বুধবার,১৪ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বীজমন্ত্র
০৯/০৬/২০১৮

বীজমন্ত্র

- রাবেয়া রব্বানী

রুখসানা
তীব্র নাকডাকার শব্দ গিলছে রাত। জিভকাঁটা দাসীর মতো নিঃসাড় পড়ে আছি। আমি, মির বাড়ির নতুন বৌ, রুখসানা।
বিয়ের আগে আমার গায়ের রঙ একটু খোলতাই থাকলেও এ বাড়ির খোলা আবহাওয়ায় এখন গমের খোসার মতো গাঢ়। এই মুহূর্তে অন্ধকারে আমাকে আলাদা রকম দেখা যাচ্ছে না। ভাষাহীন, অচল এবং রঙহীন জড়ের মতো এই পড়ে থাকা যেন বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা চ্যাপ্টা বাসিফুলের মতো। রূপের সাথে যার গন্ধও চলে গেছে।
আশপাশের বাসা থেকে শাশুড়ির বুড়ো সখিগুলো আসে। আমাকে দেখে তেমন জুঁত না পেয়ে বলে, “হু...ম। ছেছমেছ এই বাছাত এই ছেমরিরই রিজিক আছিলো!” কেউবা বলে, “কি করবা আম্বিয়া, ছবই অইছে গিয়া নছিব।” নসিবের কথা উঠলে শাশুড়ি আরও গুরুতর হন। রান্নাঘরে তার ঠোঁট নানান ভঙ্গিতে নড়লেও আমি শুনতে পাই একই কথা, “বাপ-মায় কিছু ছিখায় পড়ায় দেয় নাইক্কা। হুদা আমড়া কাড বানায়া হৌরবাইত পাডায় দিছে!” লাইনটা ঘুরে ফিরে চিকন সবুজ শাপের মতো আমাকে প্যাঁচিয়ে রাখে। আমি তাতে হাঁসফাঁস করি, নড়তে পারি না। গোসলের সময় রঙচটা ঝরনাটার পানিতে সাপটা যখন নেমে যায়। গা মুছেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে খেতে যেতে লজ্জা করে। ঘুলঘুলিতে টিকটিকিটার মতো, মেঘের ভিড়ে ভাঙা চাঁদের মতো, পাতার পিঠে সবুজ পোকার মতো লুকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এ মুখ কাউকে দেখাতে ইচ্ছা হয় না।

দিনে দু’একবার আমার মোবাইল নামক যন্ত্রটা মিনমিন করে উঠে। সেখানে আমার বাবা-মায়ের গদগদে, খুশি খুশি কণ্ঠ শুনতে পাওয়া যায়। সময়মতো বিয়ে দিতে পেরে তারা প্রায়ই বেশ কেজো ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, “কি রে...? ছব বালা আচে তো? কেমুন লাগতাচে ঐ বাড়ির ছবতেরে? আমি তাদের মান সম্মানের চাকে ঢিল মারি না। চাকটা অহংকারের মৌমাছি সমেত গিজগিজ করে।
বাড়ির ঝি চাকর, আড়তে ভাত নিয়ে যাওয়া বুড়ো লোকটা আমাকে নিজেদের কাতারে ফেলে দিয়েছে শুরুতেই। সন্ধ্যার কিছু আগে আমার শাশুড়ির দাপট যখন লেলিহান শিখার মতো আকাশ ছোঁয় তখন সেই ধোঁয়ায় ঘরবাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়। কাজের লোক ও আমি তখন ভালোমতো দেখার জন্য চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকি। আমাদের সবার চোখ জ্বালা করে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে আলতাফ খান। আমার সদ্যবিয়ে করা স্বামী। এসেই সে জাদুগ্রস্ত মানুষের মতো মাঝের ঘরের টেলিভিশনের সামনে বসে পড়ে। সেখানেই বসে বসে কাঁদে, হাসে, মুগ্ধ হয়। মায়ের সাথে খাওয়াদাওয়া আর এক প্রস্ত আলাপ-আলোচনার পর যখন ঘুমুতে আসে তখন এখনকার মতো বাতি নেভানো থাকে। আমাকে দেখা না গেলে প্রায়ই লোকটা দেখার চেষ্টা করে না। তাই সে ঘরে ফিরলেই রঙহীন, গন্ধহীন, অচল, নিশব্দ কাঠের মতো পড়ে থাকা আমি প্রার্থনা করতে থাকি যাতে সে দ্রæত নাক না-ডাকে। যাতে সে কিছুক্ষণ জেগে থেকে প্রমাণ করে আমি মানুষ।

ইলমেরাজি খান
ভারি নিশ্বাস পড়ছে আমার পিঠে। আমি মাচায় সিমের লতার মতো, মিলন মৌসুমের সাপ ও সাপিনী মতো প্যাঁচিয়ে আছি, আমার স্বামীর শরীরে। আমি মির বাড়ির আট বছরের পুরনো বৌ ইলজেসিম খান।

বাচ্চা দুটা হওয়ার পর থেকেই আমার গায়ের রঙ দুধে আলতার দিকে চলে গেছে। এই মুহূর্তে আমি নিজেই নিজের শরীরের সাদা অংশগুলো দেখতে পাচ্ছি। আমাকে দামি পাথরের মতো এই অন্ধকারেও এমনভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে যেন আমি সদ্যবাগান থেকে তোলা নরম বেলীফুল যার গন্ধ এখনো তীব্র।

আশপাশের বাড়ি থেকে আমার শাশুড়ির বুড়ো সখীগুলো যখন আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলে যায়, “আহহা আম্বিয়া! কি আচকা রূপ তোমার গরে! হীরা এক্কেরে বনেদি হীরা!” কেউবা বলে, “চান কপাল!” আমার পক্ষাঘাতে ভোগা অচল শাশুড়ি তখন আমাকে বৌ করে আনার ব্যাপারটা নিয়ে তার অবশিষ্ট গৌরব প্রচার করেন। অবশ পায়ে হাত বুলিয়ে করে বলতে থাকেন, “আমিই তো দেইখা ছুইনা লিয়া আইছি। আরও ছিখায় পড়ায় নিছি। এখন এক্কেরে শেখের বেটি। যেমুন ঠাট তেমুন আট।” কথাগুলো আমাকে সবুজ পাতার মতো জড়িয়ে ধরে রাখে। নিজেকে সতেজ মনে হয়। গা মুছেই আমি একটু ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে ষোলকলার চাঁদের মতো, দুপুরের সূর্যের মতো, বর্ষার পেখম মেলা ময়ূরের মতো আয়নার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। এ মুখ সবার দেখা দরকার, এ মুখ সম্মানের, বিজেতার। আমি রান্নাঘরে যাই। সবার খাবার বুঝিয়ে দিতে দিতে আমিও খেতে বসি। ঝি-চাকর আশ্রিতা ছেলেমেয়ে সবার থালায় ভাত দেখতে আমার ভালো লাগে। বাড়ির ঝি-চাকর আলতাফের আরতে ভাত নিয়ে যাওয়া রহিমবুড়ো সবাই আমাকে অন্নপূর্ণা দেবীর চোখেই দেখে। কোন সন্ধ্যায় যখন আমার শাশুড়ির পিঠের ব্যথা চূড়ান্তে উঠে, যখন তার একি রকম বিলাপের শব্দে পুরো বাড়ির মানুষের কানে তালা লেগে যায় তখন আমরা সবাই তার চিৎকার শোনার চেষ্টায় কানে আঙুল দিয়ে ঝাঁকাই। কান পরিষ্কার করে বিশেষ করে শোনার চেষ্টা করি।

সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে আলতাফ খান। আমার আট বছরের বিয়ে করা স্বামী। বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে নিঃশব্দে সে আমার ঘরের দিকে আসে। আমাকে নিয়ে তার মনে যে অ-নিরাপত্তার বীজগুলো বাসা বেঁধে আছে তা সে নেড়েচেড়ে দেখতে চায়। আমাকে ছেলেমেয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখে সে খুশি হয়। কম আলোর বাতি জ্বালিয়ে পায়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সে। সারাদিনের ঘটে যাওয়া কাজের টুকটাক বলে। তারপর আমাকে সাথে নিয়েই খাবার খেয়ে টিভি দেখতে চায়। আমি যদি উঠে অন্যঘরে যাই তাহলে সে সেটা ভালো চোখে দেখে না। খেয়েদেয়ে মায়ের ঘরে কিছুক্ষণ শারীরিক অসুস্থতার ফিরিস্তি শুনতে গেলে আমি ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়িয়ে আসি। যখন সে চূড়ান্তভাবে শুতে আসে তখন এইরকম আলো নেভানো থাকে। এরকম অন্ধকারেও সে আমাকে কালো আকাশে ফুটে থাকা তারার মতো দেখতে পায়। মুমূর্ষু মানুষের মতো আমাকে স্পর্শ করে করে খুঁজে নেয় জীবন।

রুখসানা
“হ ভাবীছাব, আমি বড় দেইক্ষা পান মুখে দেই তাই ছেছ অইবার চায় না। আপনের ছাছুড়ি প্যান প্যান করুক, কি কারেন্ট যাওকগা, কি আমার কমিন লাং গল্লির মোড়ে দাঁড়াইয়া গারমেন্টছের মাইয়া মাইনছের আউন যাউন দেহুক, আমার কুন ছমছ্যা অয় না। সবকিছুই বালা লাগে।”
“নেছা ছাড়া আর কি তাইলে পান?”
“নেছাই ভাবী।”
কথাটা বলেই রুকুর মা চোখ বোজে, আল জিভ বের করে পানটা মুখে দেয়। আরও একটা পান সাজিয়ে শাড়ির আঁচলে গিঁট দিতে যাবে এমন সময় আমি তা ছো মেরে নিয়ে নিই।
“মর জ্বালা, এইটা বেছি জরদা দিয়ে বানাইন্না, ধরব তো। আপনে আম খান, মইজ্জা যাইব গা।”
“ধুরো, আম খামু না।”
রুকুর মা আবার পানটা কেড়ে নেওয়ার আগেই আমি মুখে দেই। বিস্ময় আর আকস্মিকতায় রুকুর মা আ...করে শব্দ করে উঠে। তার বাম গালের দিকে আধ চিবানো পান সুপুরির বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য দেখা যায়। রুকুর মা কি করবে বুঝতে না পেরে পালাতে রীতিমতো দৌড় দেয়। আমিও চিবাতে শুরু করি।
তিতকুটে কষ্টি একটা স্বাদ মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একটা পাতলা তরল রস আমার মুখে ছাপিয়ে ঠোঁটের কাছে চলে এসে বাঁধভাঙা পানির মতো বেয়ে নীচে নামতে চাইছে। আমি দ্রæত জানালার কাছে গিয়ে তা ফেলতে যাই। মরা নারকেল গাছে এই ভরদুপুরে একটা কাঠ-ঠোকরা বসে একটু পর পর গাছটাকে ঠুকরে নিচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছে বের হয়ে পাখিটাকে ঢিল মারি। কিন্তু আমার আশপাশ কেমন ঘুরছে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। আমি চোখ বুজি।


“ছোট আম্মা ঘুমায় গেছেন গা?”
“কি বলতে আসছ?”
“একটা পান আনছিলাম। এক্কেরে ছাহি মছল্লা দিয়া বানাইন্না।”
“ঘুমানোর সময় আইসা ঢং দেখাতে না করছি না তোমারে?”
“চাইরটা বাইজ্জা গেছে দেইক্ষা ছোট আম্মা।”
“চাইরটা বাজলেই আমারে ডাকনের অনুমতি তোমারে দিল কে?”
এবার চুপ হয়ে গেছে রুকুর মা। বাচ্চারাও এই সময় আমার কাছে হুট করে আসতে সাহস পায় না। সারাদিন আমি সংসার আর সন্তানদের সময় দেই কিন্তু এই সময়টা আমি কারো সাথে ভাগ করি না। ঘুমাই কিনা ঘুমাই, কি ঘুম ভেঙে যাক আমি নিজে না বের হওয়া পর্যন্ত এই ঘরে কার ঢোকার অনুমতি নেই। রুকুর মাকে বিদায় করতে আমি দরজার বাইরে হাত পেতে পানটা নিই। নিতেই নিতেই বুঝতে পারি এবার সে পালাবে। রুকুর মার ভয় খাওয়া বিড়ালের মতো পালানোর স্বভাব এখনো যায়নি!
অনেকদিন পর পান মুখে দিলাম। পান খেয়ে দাঁত নষ্ট করার মানে হয় না বলে এই নেশায় কখনো গা পাতিনি। মাঝে মাঝে রুকুর মা ইচ্ছে করে দিয়ে যায়। জরদা একটু বেশি দিয়ে বানায় বলে হয়ত ওর পান সবসময় মাথাটা হাল্কা ঘুরে। গোল গোল চক্কর দিয়ে ঘুরার পর শিশুর মতো একটা সুখী অস্বস্তি কেমন পাক খায়।
পান মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই পাতা এবং খয়ের সুপারি থেকে তাৎক্ষণিক একটা রস বের হয় তা না ফেললে বাঁধভাঙা পানির মতো ঠোঁট ছাপিয়ে গেছে। আমি জানালার কাছে যাই। আমগাছের আমগুলোতে এবার সময়ের হলদে রঙ ধরে গেছে। একটা সবুজ টিয়ে পাখি বসে আছে আগায়। পথ ভুলে গেছে কি! এই বাড়িতে সবুজ পাখি আসতে আমি আগে কখনও দেখিনি তো। বাচ্চাদের ডেকে দেখাবো? না থাক এখন মাথাটা একটু ঘুরছে। ওরা নিজেদের ঘরে খেলছে খেলুক। আমি জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে চোখ বুজে ফেলি।

রুখসানা
চোখ খুলতেই কেন মনে হচ্ছে ঘরের সব কিছু বদলে গেছে? পলেস্তার খসে যাওয়া ঘরটা এখন রঙিন। বামদিকের দেয়াল ফুল লতাপাতার ছাপ দেওয়া টকটকে লাল রঙের আর শেখানে ঝুলছে আলতাফের সাথে আমার বিয়ের একটা অন্তরঙ্গ ছবি। শ^শুরের তালাবন্ধ ঘরের চন্দনকাঠের খাটটাও এই ঘরে! চাকাওয়ালা খানদানি খাটটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ এইমাত্র তেল দিয়ে ডলে দিয়েছে। বিছানায় মখমলের লাল চাঁদর বিছানো। বিছানার নিচে পা ফেলবার জায়গায় লাল ভারি মাদুর। ডানদিকের দেয়ালে একদম পাতলা একটা টিভির মতো কিছু লাগানো। তার দুপাশে বইয়ের সেলফ আর তাতে শত শত বই। ছাদ থেকে সাত লহরের ঝাড়বাতি ঝুলছে। জানালায় দুই পরতের লালপর্দা। কি এসব! আমার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। আমি কোথায়? সোফাটার পাশে একটা টেবিল ক্যালেন্ডার রাখা। ২০১৮! ওহ তাহলে নিশ্চয়ই স্বপ্ন হবে। এখন ২০০৬ সাল। এমনিতেও অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখছি ইদানীং আমি। দ্রæত জেগে গেলেই নিস্তার।
আমি বারবার চোখ মেলি আর চোখ বুজতে থাকি। কিন্তু দৃশ্যগুলো বদলাতে পারি না বরং আম্মার সাথে প্রথম সাঁতার শেখার দিনের মতো মাঝপুকুরে তলিয়ে যাই। বাইরের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি জানালায় আমার মতো একজন দাঁড়িয়ে আছে! কি আশ্চর্য স্বাস্থ্য ভালোর দিকে ফর্সা মেয়েটা আমার মতোই তো দেখতে। আধখসা শাড়ি, লেপটে যাওয়া কাজল পাতলা, গোলাপি আভার ঠোঁট। প্যাঁচানো প্যাঁচানো পিঠ পর্যন্ত চুল। চাউনি আমার চেয়ে একটু আলাদা হলেও নিজেকে না চিনে উপায় নেই। স্বাস্থ্য আর গায়ের রঙ একটু অন্যরকম হলেও গালের তিলটা একইরকম। ভয়ংকর ভয় আমাকে তাড়া করে। আমি নিজের অন্য একটি রূপকে দেখতে পাচ্ছি। এটা আসলেই অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। নিজেকে বুঝাই, হ্যাঁ অদ্ভুত ও ভয়ানক স্বপ্ন থেকে বের হতে সময় লাগে। আমি নিজের অন্য কণ্ঠনালীতে হাত রাখি।

ইলমেরাজি খান
রুকুর মা কোন পদের জরদা দিয়ে পান বানিয়ে দিয়ে গেছে যে আমি নিজের বারো বছর আগের আমিকে দেখতে পাচ্ছি। সোফায় চিত হয়ে শুয়ে শুকনা শ্যামলা মেয়েটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই রুখসানা। হ্যাঁ তাইতো আমি রুখসানাকে দেখতে পাচ্ছি। অতীতের সেই ভীতু, অবহেলিত আমিকে। এই রুখসানার চিহ্ন রোজ একটু একটু করে ঝামা দিয়ে ডলে ডলে তুলে ফেলেছিলাম আমি। প্রথম সন্তান পেটে আসার মাসেই পুরনো কাপড় আর শিশি বোতল আর সিলভারের জগগুলোর সাথে নামটাও ফেলে দিতে দিতে শাশুড়িকে বলেছিলাম, “আম্মা আজকা থেইক্কা আমারে ইলমেরাজি খান ডাকবেন। আব্বা আমার উকিল চাচারে লিয়া আইছে। কালকাও আইব। নাম চেঞ্জ করতে কয়দিন আব্বার লগে যাউন লাগব কোর্টে।” সেদিন শাশুড়ির চেহারা থেকে রাগ উধাও হয়ে বিস্ময় এসে জমা হয়েছিল। হাল্কাস্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, “কি কইতাছো কিছুই বুঝবার পারতাছি না। নাম বদলাইবা মানেটা কি?” “আম্মা, আমার দাদি কইত মাইয়া মাইনছে জন্ম অয় দুইবার। নিজে জন্মের সময় আর সন্তান জন্মের সময়। তখন নাম বদলান ভালা।” কালো কোর্টপরা আমার উকিল বাবাকে পেছনের ঘরে বসে থাকতে দেখে আর আগত বংশধরের ইঙ্গিতসহ আমার সাহসী মুখ দেখে শাশুড়ি তার মুখে আনা কথা হজম করে শুধু বলেছিল, আচ্ছা, আচ্চা।

এফিডেবিট করে পর্যন্ত যে রুখসানাকে বাতিল করে দিয়েছিলাম তার এখানে কি কাজ? আমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছি। আসলে কি আমি একটু আগে পান মুখে দেইনি। রুকুর মা কি আসেইনি। সব ই কি স্বপ্ন! ভয় বা অপছন্দ হলে স্বপ্ন আরও দীর্ঘসময় চলতে থাকে। আমি মাথা ঠান্ডা রেখে এগিয়ে যাই রুখসানার দিকে। রুখসানা যেন আঁতকে উঠে। স্বপ্ন হলেও রুখসানার জানা দরকার, স্বপ্ন হলেও আমার বলা দরকার আমি এখন আর রুখসানা নই। রুখসানাকে আমি দেখতে চাই না।

“রুখসানা তুমি এখানে আসছো ক্যান?”
“আমরা ছপ্ন দেখতাছি।”
“হ্যাঁ আমরা স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন হউক কি না হউক, রুখছানা বলে এখন আর কেউ নেই। বুঝতে পারছো?”
রুখসানা চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মাংসহীন গাল ভয়ে আরও চিপশে যায়। তা যাক। আমি রুখসানা মানে আমার পুরনো আমিকে স্বপ্ন কিংবা কোনো অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও ঝাঁকিয়ে দেই। বলি, “হ্যাঁ হ্যাঁ রুখসানা, আমি ইলমেরাজি খান। তোমার বারো বছর পরের তুমি। তুমি আর নেই, এই বাড়ির কোথাও তোমাকে আর খুঁজে পাবা না। তুমি ইলমেরাজি খান হয়ে গেছ।”
রুখসানার যেন বিশ্বাস হয় না। সে আপাদমস্তক আমাকে দেখে বলে, “কেমতে আমি তুমি অইলাম? আমার তো এইসব কিচ্ছুই নাইক্কা, না রূপ, না গুণ, না ছাহছ। একটা বান্দির চেয়ে বেছি কিছু না আমি।”

নিজের মুখে এই ধরনের কথা শুনে খারাপ লাগে। গত বারো বছরে আমি মানে রুখসানা শুধু পড়াশোনাই করেনি পাশাপাশি সব ক্ষেত্রেই নিজেকে চলন্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আজকের রুখসানা জানে জ্ঞান মানে রোমে রোমানদের মতো ব্যবহার করা। কারো সাথে কথা বললে তার স্তরে নেমেই বলাই বিজ্ঞতা। তাই আমি মানে আজকের রুখসানা দীর্ঘদিনের চর্চিত বিদ্যা আর ব্যক্তিত্বের ভাষা চেপে রেখে পুরনো রুখছানার জবানিতেই বলি, “দাসীগিরির দেখছ কি! ছবে তো ছুরু। তুমি স্বামীরে হাত ধোয়ায়া ভাত খাওয়ায় পর্যন্ত দিবা। ওছুদ ভি ওছুদের পাতা থেইক্কা খুইল্লা খাইতে ভুইল্লা যাইব ছে। শাশুড়ির পা টিপ্পা টিপ্পা এমুন আরাম দিবা যে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমায়া থাকব। একলাই দুই ঝির ছমান কাজ করবা তুমি। সারাদিন কাম করবা ফাঁকে ফাঁকে পড়বা। বান্দির দেখছ কি! বান্দিভি তুমারে দেইক্ষা আল্লা আল্লা করব।”
রুখছানার বড় বড় চোখে হাল্কা পানির আভাস দেখা যায়। “এত কাম করমু কেমতে আমি? পড়মু কেমতে আমি?” বুঝা যায় এগুলো প্রশ্ন না রুখসানার আত্মবিশ্বাসহীন মনের বিলাপ। স্বপ্ন থেকে বের হতেই সে তার কালিপড়া চোখ কচলে এদিক ওদিক তাকায়। আমি জানি রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে আর লুকিয়ে কেঁদেই তার চোখের নীচে এই দাগ পড়েছে। পুরনো রুখসানা অনেক কিছুই জানে না। নাম বদলানোর পরই সেবা আর খাদ্য দিয়ে আলতাফের মন জয় করতে থাকা তার অনুরোধ রাখতেই আলতাফ বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে দিয়েছিল। নিয়ম করে পরীক্ষা দিতে দিয়েছিল। জয়ী হলেই সংগ্রামীকে ভয় দেখানো পাপ। তাই আমি ইলজেসিম খান এবার রুখসানাকে আশ্বস্ত করতে চাই,
“বুঝো নাইক্কা না? হীরা দিয়াই হীরা কাটবা তুমি রুখসানা। বান্দি হইয়াই সবতেরে তোমার মুলি বানাইবা। আর এমনেই তুমি আমিতক আইবা। তোমার কতায় এই বাড়িত দিন অইব। তোমার কতায় রাইত।”

রুখসানা
“আরে মোবাইল সাইলেন্ট ছিল। আমি ঘুমায় ছিলাম। আরে, আমি ঘুমাব না, নাকি!”
ভ্রু কুঁচকে আছে ইলমেরাজি খান। মনে হচ্ছে সে রেগে গেছে। আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, কে?
“আর কে আলতাফ খান। দুই তিন ঘণ্টা পর পর ফোন করে। বাইরে কোন জায়গায় গেলে ভিডিও কল করে।”
“ভিডিও কল আবার কি?”
ইলমেরাজি খান উত্তর দেন না। তার মুখ দেখেই চটে যাওয়া মেজাজের আন্দাজ করা যায়। এদিকে স্বপ্ন ভাঙার কোনো নাম নেই। হাল্কা হলুদরঙা ঝাড়বাতির আলোয় ইলমেরাজি খানের গায়ের রঙ সোনালি দেখায়। সে আলমারি খুলে টাকা গুনছে। কেউ দরজায় টোকা দেয়। খুব বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করে ইলমেরাজি খান, “কে?”
“আমি আম্মা রুকুর মা।”
“কি হলো আবার?”
“বাচ্চারা এখনো ঘুমাইতাছে।”
ইলমেরাজি খান একবার আমার দিকে তাকান আর একবার দরজার দিকে। তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে বলেন, “ঘুমাক। কাল স্কুল বন্ধ।”
“আপনার হাঁটতে যাওয়ার জামা জুতা রেডি। নিয়া আছমু?”
“নাহ। আধঘণ্টা পর।”
“তাইলে চা দিয়া যামু?”
“না, আমি বলব, এখন যাও।”
“যাইতাছি ছোট আম্মা, তয় বড় আম্মা কইছে কষ্ট কইরা তার সাথে একটু দেখা কইরা যাইতে।”
ইলমেরাজি খান চিন্তিত মুখে ছোট করে হুম বলে। তারপর আমার সামনে এসে আমাকে বলে, “তুমি এখনো যাও নাই! এই স্বপ্ন ভাঙবে কখন? আমার কাজ আছে না?”
বুঝাই যাচ্ছে আমার উপস্থিতি তার আর ভালো লাগছে না। আমারও জেগে উঠা উচিত। জানালায় দিকে যাই আমি। চোখ আলো পেলে যদিবা ঘুম বা স্বপ্ন কিছু ভাঙে। কিন্তু এ কি! মরা নারিকেল গাছটা কোথায় গেল! বিরাট আম গাছটাইবা কোথা থেকে এলো! পাকা হলুদ আম দেখা যাচ্ছে। ইলমেরাজি খান আমার পিছে এসে দাঁড়াতেই আমি উত্তেজিত সুরে বলে উঠি, “আম গাছটা আইলো কই থেইক্কা? মানে কবে অইলো?
ইলমেরাজি খান নিরুত্তাপ স্বরে বলল, “গাছ আগে থেকে হয়েই থাকে রুখসানা, শুধু বীজটা লাগাতে হয়।”
আমার মনে পড়ে রুকুর মা এই স্বপ্ন বা ঘুমের আগে আম খেতে দিয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি চেষ্টা করতে থাকি স্বপ্নের আবরণ সরিয়ে সরিয়ে বাস্তবের মাংস মজে যাওয়া আমের আটিটা দেখার।