রবিবার,১৯ অগাস্ট ২০১৮
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / দুশ্চিন্তা আর বিষণ্ণতা এক নয়
০৭/৩০/২০১৮

দুশ্চিন্তা আর বিষণ্ণতা এক নয়

-

মানসিক স্বাস্থ্য বেশ জটিল এক ব্যাপার। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন রকম মানসিক সমস্যা চিহ্নিত করার উপায় এবং প্রতিকার বের করেছেন বটে; কিন্তু এসব সমস্যার একটা অন্যটাকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে, যা আপনাকে দুটো ভিন্ন সমস্যা আলাদা করার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ফেলে দিতে পারে। দুশ্চিন্তা আর বিষণ্ণতা এমনই দুটো সমস্যা। এদের বৈশিষ্ট্যগত অনেক সাদৃশ্য আছে। যার ফলে উদ্ভূত সমস্যার সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিষণ্ণতা না দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তা বের করতে না পারলে এ থেকে উত্তরণের উপায়ও বের করাও বেশ মুশকিল হয়ে যায়।

বিষণ্ণতা আর দুশ্চিন্তার মধ্যকার সম্পর্কের জটিলতা
আপনার সমস্যার কথা বললেই যদি কোনো যন্ত্র বলে দিতে পারতো যে ‘আপনি দুশ্চিন্তায় ভুগছেন’ বা ‘আপনি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত’ তবে বেশ হতো। যেহেতু নেই সেহেতু দুটোকে আলাদা করে দেখা খুব সহজ কাজও নয়। একজন মানুষের খুব সহজেই দুশ্চিন্তা আর বিষণ্ণতা দুটোই থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ দিনের পর দিন দুশ্চিন্তায় ভুগে শেষমেশ সেটাকে বিষণ্ণতায় রূপ দিয়ে বসেছেন। তবে, যেহেতু সমস্যা দুটোর কারণ, সমস্যার ধরন এবং বৈশিষ্ট্যে দারুণ সাদৃশ্য বিদ্যমান, সেহেতু দুটোকে আলাদা আলাদা করা বেশ দুরূহ।

দুটো সমস্যার মাঝে পার্থক্য
দুশ্চিন্তা এবং বিষণ্ণতাকে বুঝতে এদের মধ্যকার বিদ্যমান পার্থক্যগুলোকে আগে জেনে নিতে হবে। দুটো সমস্যায় আক্রান্তদের মানসিক অবস্থা ভিন্নরকম থাকে। যেমন ধরুন, দুশ্চিন্তায় ভোগা মানুষজন ভবিষ্যতে কী হবে এবং কী হতে পারত তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। খারাপ কিছু ঘটতে পারে এমন কিছু দুশ্চিন্তাও ঘুরতে থাকে তাদের মাথায়। আর এ সমস্যায় আক্রান্তরা বেশিরভাগ সময়ই সব সমস্যার সমাধান মনে করে পালিয়ে যাওয়াকে। পক্ষান্তরে বিষণ্ণতার সমস্যায় আক্রান্তরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশান্বিত হয় না কখনোই। যা তাদের ক্রমে দুঃখী করে তোলে। ভবিষ্যতে ভালো কিছু হতে পারে এটা তারা বিশ্বাসই করে না। তারা মৃত্যুকেই চূড়ান্ত সমাধান বলে মনে করে, যার ফলে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় তাদের মাঝে।

দুশ্চিন্তার পরিণাম হিসেবে আসতে পারে বিষণ্ণতা। কারণ অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তায় ভুগতে ভুগতেই একসময় মানুষ আশাহীন হয়ে পড়ে। আবার, একেবারে আশাহীন হওয়া সত্ত্বেও যারা বিষণ্ণ তারা কখনো কখনো ভবিষ্যতে খারাপ কিছু হবার ভয়ে ভীত হতে পারে। আর একারণেই দুটোকে আলাদা করা বেশ কঠিন কাজ।

সমস্যা দুটোর মধ্যে বেশ কিছু শারীরিক পার্থক্যও বিদ্যমান। দুশ্চিন্তাগ্রস্তরা বেশিরভাগ সময়েই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে, সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তার কারণে হৃদরোগ আক্রমণ করে। হার্ট রেট বেশি হওয়া, অন্ত্রের সমস্যা, দ্রুত শ্বাস নেয়া দুশ্চিন্তার অন্যতম লক্ষণ। অন্যদিকে, বিষণ্ণদের শক্তিহীনতা, অনিদ্রা এসব সমস্যা থাকে। সাধারণত বিষণ্ণতার শারীরিক উপসর্গ খুব কম থাকে; কিন্তু এর মানসিক উপসর্গগুলো (বিশেষত এর আত্মহত্যার চিন্তাভাবনাগুলো) একাই বেশ ক্ষতিকর হয়ে থাকে।

বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তার মধ্যকার সাদৃশ্য
সমস্যা দুটোর মধ্যে এত মিল থাকার কারণ হচ্ছে দুটো ব্যাপারই নিউরোট্রান্সমিটার ফাংশনে বিশেষত সেরোটোনিনে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। লো সেরোটোনিন লেভেল বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তা দুটো ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেরোটোনিনের মতো না হলেও ডোপামিন এবং এপিনেফ্রিনও দুটো ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

যেহেতু এদের নিউরোট্রান্সমিটার ফাংশনে মিল আছে, এদের উপসর্গগুলোও তাই প্রায়শই মিলে যায়। শুধু তাই নয়, এরা একে অপরকে পরিপক্ক হতে সহায়তাও করে। সাধারণত আমরা দুশ্চিন্তাকেই বিষণ্ণতায় রূপ নিতে দেখি। অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তার সাথে যদি যোগ হয় এর মোকাবিলায় দুর্বল কোনো পদক্ষেপ, তখনি কেবল তা বিষণ্ণতায় রূপ নেয়। আর যদি সাথে যোগ হয় অবহেলা, তাহলে তো কোনো কথাই নেই, বিষণ্ণতা তখন আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

তবে...
ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে দুটো সমস্যাই সমাধানযোগ্য। গবেষণার মাধ্যমে এটা জানা গেছে যে দুটো সমস্যার উপরই আপনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, চাইলে পুরোপুরি নিস্তার লাভও করতে পারেন। এ ব্যাপারটা পুরোপুরি আপনার ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করছে। দীর্ঘমেয়াদী সুস্থ এক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আপনাকে নিজের কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকতে পারে। যত আশাহতই মনে হোক না কেন নিজেকে, এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রকৃত, কার্যকর উপায় আছে। তবে শুরুর কিছুদিন একটু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

- সাজ্জাদ
ছবিঃ নীল ভৌমিক