শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / সেকালের ঈদ
০৮/১৮/২০১৮

সেকালের ঈদ

-

মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ইদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। কালের বিবর্তনে মূল বিষয় এক থাকলেও অন্য অনেক কিছুর মতো এই উৎসব উদযাপনের ঢঙেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। একালের ঈদ তো আমরা নিজেরাই দেখছি এবং উদযাপন করছি। বরং দেখে আসি পুরনো সেসব দিনের কুরবানি ঈদ কেমন ছিল।

পোশাক-পরিচ্ছদ
নতুন কাপড় ছাড়া এখনকার দিনে কোনো ঈদই কল্পনাই করা যায় না। অথচ বেশ কয় বছর আগেও কোরবানির ঈদে নতুন কাপড় নিয়ে কেউ ভাবতো না। ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদে কেনা কাপড়ই পরা হতো এই ঈদে।

কোরবানির দেওয়া
সেকাল আর একালের কোরবানি ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা হলো কোরবানি দেওয়ার মতো সামর্থ্যবানের সংখ্যা। আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে তো বটেই এমনকি পনেরো বিশ বছর আগেও কোরবানি দেওয়া লোকের সংখ্যা এত ছিল না। সুতরাং কোরবানি ঈদ ছিল অনেকটা বিত্তশালীদের ঈদ। তা সত্ত্বেও অসচ্ছলরা এই ঈদের আনন্দ থেকে খুব একটা বঞ্চিত হতো না। আরেকটা বিষয় হলো তখনকার দিনে প্রতিযোগিতামূলকভাবে কোরবানি দেওয়ার প্রচলনটা খুব বেশি কোথাও তেমন একটা দেখা যেত না।

গরু কেনা
গেল শতকের ঢাকায় কোরবানি গরুর বিখ্যাত হাট ছিল রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাট, গাবতলী, রমনা রেসকোর্স, হোসেনি দালানসংলগ্ন মাঠ। এছাড়া মফস্বলের দিকে অনেক দূরে দূরে নির্দিষ্ট স্থানে গরু-ছাগলের হাট বসতো। বেশিরভাগ পরিবারই যৌথ ছিল বিধায় বাবা-চাচাদের সাথে সব চাচাতো ভাইয়েরা যেতো গরুর হাটে। অবস্থাপন্ন পরিবারে কাজের লোক ছিল যারা কোরবানির গরুকে হাট থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার কাজ করতেন।

মাংস কাটা এবং বণ্টন
কোরবানির পর উৎসবমুখর পরিবেশে খোলা জায়গায় চাটাই বিছিয়ে বাড়ির সকল পুরুষ সদস্য বসে পড়তেন মাংস কাটার জন্য। এ সময় বেশ মজার একটা ঘটনা ঘটতো। যে সবার আগে গরুর শরীর থেকে রান আলাদা করতে পারতো সে বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতো। কাটাকুটি শেষে সেখানেই মাংসকে তিনভাগ করে সেগুলো দ্রুত বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা করতেন। যাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অথচ আর্থিক সঙ্গতি ছিল না তাদেরকে কোরবানিদাতারা গোপনে মাংস পাঠিয়ে দিতেন। এখনকার মতো আগেও কোরবানি ঈদে গরুর রান বিনিময়ের সংস্কৃতি ছিল। বিশেষ করে মেয়ের বাড়ি, বোনের বাড়ি, জামাই বাড়ি, নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠানো হতো গরুর রান। তখন এটি ছিল আভিজাত্য প্রকাশের অন্যতম উপায়।

খাওয়া-দাওয়া
ঈদের মতো উৎসবে নানান পদের খাওয়াদাওয়ার আয়োজনের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান নিজেদের রসনাবিলাসের পরিচয় বেশ ভালোভাবেই দেয়। তবে আগেকার দিনে কোরবানি ঈদের দিনের প্রথম খাবার ছিল কোরবানির মাংস। এই মাংস রান্না হওয়ার আগে সকাল থেকে কেউ কিছু খেত না। চালের আটার রুটি ছিল ভুনা মাংসের অন্যতম পরিপূরক। সেই সাথে মোগলদের কাছ থেকে পাওয়া হরেকরকম রেসিপির প্রয়োগ তো থাকতোই। দাওয়াত দিয়ে বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদেরকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে গ্রামের দিকে ভাত কিংবা রুটির সাথে মাংস থাকতো। আর ঢাকায় কাচ্চি, তেহারি কিংবা পোলাওয়ের সাথে নানারকম কাবাবের প্রচলনটাই বেশি ছিল।

মাংস সংরক্ষণ
এখনকার মতো তখন রেফ্রিজারেটার না থাকায় কোরবানির ঈদে মাংস সংরক্ষণ করতে হতো বিশেষ কয়েকটি পদ্ধতিতে। তন্মধ্যে অধিক প্রচলিত পদ্ধতি ছিল বড় বড় পাতিলে জ্বাল দিয়ে রাখা। অনেকে আবার শুকিয়েও রাখতেন মাংস। এছাড়া গরুর চর্বির মধ্যে বিশেষ কায়দায় মাংস ডুবিয়ে রেখে ছয়-সাত মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতো। শুধুই লবণ এবং হলুদ দিয়ে জ্বাল দিয়ে রাখা মাংস খাওয়ার লোভে বাচ্চারা বড় বড় হাঁড়িগুলোর আশপাশে ঘুরঘুর করতো।

বিনোদন
যখন প্রযুক্তি এতটা অগ্রসর হয়নি, সে দিনগুলোতে মানুষের মধ্যকার সামাজিকতার বন্ধন যে বেশ ভালো ছিল তা বলাই বাহুল্য। আর এর প্রমাণ মিলতো উৎসবের দিনগুলোতে সবার আড্ডা, গল্প আর দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে। ঈদুল আজহায় ঈদুল ফিতরের তুলনায় এ ধরনের বিনোদন কিছুটা কম হতো যদিও তবু সারাটা বিকেল ভরে থাকতো নানাধরনের উৎসবের আয়োজন। ঋতুভেদে আয়োজন করা হতো ঘুড়ি ওড়ানো, নৌকাবাইচ কিংবা কুস্তি খেলার। যেসব এলাকায় সিনেমা হল ছিল সেসব এলাকার মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে যেতেন সিনেমা দেখতে। এছাড়া বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও উল্লেখযোগ্য ভিড় লেগে থাকতো।

গোটা মুসলিম বিশ্বের মতো বাংলার মুসলিম সমাজে এখনো ঘটা করে উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর কিংবা ইদুল আজহা। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে যায় সময়ের টানে। কেমন করে যেন জীবনযাপন আর উৎসব উদযাপনের রীতিতে চলে আসে ভিন্নতা। তখন ভেতরে বসে যেন কেউ গেয়ে ওঠে-
“দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না
সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি।”

- আহমাদ সাঈদ