মঙ্গলবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মার্গারেট স্যানগার
০৮/২৬/২০১৮

মার্গারেট স্যানগার

- সালেহা চৌধুরী

বিএ পরীক্ষার পর মার্গারেট স্যানগারকে বাবা ডেকে পাঠান বাড়িতে এসে অসুস্থ মায়ের তদারকি করবার জন্য। তখন একটা স্কুলে কাজ করছিলেন তিনি। বাবার ডাকে বাড়িতে ফিরে এসে দেখলেন মায়ের যক্ষারোগ হয়েছে। মায়ের বয়স তখন উনপঞ্চাশ বছর। কিন্তু ইতোমধ্যে আঠারোবার গর্ভবতী হতে হয়। এবং বেঁচে থাকা এগারোজন সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি তখন জীবনের সমস্ত শক্তি হারিয়ে যক্ষার কবলে বিধ্বস্ত। মা মারা গেলেন। এরপর কিছুদিন বাড়ির কাজ কারবার সামলে তিনি এসে ভর্তি হলেন ‘হোয়াইটপ্লেন নাসিং স্কুল’-এ। ১৯০২ সালে নার্সিং স্কুলের দুই বছর শেষ করে তিন বছরের আর একটি বড় নার্সিংকোর্স শুরু করেন। এরইমধ্যে বিয়ে করে ফেলেন উইলিয়াম স্যানগারকে। প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে বিয়ের প্রায় পনেরো মাস পরে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলেও তাকে অনেকদিন আরোগ্য নিকেতনে থাকতে হয়। সকলে তখন রায় দিয়েছিল এই নারী বাকি জীবন অবশ হাত-পায়ে জীবন কাটাবেন, অর্থাৎ ‘ডিসেবল’ লাইফ। তিনি কোন কথায় কান না দিয়ে বেরিয়ে আসেন আরোগ্যো নিকেতনের দমবন্ধ পরিবেশ থেকে। তাঁর শরীর ভালো হয়। ইচ্ছে বা শরীরের ক্ষমতা না থাকলেও তাঁকে আরো দুটো সন্তানের জন্ম দিতে হয়। নিউইয়র্কের পূর্ব অঞ্চলে তখন তিনি মিডওয়াইফ বা ধাত্রী হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। এই সময় তাকিয়ে দেখেন মেয়েদের অবস্থা। বছরের পর বছর সন্তান জন্ম দিতে দিতে যারা রুগণ, বিবর্ণ ও রক্তশূন্য। যাদের সংসারে কিলবিলে সন্তান বাড়ছে, এবং অভাবও বেড়ে উঠে তাদের ঠিকমতো বড় হবার সুযোগ দিচ্ছে না, আর মায়েরা ক্রমাগত লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। এসব দেখে তিনি বলেন, 'Women were destined to be thrown on the scrap heap before they were thirty five.' তখনই শুরু হলো জন্ম নিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম, নারীর দেহ রক্ষার কাজ, তাঁদের সন্তান গ্রহণ করবার ইচ্ছে বা অনিচ্ছের কথা। তাঁরা যে কেবল সন্তান উৎপাদনের মেশিন নয় সেটাই হলো বক্তব্য। মার্গারেট স্যানগার দেখলেন পঁয়ত্রিশ বছরে একজন নারী শেষ কিন্তু পঁয়ত্রিশ বছরে পুরুষের জন্য আর একখানা জরায়ূসংবলিত নারী খুঁজে পাওয়া মোটেই কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।

১৯১২ সালে মার্গারেট স্যানগার একটার পর একটা প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন এই বিষয়ে। সঙ্গে গ্রহণ করলেন সক্রিয় কর্মপন্থা। তখন ‘কল’ নামের একটি সমাজতান্ত্রিক কাগজে এইসব লেখা শুরু হলো। নারীদের সন্তান ধারণের ক্ষমতা ও অধিকার, জন্ম নিরোধ ব্যবস্থা, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভপাতের কারণ এবং সমাধান এমনি নানা ‘অফসিন’ বিষয় (সে কালের ভাবনায়)। তখনকার সেন্সরশীপ বোর্ড বললো- এসব লেখা চলবে না। কিন্তু তিনি থেমে থাকলেন না। বুঝতে পারলেন তাঁর যাত্রাপথ দুর্গম। তিনি ইউরোপে এলেন। দেখলেন সেখানে জন্মনিরোধ ব্যবস্থা কেমন ভাবে হয়। সেখানে তখন এই কাজ খানিকটা শুরু হয়েছে। তারপর এবার ফিরে এসে বলতে লাগলেন নারীর এইসব দাবি আইনসম্মত করা হোক। তিনি ‘ন্যাশনাল বার্থ কনট্রোল লিগ’ নামে একটি সংস্থার প্রতিষ্টা করেন। একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতে শুরু করলেন। পত্রিকার নাম ‘ওম্যান রিবেল’। যে সব কথা ‘কলে’ লিখতেন সেগুলো কেন লেখা হবে না এই নিয়ে শুরু করলেন তিনি তাঁর কলমী প্রবন্ধ। সাত মাস চলার পর আমেরিকার পোস্টঅফিস বললো এসব অশ্লীল কাগজ পোস্ট করা যাবে না। জেলে যেতে যেতে সে যাত্রা কোনোমতে বেঁচে গেলেন তিনি। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ফ্যামেলি লিমিটেশনস।’ এইসব পুস্তিকা প্রচার এবং তাঁর অভিযান অব্যহত রইল।

১৯১৬ সালে তিনি বার্থ কনট্রোল ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। জায়গা ছিল নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। কাজের জন্য তিনজন মানুষ তখন। তিনি নিজে, তাঁর এক বোন এবং আর একজন বান্ধবী যে ইয়েডিশ ভাষা জানতো। সেখানে জন্মনিয়ন্ত্রের নানা উপদেশ দিতে শুরু করলেন। জন্মনিরোধ জিনিসপত্র বিক্রি করতে শুরু করলেন। দশদিনের মাথায় দেখা গেল পাঁচশোজনেরও বেশি নারী সেখানে আসতে শুরু করেছে। যারা নানাভাবে বাড়তি সন্তান জীবনে না আনার কাজে অসমর্থ, প্রাণে ও অভাবে শেষ হতে চলেছেন। পুলিশ ধরলো তাকে, জেলে পুরলো এবং পুরো ক্লিনিককে বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। কোর্ট যে রায় দিল সেটা এমন- এ কাজ কেবল ডাক্তারই করতে পারবে। নানা যৌনব্যাধি থেকে বাঁচতে তারা এমন কাজ করতে পারে। এখানে হলো তার জয়। এরপর মার্গারেট স্যানগার ‘বার্থকনট্রোল রিভিউ’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। যেটা পরে ‘প্লানড পেরেন্টহুড ফেডারেশন’ নামে বিখ্যাত হয়। তারপর গড়ে তোলেন বার্থকনট্রোল রিসার্চসেন্টার। এরপর সারাদেশে আরো তিনশোটি এমন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয় যাদের মডেল ছিল স্যানগারের এই রিসার্চকেন্দ্র। এই সব করতে করতে ১৯৩৭ সালে এলো তাঁর আর একটি বিজয় যখন আমেরিকার মেডিকাল স্কুলে জন্মনিরোধ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পড়াশুনার বিষয় বলে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। জন্মনিয়ন্ত্রণ মানে পৃথিবীর লোকসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা। তাঁর এই বক্তব্য প্রথমে কেউ মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সকলে বুঝতে পারে জন্ম বিস্ফোরণ বা নিয়ন্ত্রণ না হলে কি হতে পারে। ভারত বা বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই জরুরি ব্যবস্থার কথা সকলের মনে পড়বে। ১৯৫২ সালে একটা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় যার নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল প্লানড্ পারেন্টহুড ফেডারেশন’। সেখানকার প্রথম প্রেসিডেন্ট তিনি। ১৯৬০ সালে তাঁরই চেষ্টায় বার্থকনট্রোল পিলের জন্ম। তাঁর ভাবনা থেকে। এসব করতে গিয়ে সমাজ, ধর্ম বিশ্বাস, ঈশ্বরের ভয় এসব কাটিয়ে উঠতে যে পর্বতপ্রমাণ বাধা তাঁর মোকাবেলা করেছেন এই সেই নারী যার সারাজীবন ‘ডিসেবল’ চলৎশক্তিহীন হয়ে থাকবার কথা ছিল।

সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখে ১৮৮৩ সালে তাঁর জন্ম নিউ্য়র্কের কর্নিং-এ। অনেক ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছয় নম্বর। ‘কলে’ যেসব লিখে ছিলেন তাদের নাম- এভরি মাদার সুড নো, হোয়াট এভরি গার্ল শুড নো। ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন, পারেননি। নার্স হয়ে ছিলেন এসব কাজ ঠিকভাবে সমাধা করবার জন্য। যা ছিল তাঁর ‘প্লানড পারেন্টহুড এ্যাসোসিয়েসন’ তাই হয় পরে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্লানড পারেন্টহুড ফেডারেশন।’

তিনি যে সব গ্রন্থ রচনা করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - দি কেস ফর বার্থ কনট্রোল- ১৯১৭, দি পাইভট অব সিভিলাইজেসন- ১৯২২, মাই ফাইট ফর বার্থ কনট্রোল- ১৯৩১, মার্গারেট স্যানগার আন অটোবাইওগ্রাফি- ১৯২২।

তাঁর জীবনীকার এলেন চেসলার লিখেছেন- Every woman in the world today who takes her sexual and reproductive autonomy for granted should venerate Margaret Sanger.

তিনি মারা যান ১৯৬৬ সালের ছয়ই সেপ্টেম্বর।