মঙ্গলবার,১৬ অক্টোবর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / ‘যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে’
০৯/১৬/২০১৮

‘যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে’

-

দিল্লির একটি সত্যি ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। আয়েশার দেবরকে অপহরণ করা হয়েছে। মুক্তিপণ না দিলে মুক্তি নেই। স্বামীকে নিয়ে আয়েশা চলে আসেন অপহরণকারীদের ডেরায়। টাকার জন্য এগিয়ে আসে অপহরণকারীরা। কিন্তু আয়েশা অনেকদূর থেকেই টাকার পরিবর্তে একদম ফিল্মি কায়দায় নিখুঁত নিশানায় গুলি ছোড়েন অপহরণকারীদের দিকে। মুহূর্তেই ধরাশয়ী অপহরণকারীরা। ঘটনাটির চমক হলো- আয়েশা ছিলেন ভারতের জাতীয় স্তরের একজন শুটার! তিনি জানেন সেল্ফ ডিফেন্স কীভাবে নিতে হয়।

ভূতের পা নাকি থাকে পেছনের দিকে। আমাদের সমাজের অনেকেরই পা ভূতের মতো। নারীদের পেছনের দিকে ঠেলে দিতেই তারা বেশি পছন্দ করে। কিন্তু নারী তো ঘরের চার নম্বর খুঁটি নয় যে, সে বাইরে বের হলে ঘর ভেঙে পড়বে! বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়েই আজ এটা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে যে, নারীকে বরং আটকে রাখলেই এই পৃথিবীর ক্ষতি, সভ্যতার ক্ষতি। সুতরাং নারীকে তো ঘর থেকে বের হতেই হবে। কিন্তু নারীরা ঘর থেকে বের হলেই ভূতের পা-ওয়ালা অসংখ্য পুরুষ পথে পথে কাঁটা ছড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ইভটিজিং, যৌনহেনস্থা, এমনকী নারীর জীবন নিতেও তারা দ্বিধা করে না। অথচ ছোটখাটো কিছু শারীরিক আত্মরক্ষার কৌশল জানা থাকলে একজন নারী অনায়াসেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

কেউ তোমাকে উত্ত্যক্ত বা অপমান করছে? রুখে দাঁড়াও। নিজের ভয়কে ক্রোধে পরিণত করো। যদি মনে মনে বলতে পারো, ‘আমার গায়ে হাত দেওয়ার কিংবা আমাকে বাজে কথা বলার স্পর্ধা ছেলেটির কী করে হয়?’ তাহলে অর্ধেক জয় পেয়ে গেলে তুমি। কারণ অপরাধীরা আসলে তোমার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল আর ভীতু। তুমি কি জানো না-
‘যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে;’

আসলে পথে বের হলে রাস্তার নেড়িকুত্তা ঘেউ ঘেউ করতেই পারে, তেড়ে আসতেই যে-কারো দিকে। কিন্তু তুমি যদি রুখে দাঁড়াও, দেখবে, নেড়ি কুত্তাগুলো লেজগুটিয়ে পালাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ওই কবিতার পরের দু’লাইনে বলেছেন-
‘যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে
পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে;’

আমাদের অনেক পূর্বসূরি তাদের সময়ের তুলনায় এমন অনেক সাহসী কাজ করেছেন, যা এখনো বিস্ময় জাগায়। সেই ১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ নামের আত্মরক্ষামূলক একটি নারী সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নাজিমুন্নেসা আহমেদ, রাবেয়া বেগম, মাকসুদা বেগম, লাইলা আহমেদ, তাসমিনা খাতুনের মতো মহীয়সী মুসলিম নারীরা। ১৯৪৪ সালে এর সদস্যা সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার!

৭৬ বছর পর এখনো নারীরা আত্মরক্ষায় সবচাইতে বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। এ বড় লজ্জার! এ লজ্জা পুরুষের। আমি দুর্বল নই, অসহায় নই- এটা হলো আত্মরক্ষার প্রথম পাঠ। ‘যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে’- তুমি জেগে ওঠো একবার, দেখবে, কী বিস্ময়কর শক্তি সুপ্ত রয়েছে তোমারই অন্তরে।

একবার তাকাও নিজের সেই শক্তির দর্পণে।
জয় হোক নারীর আত্মশক্তির।

- তাসমিমা হোসেন