শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / মা হওয়া কি মুখের কথা?
০৮/০২/২০১৮

মা হওয়া কি মুখের কথা?

-

‘মা’ এমন একটি নাম, যার মতো মধুর শব্দ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। সমস্ত জীবজগৎ টিকে আছে মায়ের গর্ভের ভেতর দিয়েই। প্রকৃতিতে অন্যপ্রাণীর বেলায় যা-ই হোক না কেন, মানুষের ক্ষেত্রে একটি মেয়েকে ‘মা’ হওয়ার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ‘পরিণত’ হয়ে উঠতে হয় সবার আগে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের দেশে প্রায় পৌণে দুই কোটি কিশোরীর বিয়ে হয় আঠারো বছর বয়স পার হওয়ার আগেই। কিন্তু কেন? আমাদের দেশের গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থা এখনো এমন যে, একটি কিশোরী মেয়ের ওপর দৃষ্টি পড়ে সবার। সেই মেয়েটিকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার অপর নাম হয়ে ওঠে ‘বিয়ে দিয়ে দেওয়া’! দেশে বাল্যবিয়ে দেওয়া বেআইনি হলেও আমাদের সমাজ এটাকে বেআইনি মনে করে না। এটাই বাস্তবতা।

বিয়ে হলো নর-নারীর জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়টি তখনই মহিমান্বিত হয়, যখন দুজন নর-নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে ‘পরিণত’ অবস্থায় একে-অন্যের পূর্ণসম্মতিতে শুভবন্ধনে আবদ্ধ হন। একজন নারীর সন্তান ধারণের ‘গোল্ডেন এজ’ হলো ২৩ থেকে ২৮ বছর। সন্তান লালনপালনে একজন ‘পরিণত মানসিকতার’ মায়ের পাশাপাশি একজন ‘পরিণত’ বাবারও প্রয়োজন। স্ত্রীর প্রেগন্যান্সি-র সময় স্বামীকে সর্বান্তঃকরণে সাপোর্টিভ হতে হয়। সেটাই পরিণত ও শিক্ষিত স্বামীর বৈশিষ্ট্য। ভালো প্যারেন্টিং ছাড়া একটি সন্তানের প্রতিভার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটে না। একই ভাবে একটি মেয়ে পুতুল খেলার বয়স পার হওয়ার আগেই যখন বিয়ের শিকার হয়, বছর গড়াতেই গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তখন আসলে একটি শিশু-মায়ের ঘাড়ে চেপে বসে আরেকটি শিশুকে লালনপালনের অসম্ভব গুরুদায়িত্ব। এভাবে একটি কিশোরী মেয়ে এমন একটি জগতে চিরকালের জন্য আটকে পড়ে, যেখান থেকে তার আর মুক্তি মেলে না কখনো। অথচ সেই কিশোরীটি হয়তো লেখাপড়ার মাধ্যমে তার স্বীয় প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারত, চমকে দিতে পারত সমাজ বা রাষ্ট্রকে। মনে রাখতে হবে, কিশোরী মায়েরা রক্তস্বল্পতায় ভোগে সবচাইতে বেশি, সে কারণে তার গর্ভের সন্তানও পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। কম ওজন আর কম উচ্চতা নিয়ে যে শিশুর জন্ম হয়, তার কিশোরী-মা নিজেই ভগ্নস্বাস্থ্য হওয়ার কারণে শিশুটি জন্মের পর পর্যাপ্ত বুকের দুধও পায় না। এভাবে বাল্যবিবাহের মাধ্যমে আমাদের সমাজে তৈরি হয়ে চলেছে ভগ্নস্বাস্থ্যের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী।

প্রেগন্যান্সির বিবিধ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এবারের অনন্যায়। আইন নিয়ে আমাদের মনে রয়েছে অনেক ধোঁয়াশা, অনেক প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা। পাঠকের সেসব প্রশ্ন নিয়ে ‘আইনি জিজ্ঞাসা’ নামে নতুন একটি বিভাগ চালু করা হলো এই সংখ্যা থেকে।

পিছিয়েপড়া সমাজ হলো হীরক রাজার মতো, যার মতে- ‘এরা (পড়ুন ‘নারীরা’) যতবেশি পড়ে, ততবেশি জানে, ততকম মানে।’ তাই পিছিয়ে পড়া সমাজ ভয় পায় নারীর শিক্ষিত হয়ে ওঠাকে, নারীর নেতৃত্বকে, ক্ষমতায়নকে। পাঠক ভালো থাকুন, সুস্থ-সুন্দর থাকুন, আর মনে রাখুন নেপোলিয়ানের সেই বিখ্যাত উক্তি- ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’

- তাসমিমা হোসেন