে চান। কারণ সম্পদের সঙ্গে শিক্ষা, রুচি না যুক্ত হলে স্ট্যাটাস জন্মে না। আর তা না থাকার যন্ত্রণা তিনি একপর্যায়ে এসে হাড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছেন। এখনো পাচ্ছেন। ছেলেকে এখনই তিনি বৈষয়িক হিসাব-নিকাশে ঢোকান না। আবার গড্ডালিকা প্রবাহ’র পরিণাম থেকেও টেনে ধরেন সতর্কতার সঙ্গে।
লেখাপড়ার চেয়ে জামিলের ঝোঁক হৈ-হুল্লোড় ঘোরাঘুরির দিকে। বন্ধুত্বের চেয়ে বন্ধুরা আন্তরিকভাবে তার থেকে বেশি যা উপভোগ করে তা জামিলের বাবার অর্থের সুবিধা। এটা ছড়াতে জামিলের বাবা কার্পণ্য যেমন করেন না, আবার ঢেলেও দেন না। মাঝে মাঝে অফিস ভবনে এসে তদারিকর নামে জামিল তার নিজের উপস্থিতিটাই শুধু জাহির করে যায়। বিশেষ করে কর্মকর্তাদের মধ্যে। আজিজ সাহেব অবশ্য ওতেই সন্তুষ্ট। একসময় তো ওকেই এমডি’র পদটি গ্রহণ করতে হবে। অভিষেক অনুষ্ঠানটি আগাম তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দু’টি মেয়েকে স্কুল পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুটির একটি কলেজে পড়ছে, আরেকটি ভার্সিটিতে। জামিলই বাবাকে বুঝিয়েছে, ‘ওরা নিজের ক্যারিয়ার গড়ুক। সময় এগিয়ে গেছে, ওরা কেন পেছনে পড়ে থাকবে? স্বামীর ঘর-সংসার সামলানো আর সন্তান জন্ম দেয়াটাই একজন মানুষের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়।’

আজিজ সাহেবের আপত্তি নেই। তিনিও তো তাই চাচ্ছেন। অভাব এবং প্রাচুর্য যদিও মানুষের অনেক অনুভূতি ভোঁতা করে রাখে। তবু নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনি আশ্চর্যভাবে টের পেলেন এই সেদিন থেকে। শ্যামলাবরণ, মেধাবী, চটপটে মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই আজিজ সাহেবের নজরে বিঁধে যায়। তাঁরই প্রতিষ্ঠানে মেয়েটি আসতো কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম শিখতে, ভালো একটি চাকরি তাকে পেতেই হবে এই আশায়। মেয়েটির একাগ্রতা, আর প্রচÐ কর্মস্পৃহা বুঝতে পেরে তার প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন আজিজ সাহেব। তারপর কিছুদিন মনে মনে পর্যবেক্ষণে রাখলেন। জীবনে মানুষ তিনি কম দেখেননি। জিতেছেন যেমন, ঠকতে ঠকতে শিখেছেনও কম নয়। নির্ভর করার মতো আছে নাকি কেউ? এই জীবনে তিনি এমন কাউকে পাননি, যাকে একটি দায়িত্ব অন্তত নিজের থেকেই সমর্পণ করবেন। ভৃত্যের মতো খাটতে পারে অনেকে। কিন্তু অন্যকে খাটাতে পারার লোক নেহায়তই কম।
প্রতীতি ভাবতেই পারেনি যে তার জন্য এমন একটি অফার অপেক্ষা করছে। আজিজ সাহেব একদিন তাকে ডেকে বললেন, শোনো মেয়ে, তোমাকে আমি একটা দায়িত্ব দেবো। মন দিয়ে চেষ্টা করলে পারবে। পারবে তো?
-‘জ্বি, আপনি সহযোগিতা করলে পারবো।’ বিনয় আর আত্মবিশ্বাস মেশা স্বরে বললো প্রতীতি।
‘ঠিক আছে। আগামীকাল সকাল ন’টার দিকে সোজা আমার চেম্বারে চলে যাবে।’
প্রতীতি যাওয়া মাত্রই আজিজ সাহেব তার অফিসের অন্য সবাইকে ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের চেম্বারের পাশে আরেকটি কক্ষ সাজিয়ে তাকে বসিয়ে দিলেন। মুগ্ধ-বিস্ময়ে প্রতীতির তখন মূর্ছা যাওয়ার দশা। কিন্তু তা সে গেলো না। অন্য একটি স্মৃতি, নিষ্ঠুর স্মৃতি তাকে রক্ষা করলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, এই চ্যালেঞ্জ তাকে আপ্রাণচেষ্টায় রক্ষা করতেই হবে।

প্রতীতির উপস্থিতি জামিলের অবস্থানটি হালকা করে দিয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ আসা এবং অযথা চোটপাটে সবাই কম-বেশি তার ওপর বিরক্ত। তবু মালিকের ছেলে বলে কথা। আবার হবু এমডি। জামিল বাবার প্রতি মনে মনে রেগে আছে। দায়িত্ব দিয়ে কাজ করিয়ে নেবেন, নিন। কিন্তু এত ঘটা করে মেয়েটিকে এতবড় পদমর্যাদায় তোলার দরকার কী! আফটার অল এক সময় না একসময় জামিলকেই তো এ সবকিছুর হাল ধরতে হবে। তখন ছাঁটাইয়ের তালিকায় ওই মেয়েকে এক নাম্বারে রাখতে হবে। হোক সে যত বড় কর্মকর্তা। বাবার দীর্ঘ কর্মময় জীবনে জামিল এই প্রথম দেখলো কারো ওপর তাকে নমনীয় হতে। আর তা তারই ওপর যার সঙ্গে নিজের ছেলের এক অদৃশ্য বিরোধ চলছে। জামিল নয়, মেয়েটিই সেধে তার গা জ্বালা ধরিয়েছে। মেয়েটির ড্যাম কেয়ার ভাব জামিল বরদাশত করবেই-বা কেন? এতে নিজের যেমন কোন দোষ খুঁজে পায় না জামিল তেমনি তা এড়িয়ে যাওয়ার মতো তুচ্ছ করেও ভাবতে পারে না।

বাবাকে চটায় এতটা স্পর্ধা জামিলের নেই। এমনিতে ছেলের কোনো ত্রুটি দেখলে তিনি বলে দেন-এই যে সম্পদ দেখতাছো, এগুলান আমি আমার বাপেরতন উত্তরাধিকার সূত্রে পাই নাই, যে তোমার হাতেই পবিত্র আমানতের মতো সমর্পণ করণ লাগবো। বুঝলা? এগুলান আমি নিজে নিজে ঘাম ঝরাইয়া করছি। প্রয়োজন হইলেই এতিমখানায় দান কইরা যাবো। তুমি তোমার মতো কইরা নিবা। লেখাপড়া শিখাইছি, তোমার প্রতি ওই পর্যন্ত আমার কর্তব্য শেষ।

জামিল একবার প্রতীতিকে জরুরি কথা বলার ছলে আজিজ সাহেবের অবর্তমানে তার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। এতে প্রতীতি বলে দিলো, মি. জামিলকেই এখানে আসতে বলো। অগত্যা জামিলকেই যেতে হলো। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রতীতির মুখমণ্ডলে যে কাঠিন্য দেখলো, তাতে করে আস্ফালন দেখানো দূরে থাক, জামিল নিজেকে ওর অধস্তন ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারলো না। কোনোরকম অভিজ্ঞতা ছাড়াই এমন একটি অভাবনীয় পদে বসিয়ে দেয়ার জন্য আজিজ সাহেবের সামনেও প্রতীতি গদগদ হয় না। বরং নিরন্তর সে আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সব দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে। সে নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণে বিশ্বাসী। তার এ প্রত্যয় কারোর নজর এড়ায় না। তবে অন্যান্যদের প্রতি আচরণ কোমল রাখে। যাতে কাজের পরিবেশটি তার অনুক‚লে থাকে। এতে বরং আজিজ সাহেব হাঁফ ছাড়েন। অনেক ঝামেলা থেকে তিনি নিষ্কৃতি পান বলে।

আগে এমন কখনো করেনি। ইদানিং জামিল পিতার স্থানটি দখলের জন্য ব্যাকুল হযে উঠেছে। কারণ একমাত্র ওটাই যে প্রতীতির উপরের পোস্ট। ছেলের এক-আধটু বেফাঁস কথায় বুদ্ধিমান আজিজ সাহেব ছেলের মনোভাব টের পেয়ে যান। আর তাতে করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ‘বাবার প্রতিষ্ঠানের এমডি হওনের আগে অন্যখানে বছর-দুই চাকরি কইরা আসো। না অইলে এগুলানের মায়া বুঝবা না। অফিস, কর্মচারী, মার্কেট ধরে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। এতদিনে তুমি সিএ কমপ্লিট করতে পারলা না।’

বাবাকে তার প্রতি ক্রোধে ফেটে পড়তে দেখে, জামিল এদিক-ওদিক তাকিয়ে মনে মনে কেটে পড়ে। বাবার মুখে কথা আর বাড়তে দেয় না। কিন্তু মুগুরের মতো মনটা তার পড়েই থাকে প্রতীতির দাপট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। কবে আসবে সে দিন? বাবার উপর বিগড়ানো চলবে না। বুঝে ফেললে সব আশা আরো দূর পরাহত হবে। ছেলের ওপর আস্থা হারাবেন তিনি। হয়তো এ অফিস-বাড়ির ত্রিসীমানায়ও পা রাখতে দেবেন না। স্ত্রীর কাছে বলতে গিয়ে বাড়ি মাথায় করবেন। সব পথ রুদ্ধ করার চেয়ে আপাতত ভীষণ বুদ্ধিমানের মতো চুপসে থাকে সে। কিন্তু বিস্তৃত হতে থাকে তার দুরভিসন্ধি।
আজিজ সাহেব অসুস্থ হলেও ঘরে পড়ে থাকেন না। থাকলে তার ছেলে পাকানো উপায়গুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করতো। তবে কী এক কাজে মাস খানেকের জন্য দেশের বাইরে গেলেন। বহুবছর পর তাও বাধ্য হয়েই বলা যায়। শুধু টেলিফোন রিসিভ আর জরুরি কিছু লেনদেন বাকি থাকায় ছেলেকে আদেশ করলেন তার চেম্বারটি খোলা রেখে দায়িত্ব পালন করে যেতে। জামিল এ সুযোগটুকু পেয়ে প্রথম দিনই বাবার মতো প্রতিষ্ঠাতা কাম চেয়ারম্যান স্টাইলে প্রতীতিকে আদেশ পাঠালো তার সঙ্গে এসে দেখা করতে। প্রতীতি মাথা না তুলেই আগের মতো লিখতে লিখতে বললো, জামিল সাহেবকে এসে বলতে বলো যা বলতে তিনি চান।

তারই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মেয়েটির উত্তর শুনে জ্বলে ওঠে জামিল। চোটপাটে জড়ো হলো সেখানে অফিসের অন্যান্য সবাই। একজন এসে হিতাকাক্সক্ষীর সুরে বললো, ‘পরবর্তীতে মিস্টার জামিলই তো এসব কিছুর মালিক হবেন। তার সঙ্গে মানিয়ে না চললে ভবিষ্যতে...। নির্ভীক, অবিকৃত মুখে প্রতীতি তাকেও জানিয়ে দিলো, তখন আমি এখানে চাকরি করবো কিনা, তা আমাকে তখন নতুন করে ভাবতে হবে। আর শোনেন, তিনিও যেন ভুলে না যান তাকে এখানে কোনো পোস্টেই রাখা হয়নি, যার বদৌলতে তিনি কর্মকতা-কর্মচারীদের সঙ্গে সমান ব্যবহার করতে পারেন।’ ভিড়ের মধ্যে কথাগুলো পৌঁছে যেতেই একসঙ্গে সবার চোখ কপালে ওঠে। হাতে আর কাজ না থাকায়, আর ঠিক তখনই অফিস টাইম শেষ হতে জটলাসহ জামিলের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায় প্রতীতি। তার দৃঢ় পদক্ষেপের প্রতিটি আঘাত যেন বিচূর্ণ করতে থাকে জামিলের অন্তরের গভীরে জমাট অহংকার। ক্ষোভ যেন কিছুটা কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে ওকে। প্রতীতির দম্ভকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পরের কটি দিন, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে কাটালো সে। তারপর খুব স্বাভাবিক স্বরে, বিনয়ের সঙ্গে বাড়িতে পার্টির দাওয়াত দিয়ে গেলো এক অপরাহ্নে। প্রতীতি তা গ্রহণও করলো প্রসন্ন মুখে। যেন সে ওর পার্টিতে যাবে না এটা হতেই পারে না। পৃথিবী উল্টে যাক না তাতে কি? প্রতীতি ঠিকই হাজির হবে, এমনকি সবার আগে হবে।
প্রতীতির ভাবখানা দেখেই জামিল নিজে বর্তানো ভাব নিয়ে চলে গেলো। কারণ এবার দেখানোর সুযোগ হবে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িটিতে জীবন-যাপনেও সে কতটা আধুনিক, বিলাসী। প্রতীতির চেয়ে আরো কত যোগ্য মেয়ে তার একটু মনোযোগ পেতে উদগ্রীব হয়ে থাকে। কত মানুষের মধ্যমণি সে। পরিবারের ওতো সে একটিইমাত্র ছেলে।

অধীর অপেক্ষায় থাকে নির্দিষ্ট দিনটিতে দোতলা বাড়ির বিরাট হলরুমে সমাগম ঘটালো সব শ্রেণীর বন্ধু এবং পরিচিতি জন দিয়ে। উঠতি নায়িকা, গায়িকাও এলো কেউ কেউ। হরেক রকমের খাবারের সঙ্গে সবাইকে সয়লাব করে দিলো কড়া কোমল পানীয়েও। ছোট বোন-দুটিকে বলা আছে, প্রতীতি এলেই যেন তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়িটি দেখানো হয়। এবং জামিলের পার্সোনাল ড্রয়িং রুমে তাকে বসানো হয়। জামিলের নিজের সম্পর্কে তাকে ধারণা দেয়ার কৌশল এর সবই। কিন্তু রাত ন’টা, দশটা এগারোটা বেজেও শেষ হয়ে গেলো। তবুও যার জন্য এত আয়োজন সে শুধু এলো না? সব পÐশ্রম মনে হতে থাকে জামিলের।

মণ্ডপের মতো করে যার পূজোর আয়োজন সাজানো হয়েছে ক’দিন, কত রাতের পরিকল্পনায়। কত অলস মুহূর্ত ভরে ছিলো দৃশ্যমান এ অবস্থাটিই। ভিড় ফাঁকা হয়ে গেছে আগেই। দু-একজন যা ও বা আছে, ক্লান্ত শ্রান্ত তারাও প্রস্তুত হচ্ছে, এমন সফল পার্টির আয়োজককে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে যাবে এক্ষুনি। দুর্মুখেরা ভাবছে টাকা পয়সা থাকলে এমনতর খরচ করাই যায়। ছোট দু’টি বোনও কটাক্ষ করতে এই সুযোগ ছাড়ছে না, ‘দাদা এবারও তোমাকে হারিয়ে দিলো ওই কালো মানিক।’

ঘুম আসছে না প্রতীতিরও। অনেকদিন পর আবার সে রাত জেগে আছে। কনকনে শীত। তবু জানালাটা খুলে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কুয়াশা ভেদ করে বাইরে দৃষ্টি সরে না। পাশাপাশি সব ভবনগুলোও ডুবে আছে তাতে। নিজের ভেতরের আগুনটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে, চরাচর জুড়ে তা ছেয়ে যায়। নিজের অজান্তেই ভিজে ওঠে চোখ। গ্রামে কলেজ না থাকায় একমাত্র বোনকে বড় ভাইয়া বড় আশা করে ঢাকায় এনেছিলো। ভাবীর ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলো। কিছুদিন না যেতেই ভাবীর ভাইটিও এসে জুটলো অস্বচ্ছল আর স্বল্প পরিসরের বাড়িটিতে। উদ্দেশ্য, বোনের বাসায় থেকে ইউনিভার্সিটিতে পড়বে।

ভাইয়ার আপত্তি ভাবী মানলেন না। প্রতীতির কথা ভেবেই ভাইয়া উদ্বিগ্ন হচ্ছিলো। কিন্তু ছোট বোনের সংযত আচরণ ভাইকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছিলো। আসল ব্যাপারটি সবার অগোচরে হয়ে উঠলো অন্যরকম। হয়তো প্রতীতি নিজেও নিজের অগোচরে বাধা পড়ে শোয়েবের ভালোবাসার কাছে। কী উত্তাল, কী রঙিন কেটে গেছে সে দিনগুলো। সবার সামনে তারা স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে থাকত তাদের দু’জনের পরস্পরের জন্যে কূলভাঙা ঢেউ। অবোধ আকুলি বিকুলি। প্রতীতির লেখাপড়ার পাঠ তো প্রায় চুকেই গিয়েছিলো শোয়েবের ধ্যানে মগ্ন থেকে। মাত্র সামান্য ক’টা দিন। হোস্টেলে সিট পেয়েই নিজেকে গুটিয়ে নিলো শোয়েব। শুরু হলো প্রতীতির আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হওয়ার দিন। নিজেই আবার জেগে উঠলো প্রতারক পুরুষের সব স্মৃতিতে দু’পায়ে মাড়িয়ে যেতে। এখন ভাবলেও কী ঠুনকো মনে হয়! যার মধ্যে এতটুকুু আদর্শ নেই, সততা নেই। কেবল মিথ্যের জারিজুরিতে ভেতরটা ঠাসা। তাকে ভেবে, তার জন্য কেঁদে, অপেক্ষা করে থেকে প্রতীতির সময় গেছে। মনে উঠলেও গা ঘিনঘিন করে এখন। অবশ্য ওই ঘটনাই তার জীবনটাকে একেবারে অন্যরকম করে দিয়েছে। না হলে তো তরল সরল উচ্ছ¡াসে তারও জীবন শুরু হতো, অধিকাংশ মেয়ের যেমন হয়।
কলেজে, ইউনিভার্সিটি পাস করে তাকে যেন বসে না থাকতে হয় এজন্য বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং নিয়ে সে শুধু এগিয়ে যাওয়ার নেশায় মত্ত হয়েছিলো।
মাঝে মাঝে গ্রামে যায় প্রতীতি। মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে। তার মেয়ের বিয়ের জন্য তাগাদা দিলে, ভাইয়া তাগাদা দিলে এক বোবা বেদনা তার মধ্যে নীরবে আর্তনাদ করতে থাকে। না, কাউকেই সে আর তার পাশে ভাবতে চায় না। একাখানা মুখ যেন সব মুখে মুখে দুঃসহ ছায়া ফেলে। প্রতীতি বোঝে, এ তার অকারণ আশঙ্কা। এটাকে অতিক্রম করার চেষ্টা সেও কি করছে না। কিন্তু পারছে কই? আজ এটুকু আসতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনেকখানি মূল্য দিয়ে জানা জীবনের এই সত্যটুকু সে আর কারো কাছেই লাঞ্ছিত হতে দেবে না। এ জীবনে আর কারো আস্ফালনই সে সহ্য করবে না। সব আস্ফালনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মতো শক্তি সে অর্জন করেছে। তাই কারো প্রশস্তিও গায়ে মাখে না। মনে মনে জামিলের মতো সবাইকেই সে দূর দূর করে।

ভাইয়া, ভাবী আর তাদের দুটি বাচ্চার সংসারে প্রতীতি আজো যেন অতিথি। বাড়িটা শুধু নিজের উদ্যোগে পাল্টে বড় একটা বাড়িতে উঠেছে। সেখানে প্রতীতির নিজের একটা রুম আলাদা হয়েছে এই-যা।

ঘড়িতে মিউজিক বাজছে। ওটা শুনেই প্রতীতি বুঝতে পারলো রাত একটা বেজে গেছে। জানালা বন্ধ করার মুহূর্তে ফোনটা ঝনঝন করতেই মধ্যরাতের অনভ্যস্ত রিসিভারটি তোলে প্রতীতি। দ্বিতীয়বার ঝনঝন করার সুযোগ না দিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বললো ‘হ্যালো!’ ‘কেন আসনি? বলো, কেন আসনি?’ যেন এর উত্তরটি দিতেই সহস্র বছর জেগে প্রতীক্ষায় ছিলো প্রতীতি ‘এইটুকুর জন্যই। শুধু এটুকুর জন্য বিশ্বাস করুন!।’

যেন পিপাসা-কাতর অবসন্ন ক্লান্ত একটি পাখি বৈশাখী মেঘের পরত ঘেঁষে ডানা ঝাপ্টাতে থাকে। প্রতীতি ইচ্ছে করলে সে মেঘের শাখায় রচনা করতে পারে তার চিরকালের নীড়। রিসিভারটি তখনো রাখা হয়নি। ছিটকে পড়ে আছে বিছানায়, কান্নার প্রবল তোড় ভাসিয়ে নিয়ে যায় ওর দীর্ঘদিনের অটল বাঁধ। কিন্তু কাঁদতে তো ও চায়নি! হয়তো বিজয়ের গৌরব নিজেই ভাসতে চায় মানুষের অন্তরের আপ্লুত জোয়ারে।