বৃহস্পতিবার,২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ‘নারী লেখকদের লেখায় নম্র আন্তরিকতা থাকে’ - গোলি তারাঘি
০৯/০৬/২০১৮

‘নারী লেখকদের লেখায় নম্র আন্তরিকতা থাকে’ - গোলি তারাঘি

-

ইরানের নির্বাসিত লেখক গোলি তারাঘির জন্ম ১৯৩৯ সালে তেহরানে। বেশ কিছু প্রশংসিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাসের লেখক তিনি। পড়াশুনা করেছেন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, মিথোলজি এবং প্রতীকীবাদের ওপর। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে গোলি তারাঘি দেশ ছেড়ে প্যারিসে চলে আসেন। তারাঘির এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদ মোজাফ্ফরি। ‘ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস’-এর সাইটে প্রকাশিত। অনুবাদ করেছেন এমদাদ রহমান। নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হলো।

নাহিদ মোজাফ্ফরি
আপনি ইরানের সেই মুষ্টিমেয় লেখকদের একজন যাকে নির্বাসনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে ১৯৭৯-এর ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে। নিজদেশে লেখালেখি আর নির্বাসনকালীন সময়ে আপনার লেখালেখির অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই।

গোলি তারাঘি
জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমি দুটি বিশ্বে থেকেছি। ৭৯-তে আমি ইরান ছেড়েছিলাম, ইসলামি বিপ্লবের একেবারে গোড়ার দিকে। তখন থেকেই আমার জীবনে প্যারিস আর তেহরানের মধ্যে অবিরাম ছুটে চলার ধারাবাহিক যাত্রার সূচনা হলো এক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক বাস্তবতায়। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দ্বৈত অস্তিত্ব আমার সাহিত্যকেও একটা বিশেষ মাত্রা দিয়ে দিল। কিন্তু তেহরানে আমাকে বারবার ফিরে যেতে হয়েছিল কারণ লেখালেখিতে আমার সমস্ত প্রেরণা ছিল আমার স্বদেশ। ইরান হচ্ছে পরস্পরবিরোধিতা আর মতানৈক্যের এক মহাসমুদ্র, এমন এক দুনিয়া যা হাস্যকরুণরসাত্মক অসংখ্য চরিত্র, কিম্ভূতকিমাকার ঘটনা আর পরাবাস্তব পরিস্থিতিতে ভরপুর। প্যারিসের কোথায় আমি বেদানাওলা সেই নারীকে খুঁজে পাব? তবে একইসঙ্গে আমার কাছে প্যারিস হচ্ছে নিজেকে অবিরাম ঋদ্ধ করবার এক স্থান। প্যারিসের মুক্ত হাওয়া আমাকে লেখালেখির অদম্য শক্তিটা জোগাল।

নাহিদ মোজাফ্ফরি
কোন কোন লেখক আপনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন?

গোলি তারাঘি
লেখার ক্ষেত্রে আমার নিজের একটা স্টাইল আছে, ভাবনার একটা বিশেষ ধরন আছে। তবে এটা তো সত্য যে নবোকভ এবং সালমান রুশদি’র বইয়ের কিছু কিছু জায়গা আছে, যা আমাকে সত্যিকার অর্থেই স্পর্শ করেছে। ফোরুখ ফারুখজাদ, যিনি ইরানের একজন প্রখ্যাত কবি, তার কবিতাও আমার ভীষণ প্রিয়। অবশ্যই প্রত্যেক লেখকেরই কলমের মর্মে রয়েছে ঘুমন্ত সংগীত, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা আর একান্ত যোগাযোগ।

নাহিদ মোজাফ্ফরি
ইরানে লেখালেখির বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী লেখক এবং তাদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে কিভাবে? তারা কি বিভিন্ন ধরনের এবং ব্যতিক্রমধর্মী লেখা লিখছেন? আপনি কি মনে করেন পুরুষ লেখকরা নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন?

গোলি তারাঘি
নারী লেখকদের কাজকে আমি সিরিয়াসলি নিই, কারণ তাদের লেখায় এমন এক নম্র আন্তরিকতা থাকে, পুরুষ লেখকদের লেখায় আপনি তা পাবেন না। বিপ্লবের আগে ইরানি সাহিত্যে কমিউনিস্ট আদর্শের আধিপত্য ছিল; যে কেউই এই সাহিত্যকে মোটাদাগে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য বলে চিহ্নিত করতে পারত। ইরানি লেখকদের বেশিরভাগই এসেছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত-শ্রেণি থেকে, আর তারা লিখেছেন খেতমজুর কিংবা নিপীড়িত শ্রমিকদের নিয়ে। লেখকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন সচ্ছল পরিবারগুলি থেকে আসা। তারা মার্কসবাদী ছিলেন; সমাজের লাঞ্ছিত বঞ্চিতদের নিয়েই তারা লিখতে ব্রত হয়েছেন। কিন্তু, নারী লেখকরা ইরানি সাহিত্যে নতুনধারা তৈরি করেছেন, যা নিজস্ব, ব্যক্তিগত। তারা নিজেদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে নিজেদের একান্ত সমস্যাগুলি, অসুখী বিবাহিত জীবনের নিঃসঙ্গতা নিয়ে কথা বলেছেন। সরকারি সেন্সরশিপ, পারিবারিক সেন্সরশিপ, এবং প্রকাশের লজ্জার কারণে তারা অনেক কিছুই খোলাখুলি বলতে পারেন নি। তবে তারা যা কিছু বলার তা তাদের মতো করেই বলেছেন, আকারে-ইঙ্গিতে, কখনও প্রতীকী।

নাহিদ মোজাফ্ফরি
আমরা দুজনেই জানি যে ইসলামি বিপ্লব থেকেই ইরানে ব্যাপক সংখ্যক নারী লেখকের জন্ম হয়েছে এবং তাদের অনেকেই এখন বিশিষ্ট লেখকে পরিণত হয়েছেন। এই বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

গোলি তারাঘি
বিপ্লবটা যখন শুরু হলো তখন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী, লেখক ও চিত্রকর তা আমার জানা ছিল না যে, তাদের সত্যিকার মনোভাবটি কী অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে আমি তেহরানেই ছিলাম, দেখলাম তেহরানের রাস্তায় অগুনতি মেয়ে শুধু ওড়না পরে তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলি নিয়ে বের হয়ে পড়েছিল, গান শেখাবার ক্লাস উপচে পড়ছিল তাদের উপস্থিতিতে; আর কী দ্রুতই না এই সুবর্ণ সময়ের মুখরতা গভীর হতাশায় ডুবে গেল। কিন্তু এমন একটা কিছু ঘটেছিল যাকে আর কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। বিপ্লবের সময়ে, বহু সংখ্যক তরুণী, বিশেষ করে সমাজের একটু নিচু শ্রেণির কম বয়সী নারীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিল, জনতার ভিড়ে এসে মিশে গিয়েছিল। তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ এবং বাঁধন মুক্ত বলে মনে করছিল। নতুন এই আত্মপরিচয়টিকে তারা আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছিল।
তারা আর কোনোভাবেই তাদের আগের পরিচয়ে ফিরতে চাইছিল না-যেখানে তারা ছিল একেবারে নামহীন, আত্মপরিচয়হীন। আমাকে একজন বিখ্যাত লেখিকা একদিন বলছিলেন, তাকে মহিলাদের জেলখানায় একজন সবসময় পাহারা দিত। বিপ্লবের আগে তিনি কখনও লিখতে সাহস পেতেন না। আর এখন তার স্বামীও তাকে লিখতে উৎসাহ দেন। অন্য অনেকের বেলায়ও এটা সত্য। তখনই নারী চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রী, নার্স, টেক্সি ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পরিচয়ে উত্থান ঘটে। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন ছাত্রীদের সংখ্যা ৬৫%। মনে রাখতে হবে, এদের বিরাট অংশটাই এসেছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে।

নাহিদ মোজাফ্ফরি
ইরানে সেন্সরশীপ কিভাবে প্রয়োগ করা হয়? নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কি পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে? নাকি এ ব্যাপারে এত আগে কিছু বলা ঠিক হবে না?

গোলি তারাঘি
হ্যাঁ, এ ব্যাপারে একদম শুরুতেই কথা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট রূহানী দাবি করছেন যে, তিনি বন্ধ দরজাগুলি খুলে ফেলার জন্য চাবি নিয়ে এসেছেন। প্রেসিডেন্ট এবং তার চাবির জাদুশক্তির ব্যাপারে আস্থা এনেও বলতে হবে, ইরানি জনগণ হয় অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত, না হয় অতিমাত্রায় আদর্শবাদী হয়ে পড়েছে। আমার কিছু লেখক বন্ধু আবার আশাবাদীদের দলে, আর আমার প্রকাশক এ-ব্যাপারে একটু বেশিই যেন উত্তেজিত। দেখে মনে হচ্ছে খুব ছোট্ট একটি দরজা একটুখানি ফাঁক হয়েছে। কিন্তু খোলা দরজার কাছেই খুব কঠোর আর চামড়াসর্বস্ব একটি হাত আমাদের বইগুলিকে খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে, কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না। অনিশ্চিত এই দরজা যে কোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আপনার কম্পিত আঙুলগুলিকে থেঁতলে দিয়ে। আমার মনে আছে খাতামি’র আমলে একটি জানালা খুলে গিয়েছিল, আর সেটা এক মুহূর্ত খোলা ছিল। সেই মুহূর্তে আমরা নিজেদের উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, আমরা আমাদের বইগুলিকে নিয়ে সেই জানালার কাছে পৌঁছেছিলাম।
দুর্ভাগ্যবশত, সেই সময়টা দীর্ঘ হয়নি। সেন্সরশিপ নিয়ে তখন লুকোচুরি খেলাটা শুরু হয়েছিল। আপনাকে কোনার দিকের একটি চেয়ারে বসে বসে অপেক্ষা করতে হবে। কোনো কোনো অপেক্ষা আবার সারাজীবনেও শেষ হবে না; অগত্যা বগলে আপনার বইটিকে চেপে ধরে এই অদ্ভুত দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। দুই বছর আগে ইসলামিক গাইডেন্স মিনিস্ট্রিতে আমি আমার শেষ বইটি জমা দিয়েছিলাম প্রকাশের অনুমতির জন্য। সেই অনুমতি আজও আসেনি। আমি অপেক্ষা করছি। আপনাকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করার এটা তাদের এক কৌশল। কিছু বইকে তারা ‘শর্তসাপেক্ষ’ বলে ঘোষণা করে। মানে হচ্ছে, এই বই নিয়ে তাদের সঙ্গে আপনি দরাদরি করতে যাবেন, বইয়ের বেশিরভাগ অংশই ফেলে দিবেন, ‘অগ্রহণযোগ্য’ শব্দ ও নামগুলিকে ছেঁটে ফেলবেন। নামের প্রতি তারা বড়ই সংবেদনশীল। এতকিছুর পর আপনার বিস্ফোরক বইটিকে তারা প্রকাশের অনুমতি প্রদান করতেও পারে। বইটি তখন বেশ ভালো বিক্রি হবে, সমালোচকরা বইটিকে প্রশংসা করবেন, আর তারপর অজ্ঞাত কারণে বইটি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে; আমার একটি বইয়ের ক্ষেত্রেও তা হয়েছিল।