রবিবার,১৯ অগাস্ট ২০১৮
হোম / ফিচার / ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ ও বিকলাঙ্গ সমাজব্যবস্থা
০৭/৩০/২০১৮

‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ ও বিকলাঙ্গ সমাজব্যবস্থা

-

ধর্ষণ মানবসৃষ্ট অপরাধগুলোর মধ্যে জঘন্যতম একটি। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই জঘন্যতম অপরাধের শিকার একজন নারীর প্রতি আমাদের সমাজব্যবস্থা কতটুকু সদয় এ নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আর এই সন্দেহের পালে বহু বছর ধরে হাওয়া লাগিয়েছে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নামের অতি অমানবিক এক রীতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি দৈন্য সমাজব্যবস্থার অবজ্ঞার চাক্ষুষ উদাহরণ এই টু ফিঙ্গার টেস্ট বা দুই আঙুল পরীক্ষা, যা সম্প্রতি হাইকোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

টু ফিঙ্গার টেস্ট কী?
ধর্ষণের শিকার একজন নারীর যোনীতে দুই আঙুল প্রবেশ করিয়ে তিনি আসলেই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন কিনা তা পরীক্ষা করার এই অমানবিক এবং একই সাথে ভিত্তিহীন পরীক্ষার নাম টু ফিঙ্গার টেস্ট। প্রচলিত পন্থা অনুসারে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এই পরীক্ষা করা হয়। বছরের পর বছর ধরে ভিক্টিম আসলেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে রীতিমতো অবাক করার মতো সত্য হলো যে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই নামে কোনো পরীক্ষাই নেই! রেপ ভিক্টিমের শারীরিক পরীক্ষার জন্য এমন চিকিৎসা ব্যবস্থা কোনো ধরনের স্বীকৃত কোনো পদ্ধতিই নয়। এই পদ্ধতি যতটা অমানবিক ঠিক ততটাই ভুলও বটে। এমন টেস্ট দিয়ে প্রায় সময় উপসংহার পাওয়া সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন দেশের নামকরা ফরেনসিক এক্সপার্টগণ।

ধর্ষিত হওয়া যখন অপরাধ
বাংলাদেশের মতো অতিমাত্রায় পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থায় নারীর স্বাধীন জীবন অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এর ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায় এই ভিত্তিহীন টু ফিঙ্গার টেস্টের মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে নারীর গোপন অঙ্গে দুই আঙুল প্রবেশ করিয়ে যাছাই করা হয় তিনি সেক্সুয়াল রিলেশনশিপে অভ্যস্ত নাকি অর্থাৎ এর আগে কারো সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন কিনা। এ ধরনের উদ্ভট পরীক্ষার কারণে ধর্ষণের পরও অমানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেছেন প্রত্যেক ভিক্টিম। এছাড়া এই টেস্টের বিবাহবহির্ভূত সেক্সুয়াল একটিভ একজন নারীর বিচার চাওয়ার পথই এতদিন বন্ধ ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না আমাদের দেশে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো নারীর জন্য মহা এক অপরাধ, একেবারে গর্হিত একটি পাপ। তবে সেক্সুয়ালি বেশ একটিভ এই দেশের পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘সব দোষ মাফ’-এর আরও একটি উদাহরণ এটি। তাই এতদিন ধরে চলে আসা দুই আঙুল পরীক্ষা পরোক্ষভাবে সমাজের ঘৃণ্যতম পাপ কাজে লিপ্ত রেপিস্টদের প্রশ্রয় দিয়েছে, অবচেতন মনে হলেও তারা এটা ভেবেছে যে, এ-ধরনের হাজারো পরীক্ষা ও জবাবদিহির যাঁতাকলে পড়ে একজন নারী পিছু হটতে বাধ্য হবে।

এই অমানবিক পদ্ধতি এতদিন ধরে চলে এসেছে। নারীকে বারবার বলেছে শুধুমাত্র ধর্ষণই তোমার একমাত্র যন্ত্রণা না, বরং এ তো মাত্র শুরু! এই টেস্টের মাধ্যমে ধর্ষণ সমপরিমাণ কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে এ দেশের অসংখ্য নারীকে। দিনশেষে বারবার তাদের কাছে এটাই মনে হয়েছে যে ধর্ষণের শিকার হওয়াটাই অপরাধ এ দেশে, তারা প্রত্যেকে অপরাধী।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও হাইকোর্টের নির্দেশ
নারীর জন্য অবমাননাকর এই পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পথটা মসৃণ ছিল না। এর জন্য অনেকদিন ধরে নিরলস সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং অবশেষে মিলেছে পরম আকাঙ্খিত রায়। সর্বপ্রথম দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষা পদ্ধতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট- ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষসহ দুই চিকিৎসক একটি রিট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তথাকথিত ‘দুই আঙুলি পরীক্ষা’ কেন আইনবহির্ভূত এবং অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। একই সাথে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা তৈরি করা হয়। তারও চার বছর পর সব তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি বিশ্লেষণ করে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল টু ফিঙ্গার টেস্ট পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছে হাইকোর্ট। এর পাশাপাশি ধর্ষণের ক্ষেত্রে ‘পিভি টেস্ট’ নামে পরিচিত আঙুলের সাহায্যে বায়ো ম্যানুয়াল টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করেছেন আদালত।

দুই আঙুল পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এখন থেকে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে সরকার ঘোষিত গাইডলাইন (প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে, ধর্ষণের শিকার নারীর শারীরিক পরীক্ষা একজন নারী চিকিৎসক বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে করাতে হবে এবং এই সময়টায় একজন গাইনোকোলজিস্ট, একজন নারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, নারী পুলিশ সদস্য এবং নার্স রাখতে হবে। একই সাথে এটাও বলা হয়েছে যে পরীক্ষার রিপোর্টে অভ্যাসগত যৌনতা বলে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এই রায়ে ধর্ষিত নারীর গোপনীয়তা রক্ষা করার উপরও জোর দেয়া হয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে, দুই আঙুল পরীক্ষার মতো অবমাননাকর ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি বন্ধে হাইকোর্টের রায় নারীর জন্য সাময়িক মুক্তির সনদ নিয়ে এসেছে। তবে রায়ে বর্ণিত নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশে যথেষ্ট পরিমাণ নারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও গাইনোকোলজিস্ট নেই বললেই চলে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির উপর দৃষ্টিপাত ও দ্রুত সমাধানের বিকল্প নেই। আর তা করা হলে তবেই এমন অমানবিক পদ্ধতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হবে দেশের ধর্ষিত নারীরা।

- নাইব