সোমবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / ইনোভেটিভ হায়ারিং ও লীনা নায়ার
০৯/০৬/২০১৮

ইনোভেটিভ হায়ারিং ও লীনা নায়ার

-

“My purpose is to ignite the Human Spark to build a Better Business and a Better World”

কথাগুলো লীনা নায়ারের। তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস কোম্পানি ইউনিলিভারের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। এতবড় জায়গায় আসন প্রতিষ্ঠিত করতে এই নারী নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়েছেন শতভাগ। লীনা ইউনিলিভারের প্রথম নারী মানবসম্পদ প্রধান তো হয়েছেনই, এমনকি এশিয়দের মধ্যেও তিনি সর্বপ্রথম এই দায়িত্বে এসেছেন। পাশাপাশি তিনি নিজের বয়সকে ছাপিয়ে উঠেছেন অনন্য উচ্চতায়। ইউনিলিভারের সর্বকনিষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক পদে নিজেকে নিয়ে গিয়ে প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছা আর একনিষ্ঠ পরিশ্রমের যথাযথ সম্মিলন ঘটাতে পারলে অল্প বয়সেই নিজের স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে যাওয়া যায়।

১৯৬৯ সালে ভারতের মুম্বাইয়ের কোলাপুরে জন্ম নেয়া লীনা প্রথমে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রী। পরবর্তীতে জামসেদপুরের জেভিয়ার স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট থেকে ব্যবস্থাপনায় র্গ্যাজুয়েট হন। অন্যদিকে কর্মজীবনে লীনার মূল পথচলা শুরু হয় ১৯৯২ সালে হিন্দুস্তান লিভারের ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে যোগ দেয়ার মাধ্যমে। কয়েক ধাপ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হন ২০০০ সালে। ২০০৭ সালে ৯০ বছর পাড়ি দেওয়া হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে প্রথম নারী হিসেবে যুক্ত হন। ২০১৬ সালে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ পান একই বিভাগে। পরের বছরই পদোন্নতি ঘটে এই বিভাগের নির্বাহী পরিচালক পদে। আর ২০১৬ সালে ১৯০টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ইউনিলিভারের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। একই সাথে নিযুক্ত হন ইউনিলিভার লিডারশিপ এক্সিকিউটিভ হিসেবেও।

ইনোভেটিভ হায়ারিং
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ইউনিলিভারের দেড় লক্ষাধিক অভিজ্ঞ কর্মিবাহিনীর দায়িত্বে থাকা লীনা নায়ারের উদ্ভাবনী ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরিচয় পাওয়া যায় বহুজাতিক কোম্পানিটির নিয়োগ প্রক্রিয়া লক্ষ্য করলে।

নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে আসেন লীনা। সফরকালে অন্যান্য অনেক প্রসঙ্গের পাশাপাশি কথা বলেন অভিনব এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও।

কেমন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া?
তিনি বলেন চাকুরিপ্রার্থীদেরকে প্রথমে কয়েকটি ভিডিও গেইম খেলতে দেয়া হয়। এই গেমিং পর্বের মাধ্যমেই মোটামুটি যাচাই হয়ে যায় কারা অধিকতর যোগ্য। “আমরা প্রবল মানসিক শক্তি, শেখার সক্ষমতা এবং কোনকিছু পরিবর্তনের সক্ষমতার মত গুণগুলোকে বিবেচনায় নিই। আর এ সবই
বোঝা যায় গেইম খেলানোর মধ্য দিয়ে,” বলছিলেন লীনা নায়ার। গেমিং সেশনের পর প্রত্যেক প্রার্থীকে ৩০ মিনিট ধরে কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে সয়ংক্রিয়ভাবে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং এই সেশনটি ভিডিও রেকর্ড করে আপলোড করতে বলা হয়। পরবর্তীতে মেশিন লার্নিং এর মত অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং সিস্টেম ব্যবহার করে প্রার্থীদের মুখভঙ্গি বিশ্লেষণ করা হয় এবং এই বিশ্লেষণের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই সাক্ষাতকারের জন্য প্রার্থী বাছাই করা হয়।

অর্থাৎ, যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রযুক্তি নির্ভর। এতোসব কিছুর পর সাক্ষাতকারের মাধ্যমে বাছাইকৃত প্রার্থীদেরকে দুই পাতার একটি প্রতিবেদন দেয়া হয় যেখানে প্রত্যেকের নিজ নিজ যোগ্যতা এবং ঘাটতির উল্লেখ থাকে।

লীনা নায়ারের বুদ্ধিদীপ্ত মগজের অবদানে উদ্ভাবিত এই নিয়োগপ্রক্রিয়া গোটা বিশ্বে রীতিমত আলোড়ন তুলে দিয়েছে। এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যেই পঞ্চাশটি অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে। এমনকি এটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা আবিষ্কারও বলা হচ্ছে।

কেন এই পদ্ধতি
লীনা নায়ারের মতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসলে মানুষকে যন্ত্রের চ্যালেঞ্জের সামনে ছেড়ে দেয়া হয় যেন মানুষ নিজেকে সেরা হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। অকস্মাৎ সামনে আসা চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে তারও একটা প্রশিক্ষণ এই নিয়োগপদ্ধতি। মোটের ওপর, আদর্শমানের কর্মী খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের এই নিয়োগপদ্ধতিই বিশেষ কার্যকরী হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

নারীবান্ধব কর্মস্থল তৈরিতে লীনা নায়ার
উপমহাদেশের রক্ষণশীল পরিবেশে থেকেও নারীরা যাতে নিজেদের কর্মশক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে সেজন্য তিনি ইউনিলিভারে ‘ক্যারিয়ার বাই চয়েস’ নামের অভিনব একটি প্রোগ্রাম চালু করেন। এই প্রোগ্রাম ইতোমধ্যেই কর্মস্থল থেকে ঝরে যাওয়া নারীদেরকে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনার জন্য খুবই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

মানবসত্ত্বার বিকাশ চান লীনা
প্রযুক্তির চরম উতকর্ষতার এই যুগে বিশ্বের ৬৭ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা ভাবেন যন্ত্রই হচ্ছে ব্যবসাক্ষেত্রে টিকে থাকার মূল হাতিয়ার। অন্যদিকে লীনা নায়ারের বিশ্বাস করেন মানুষ যত বেশি তার সত্ত্বাগত উন্নতি ঘটাতে পারবে ততোই তার টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। তার মতে মানুষের মধ্যে কোনকিছু আবিষ্কার করা বা কোন সমস্যার সমাধান করার যে সক্ষমতা এটিকে উপলব্ধি করতে পারলেই মানুষ ব্যবসাক্ষেত্রে আরো এগুবে।

ভারতবর্ষের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় বড় হয়েও একজন নারী কিভাবে নিজেকে স্বপ্নের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লীনা নায়ার। নারী তার জীবনের স্বাভাবিক গতিধারা বজায় রেখেও যে বিরাট অর্জন হাতের মুঠোয় পুরতে পারে তা তার চেয়ে ভাল করে আর কজন দেখিয়েছেন?

- সাজ্জাদুর রহমান