মঙ্গলবার,২৩ Jul ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / বন্ধু নার্সিসিস্ট নয়তো?
০৮/২৬/২০১৮

বন্ধু নার্সিসিস্ট নয়তো?

-

নার্সিসিজম মূলত একধরনের পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের সংকট। মানবচরিত্রে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা বা নিজেকে সুপিরিয়র ভাবার বৈশিষ্ট্য থাকাটা নার্সিসিজমের পরিচায়ক। কাছের মানুষ বা বন্ধুটি যদি নার্সিসিস্ট অথবা প্রবলভাবে আত্মকেন্দ্রিক হন তবে তা বন্ধুত্বের একটা না একটা সময় ফাটল ধরাবেই। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সম্যক জ্ঞান এবং যাচাই করে দেখার উপায় জেনে রাখা প্রয়োজন।

গ্রিক মিথের নদী দেবতা সেফিসাস এবং জলদেবী লিরিওপের পুত্রসন্তান নার্সিসাসে’র নাম থেকে নার্সিসিজম শব্দের আগমন। নার্সিসাস হলো অসম্ভব রূপবান এক যুবক। জলের দেবী, বনের দেবী, সুন্দরী মেয়েরা প্রায় সবাই প্রেমে পড়ত নার্সিসাসের। কিন্তু সে কাউকে পাত্তা দিত না। শেষপর্যন্ত নার্সিসাস ঝরনার পানিতে দেখা তার নিজের প্রতিবিম্বের প্রেমেই বুঁদ হয়ে যায়। তার জীবনের পরিসমাপ্তিও হয় এভাবেই।

‘অন নার্সিসিজমঃ এন ইন্ট্রোডাকশন’, ১৯১৪ সালে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের লেখার পর নার্সিসিজমের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে যায়। যার কেতাবি নাম ‘নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজওর্ডার’। ফ্রয়েড বললেন, একদম জন্ম থেকেই কিছু মাত্রায় নার্সিসিজম মানুষের জন্য একেবারে অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। এমনকি সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অতিমূল্যায়ন, প্রশংসার ফুলঝুরি এবং সন্তানরেও একইরকম প্রত্যাশা-এসব থেকে একদম গোড়া থেকেই নার্সিসিজম শুরু হয়। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালের পর থেকে যদি নার্সিসিজমের মাত্রা বেড়ে যায় তাহলে সেটা হয় খুব বাজে। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন আপনার কাছের বন্ধুটি এমন?

নিজেকে সবসময় সঠিক ভাবে
নার্সিসিস্ট নিজে যা ভাবে ও করে তা সবসময় সঠিক মনে করে। তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই মনে করে, সে যা জানে সেটাই সবচেয়ে ভালো। তারফলে অন্য দৃষ্টিভঙ্গির কোনো মূল্য নেই। আর সে যেহেতু নিজেকে সর্বদা সঠিক মনে করে তাই তার চিন্তাধারা দ্বারা অন্যদের পরিচালিত করতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সে আপনাকে সাহায্য করতে চাইছে। কিন্তু আরেকটু তলিয়ে দেখুন এর পেছনে শুধু তার শ্রেষ্ঠতা প্রমাণের প্রবণতাই মূল কিনা।

নিজেকে সবচেয়ে উদার ও মহান ভাবা
যদি এমন হয় যে আপনার বন্ধু একবার কোনো সাহায্য করে বহুবার সে বিষয়ে আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সে আসলে কতটা সাহায্যপ্রবণ তাহলে তাকে নিয়ে আপনার আরেকবার ভাবতে হবে। নার্সিসিস্ট ব্যক্তি ভাবে সে অতিমানবিক, অতিদয়ালু ও বন্ধুর প্রতি পরম সহমর্মী। নিজের উদারতা প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা তার দৃষ্টান্তের চেয়েও বেশি। সে কি কি করেছে তা বন্ধুদের বলতে ভালোবাসে। এমন ব্যক্তিকে মনোবিজ্ঞানে বলে ‘কমিউনাল নার্সিসিস্ট’।

পরনিন্দা করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা
সে আপনার আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা চায় কিন্তু বিপরীতে আপনার কাছে অন্য বন্ধুর দোষ বর্ণনা করে আস্থাহীনতার পরিচয় দেয়। ‘কাউকে বলো কিন্তু না...’ এভাবে তার গল্প শুরু করে অথচ গল্পটা তার নিজের না। অন্যের সৌভাগ্যে এরা খুশি হতে না পারলেও অন্যের দুর্ভোগে তারা আনন্দ পায়। নার্সিসিস্টরা কারো প্রতিই লয়্যাল থাকে না। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার যে, সে আপনার কথা অন্যদের কাছে গিয়ে বলবে।

উপদেশ গ্রহণ করতে পারে না
নার্সিসিস্টরা কল্পনায় নিজের এক শ্রেষ্ঠ জগৎ গড়ে তোলে। যেখানে সে নিজেই নায়ক, মহান এবং নির্ভুল। তাই কেউ যখন তার ভুল ধরিয়ে দেয় বা ভালো কোনো উপদেশ দেয়; সে এটাকে আক্রমণ ভাবে। বিপরীতে সে পরামর্শদাতাকেই ঈর্ষান্বিত ও হিংসাপরায়ণ ভাবতে ভালোবাসে।

নিজের প্রাধান্য চাওয়া
নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সবসময় সবার মনোযোগ পেতে চায়, অন্যদের তুলনায় তার প্রতি অনেক বেশি প্রাধান্য আশা করে। তার অধঃস্তনদের ক্ষতি করা এবং অন্যদেরকে দোষ দেওয়া একজন নার্সিসিস্টের খুবই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সে সবসময় নিজের সুনামের আশায় থাকে এবং অন্যদের সফলতাকে অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখে।

একজন নার্সিসিস্ট মনে করে সে অনেক আকর্ষণীয়, বুদ্ধিমান এবং অন্যদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজের অর্জন ও সামর্থ্যকে খুবই বড় করে দেখে এবং তার ইগো অনেক বেশি থাকে।

একজন নার্সিসিস্টের কাছে নিজের প্রয়োজন সবার আগে, কিন্তু অন্য কেউ তার প্রয়োজন প্রকাশ করলে নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে। সে হয়ত লোকজনের সামনে বা ক্যামেরার সামনে নিজেকে অনেক মহান হিসেবে উপস্থাপন করে; কিন্তু কেউ যদি সেটি লক্ষ্য না করে তবে সে আপসেট হয়ে পড়ে।

বন্ধু এমন হলে কী করবেন?
যদি উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো আপনার কাছের বন্ধুটির মাঝে লক্ষ্য করা যায়, যদি দেখেন তার কথা ও আচরণে আমি আমিতে ভরা তাহলে সম্পর্কটাকে নতুন করে সাজান। আপনি নিশ্চয় সম্পর্কের মূল্য বোঝেন, তাই তাকে তার মতো করে ব্যাপারগুলো বোঝান। তাকে বলুন, আপনাদের দুজনার বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক কতটা মুল্যবান। তাই বন্ধুত্বে একজন আরেকজনকে ছোট করা যে বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয় তা তাকে বুঝানোর দায়িত্ব আপনারই। আর যদি তার সমস্যা প্রকট হয় তবে ভালো মনোরোগবিদের কাছে যান।

- রিয়াদ