সোমবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / গোড়ায় গলদ
০৯/১০/২০১৮

গোড়ায় গলদ

-

বাংলায় প্রবাদ আছে- কচুগাছ কাটতে কাটতে নাকি ডাকাত হওয়া যায়। এই প্রবাদের মতো আমাদের দেশে স্ট্রিয়ারিং নাড়াচাড়া করতে করতেই হেলপার হয়ে যায় ড্রাইভার। বিপদের কথা হলো, দেশে গাড়ির তুলনায় চালক কম। আবার যেসব চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তাদেরও অধিকাংশই অদক্ষ-অযোগ্য। রাজধানীতে লেগুনা গাড়িগুলোর এমন অনেক চালক আছে যাদের বয়স মাত্র দশ থেকে পনেরো বছর! কিছু ড্রাইভার আছে, যারা ড্রাইভিং সিটে বসে স্ট্রিয়ারিংয়ে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে যেন জেটবিমানের পাইলটে পরিণত হয়। এক্সেলেটরে চাপ দিতে কী আর লাগে-কেবল পায়ের একটু চাপ। এসব চালকের খামখেয়ালি ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণে প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় ঝরছে তরতাজা প্রাণ।

এখন কথা হলো, অপরিণত কারো হাতে যদি কার্তুজ-ভর্তি একটি বন্দুক তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই বন্দুক থেকে তো এলোপাথাড়িভাবে গুলি বের হতেই পারে। সেই গুলিতে মারাও যেতে পারে যে-কেউ। এখন আমরা যদি প্রতিনিয়ত অপরিণত বা অপ্রশিক্ষিত অসংখ্য মানুষের হাতে গুলিভর্তি বন্দুক তুলে দিই, তাহলে সেই বন্দুক থেকে ছোড়া গুলিতে কেউ মারা গেলে সেটাকে কেন দুর্ঘটনা বলব? এ তো রীতিমতো খুন! সড়কে এভাবেই প্রতিনিয়ত চলছে বিপুল খুনের ঘৃণ্য একউৎসব। এই খুন থামাতে গত মাসে এক অভ‚তপূর্ব আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের কোমলমতি স্কুল-শিক্ষার্থীরা। রাস্তায় নেমে তারা অনিয়মকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছিল বিস্ময়কর দক্ষতায়। আর রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুঝিয়েছিল, আমাদের গলদ রয়ে গেছে গোড়াতেই।

দূর করতে হবে সেই গলদ। না-হলে একটি গরু-ছাগলের নামেও ঘুষ দিয়ে বিআরটিএ থেকে দালালের মাধ্যমে দক্ষ চালকের লাইসেন্স বের করা যাবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকার আরো বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা করছে। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত একজন বাসচালক দুঃখ করে বলেছেন, ‘সরকারের কাজ সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিন্তু বাস্তবায়ন করবে কে? প্রতিদিন মালিক, শ্রমিক নেতাদের পাঁচশ’ থেকে হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে বাস চালাতে হয়। ট্রাফিক পুলিশ ও লাইনম্যানকে টাকা দিতে হয়। সরকারকে আগে এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।’

নিরাপদ সড়কের পাশাপাশি অনন্যার এবারের ইস্যুতে আমরা একটি বিশেষ প্যারেন্টিংয়ের বিষয় তুলে ধরেছি। সেটা হলো-ছেলেকে ফেমিনিস্ট মানসিকতায় বড় করে তোলা। ফেমিনিজম এখন মানবতাবাদের সমার্থক। সুতরাং সচেতন বাবা-মাকে নিজের ছেলে সন্তানকে মানবিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শেখাতে হবে ফেমিনিজম। ছেলেদের একটি সাধারণ মনস্তত্ব হলো, সে চায় বৌ হোক তার মায়েরই মতোই। এখন মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা-যত্নের পাশাপাশি ছেলেটি যখন ছোটবেলায় দেখে যে, সামান্য অপরাধে তার মায়ের গায়ে হাত তুলছে তার বাবা-তখন এটাকেও সে স্বাভাবিক মনে করে। সেই দৃষ্টান্ত সে তার বৌয়ের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করে। অর্থাৎ বৌয়ের গায়ে হাত তুলতে দ্বিধা করে না সে। এটাকে অপরাধ বলে মনে করে না। সুতরাং ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই এই মানসিকতায় গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে মনে করে নারীর প্রতি যে- কোনো ধরনেই অত্যাচার-নিপীড়নই ভয়ঙ্করভাবে মানবতাবিরোধী কাজ।

চ্যারিটি বিগ্যানস অ্যাট হোম-এর মতো আমাদের সুশিক্ষার প্রকৃত পাঠ হোক পরিবারের অন্দর থেকেই। এখানেও গোড়ায় গলদ করা যাবে না কিছুতেই।
সবার মঙ্গল হোক, সুশিক্ষায় জাগরিত হোক বিবেক।

- তাসমিমা হোসেন