মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান বা প্রসবপরবর্তী বিষণ্ণতা যা জানা প্রয়োজন
০৯/১৯/২০১৮

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান বা প্রসবপরবর্তী বিষণ্ণতা যা জানা প্রয়োজন

-

প্রথমবারের মতো মা হওয়া নারীদের জীবনযাত্রায় হঠাৎ করেই অনেক কিছু বদলে যায় স্বাভাবিক রুটিনের বাইরে বাচ্চার দেখাশোনার নতুন দায়িত্ব, তা পালন করতে গিয়ে যথেষ্ঠ ঘুম না হওয়া, এমনকি নিজে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই বাচ্চার দেখাশোনা চালানো মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আর এই যন্ত্রণাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে উপেক্ষা করতে করতে একসময় তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান বা প্রসবপরবর্তী বিষণ্ণতায় রূপ নেয়।

‘বেবি ব্লুজ’ নামে পরিচিত প্রসবপরবর্তী সাময়িক বিষণ্ণতার চেয়ে ভিন্ন পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান বেবি ব্লুজ সাধারণত প্রসবের সপ্তাহদুয়েক পরে কেটে যায় কিন্তু পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান দীর্ঘসময় স্থায়ী হয় এবং এর সঠিক পরিচর্যা নাহলে তা তীব্র ও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান কী
শিশুর জন্মের প্রথম এক বছরের মধ্যে যে কোনো সময় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান শুরু হতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রসবের প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যেই এই বিষণ্ণতায় ভুগতে শুরু করেন নারীরা। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানে ভুগতে শুরু করলে নারীরা দুঃখ ও হতাশা বোধ করতে শুরু করেন এ সময় সন্তানের প্রতি এক ধরনের উদাসীনতাও কাজ করে।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান শুধু প্রথমবার মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তা নয় একাধিকবার সন্তান ধারণ করলে প্রথমবার প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা দেখা না গেলেও পরবর্তী গর্ভধারণগুলোর সময় এটি দেখা দিতে পারে।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান কেন হয়
হরমোনের তারতম্য গর্ভধারণের সময় নারীদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় প্রসবের পরে এ মাত্রাগুলো হঠাৎ করেই নেমে যায় হরমোনের মাত্রার এমন তীব্র তারতম্য অনেক নারীর মধ্যে বিষণ্ণতার জন্ম দেয়।

পূর্বে বিষণ্ণতা রোগে ভুগে থাকলে কেউ সন্তান ধারণের আগেই বিষণ্ণতা রোগে ভুগে থাকলে অথবা পরিবারের নিকট কোনো সদস্যের বিষণ্ণতা রোগে ভোগার ইতিহাস থাকলে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান দেখা দেয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

মানসিক চাপ ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ হয়ে গেলে অথবা সঙ্গী বাচ্চার দেখাশোনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করলে প্রথমবার মা হওয়া নারীদের মধ্যে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান দেখা দিতে পারে এছাড়া আর্থিক অসচ্ছলতা, ধূমপান ও মাদক গ্রহণজনিত সমস্যা অথবা মানসিক চাপের অন্য কোনো বড় উৎস থেকেও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান দেখা দিতে পারে।

এছাড়া সন্তানের দেখাশোনা করার জন্য নিজেই প্রস্তুত না এমন কিশোরী মায়েদের মধ্যে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান দেখা দেয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

লক্ষণসমূহ
সব নারীর ক্ষেত্রে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানের লক্ষণগুলো একই ধরনের হয় না তবে সবচেয়ে বেশি যে সব লক্ষণগুলো নারীদের মধ্যে দেখা যায় সেগুলো হলো।
* দুঃখ ও হতাশা বোধ করা;
* বাচ্চার দেখাশোনা করতে অনীহা বোধ করা;
* কোনো কারণ ছাড়াই অনেক কান্নাকাটি করা;
* সন্তানের সঙ্গে মায়ের বন্ধন অনুভব করতে অক্ষম বোধ করা;
* খাওয়া-দাওয়া, নিজের যত্ন, শারীরিক সম্পর্ক ও নিজের শখের কাজগুলোতেও আগ্রহ হারানো;
* স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ঘুমানো;
* যে কোনো কিছুতে মনোযোগ হারানো, মনে রাখতে ও নতুন কিছু শিখতে সমস্যা বোধ করা;

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা
একজন চিকিৎসকই শুধু পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেন তবে কোনো নারী যদি মনে করেন তিনি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানে ভুগছেন তবে অতিসত্বর চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা উচিত।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি চিকিৎসা দুই পদ্ধতিতে হতে পারে ।

ওষুধের মাধ্যমে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশান শনাক্ত হলে চিকিৎসক অ্যান্টিডিপ্রেসান্ট ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন এসব ওষুধ মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিয়ন্ত্রণ করে বিষণ্ণতা দূর করতে সাহায্য করে এসব ওষুধ সাধারণত স্তন্যদানের ক্ষেত্রে নিরাপদ হয় তবে সন্তান মায়ের দুধ পান করে কি না তা চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে হবে।

কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী বা মনোচিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললেও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানের ক্ষেত্রে অনেক উপকার পাওয়া যায় এতে যখন মনে নেতিবাচক কোনো চিন্তাভাবনা আসে তা শনাক্ত করা শিখতে পারেন ভুক্তভোগীরা, ফলে তা কীভাবে সামলাতে হবে তাও বুঝতে পারেন তারা এছাড়া চিকিৎসকের সঙ্গে অতীত বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপের কারণ, ইতিহাসসমূহ আলোচনা করলে সেগুলো কীভাবে জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং সেগুলো সামলানোর উপায় শিখতে পারেন

অন্য যেসব উপায়ে উপকার পাওয়া যায়

* প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করলে;
* প্রতিদিনের রুটিনে আনন্দদায়ক কোনো কাজ সংযুক্ত করলে;
* ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা পূরণে কাজ করলে;
* আনন্দদায়ক কোনো কাজে নিশ্চিন্তে সময় কাটালে;
* স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটালে

প্রসব পরবর্তী মনোরোগ
প্রসবপরবর্তী মনোরোগ বা পোস্টপার্টাম সাইকোসিস প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতার সঙ্গেই দেখা দিতে পারে, তবে তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানের চেয়েও ভয়াবহ। শিশুপ্রসবের দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই মনোরোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় এগুলো হলো
* ঘুম না হওয়া;
* দ্বিধায় থাকা, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে না পারা;
* হ্যালুসিনেশান হওয়া বা অলীক ভাবনায় ডুবে থাকা;
* বাচ্চাকে নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা;
* অহেতুক ভয় বা সন্দেহ করা;
* খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা;
* নিজের অথবা বাচ্চার ক্ষতি করার চিন্তাভাবনা করা;

পোস্টপার্টাম সাইকোসিসের লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

- কাজী শাহরিন হক
ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী