বুধবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / সাবধান! এ-এক বুমেরাংয়ের জগৎ
০৮/১৬/২০১৮

সাবধান! এ-এক বুমেরাংয়ের জগৎ

-

বাংলাদেশ হলো সব সম্ভবের দেশ। অপার সম্ভাবনার দেশ; অপার সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরারও দেশ। বিমানবন্দর সড়কে গত ২৯ জুলাই বাসচাপায় যখন দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়, তখন কোমলমতি স্কুল-শিক্ষার্থী গর্জে ওঠে দেশব্যাপী। এ-যেন ‘এনাফ ইজ এনাফ’। অনেক হয়েছে, এবার থামাও তোমাদের পাগলা রাক্ষসকে।

প্রতিদিন গড়ে ১২জনের লাশ না পেলে সড়ক-রাক্ষসের ক্ষুধা মেটে না। বছরে পাঁচ হাজার লাশ, বিশ হাজার আহতের ভেতর দিয়ে আমাদের জিডিপি’র দুই শতাংশ খেয়ে ফেলে এই রাক্ষস! এদেশে গাড়ির চালকরা কেবল গরু-ছাগল চিনলেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরার লাইসেন্স পেতে পারেন। যারা ড্রাইভারের লাইসেন্স দেন, সেই সংস্থা অর্থাৎ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির কার্যালয়ে গিয়ে যে-কেউ ঘুষ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করে আনতে পারেন। আমাদের সড়কে তো আসলে দুর্ঘটনা হয় না, হত্যা হয়। আমরা দেখেছি, বেশি লাভের আশায় পাবলিক বাসগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।
প্রচণ্ড গতিতে প্রতিযোগী বাসকে অতিক্রম করে, প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু সবকিছুরই একটি সীমা থাকে। নিয়ম না মানাটাই যখন ‘নিয়ম’ হয়ে ওঠে, তখন নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার ফুলকি পঙ্ক্তি রাতারাতি যেন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে- ‘একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে/সারাশহর উথালপাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।’ সুতরাং গত ২৯ জুলাই রাজিব ও দিয়া নিহত হওয়ার পর স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসে শৃঙ্খলা ফেরাতে, অনিয়মের রাক্ষসটিকে দমন করতে। অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন করল তারা। সঠিক দায়িত্ব জ্ঞানসম্পন্ন ট্রাফিকের মতো ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করল, সিরিয়ালে গাড়ি চলতে বাধ্য করল, যাদের লাইসেন্স নেই বিনয়ের সঙ্গে তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। সারাদেশে প্রায় চার কোটি স্কুল শিক্ষার্থী! কোমলমতিদের এমন বিস্ময় ম্যাজিকে চমকে গেল সারাদেশ। ধন্য ধন্য করল সারাবিশ্ব।

কিন্তু ঘটনার ক্লাইমেক্স তখনো বাকি। এমন দারুণ আন্দোলন, এমন অভাবিত জনস্রোত- সেই স্রোত একটু ঘোলা করতে পারলেই তো কেল্লা ফতে। এমন সাজানো মঞ্চ থেকে সুবিধা নেওয়ার দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন ষড়যন্ত্রকারীরা? সুতরাং আমরা দেখতে পেলাম, চারজন নিহত, চারজন র‌্যাপ্ট হওয়ার গুজব, প্রচুর ভিডিও ফুটেজ, প্রচুর আলোকচিত্র, প্রচুর ফটোশপ-সত্যমিথ্যার জগাখিচুড়ি পাকিয়ে একটি পক্ষ রাতারাতি প্রপাগান্ডার স্রোতের তোড়ে ভাসাতে চাইল সরকারকে।

তারপর? রবি ঠাকুরের একটি কবিতা ঘুরছিল এই আন্দোলনে-‘যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,/যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে/ পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে;/ যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে।’ প্রশ্ন হলো-কে কার ভয়ে ভীত? কে বেশি ভীরু? এ-এক বুমেরাংয়ের জগৎ! এ-এক ভাইস-ভার্সার জগৎ! সকল পক্ষই বসে আছে স্পর্শকাতর কাচের ঘরে।

রাষ্ট্রের ঈষাণ কোণে আগুনের আভাস-সামনে নির্বাচন। আমরা যেন ভুলে না যাই, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে এই দেশ। আমরা যেন পাকিস্তানি শাসকদের মতো মনে না করি, এ-দেশের মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, রক্তের কোনো দাম নেই।

ত্যাগের এক মহতী বার্তা নিয়ে কোরবানি ঈদ তথা ঈদ-উল-আজহা। আমরা যেন সেই বার্তা ধারণ করতে পারি আমাদের অন্তরে। প্রত্যেকের জীবনই এক-একটি অমূল্য সম্পদ। আমরা কেউই যেন সেই অমূল্য সম্পদের কোনো ক্ষতিসাধন না করি। সবাই সুস্থ-সুন্দর থাকুন, সতর্ক থাকুন। ঈদ মোবারক।

- তাসমিমা হোসেন