শনিবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / ‘সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’-কে বলুন ‘না’
০৭/১৭/২০১৮

‘সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’-কে বলুন ‘না’

-

আজ তিন্নি আপুর গায়ে হলুদ। বাসায়ই অনুষ্ঠান। বাবা-মা’র সাথে রুহিও এসেছে গায়ে হলুদে। অনেক আত্মীয়স্বজনই এসেছে এপক্ষের-ওপক্ষের। মা রুহিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা রুহি’র একদমই ভাল্লাগছে না। ও চাইছে একদম কোণার দিকের রুমটার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে। আচ্ছা, একটু আগে যে এক আন্টি তার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা হাসি দিল সেটা কি তার নতুন জামাটার জন্য। ক’দিন আগেই জন্মদিনে মা এই জামাটা কিনে দিয়েছিলেন। আজকেই প্রথম পরল। রুহির টেনশন আরও গাঢ় হয়। জামাটায় মনে হয় তাকে একটুও মানায়নি।

ওপরের গল্পের রুহির মতো আপনারও এমন মনে হয়? অচেনা পরিবেশে যেতে, বেশী লোক জনের সাথে মিশতে অনিচ্ছা, ভয় অথবা টেনশন হয়? তাই যদি হয় তবে আপনি 'Social Awkwardness' দ্বারা আক্রান্ত। আর এর প্রকোপ যদি হয় অনেক বেশী এবং ইনটেন্স তাহলে আপনার সমস্যাটির নাম 'Social Anxiety'।

‘সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’ কি?
সবকিছুতেই ‘অন্যরা আমাকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু ভাবছে’ এমন মনোভাবকে মনস্তত্ববিদেরা নাম দিয়েছেন ‘সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’। পরিভাষাটির সোজা বাংলা দাঁড়ায় ‘সামাজিক দুশ্চিন্তা’।

সমস্যার পেছনের কারণ
মনোবিজ্ঞানীগণ সম্প্রতি ‘সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’র পেছনের কারণগুলো খোঁজার চেষ্টা করেছেন। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত প্রধান কারণগুলো হলোঃ

- সামাজিকীকরণে পরিবারের ভূমিকা কম থাকা।
- পরিবার থেকে কোনো ব্যাপারে অতিরিক্ত চাপ।
- ছোটবেলায় কোনো বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া।
- কোন কারণে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হওয়া।
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার।
- অন্তর্মুখিতা।
- অভিবাসন।

সোশ্যাল এ্যাংজাইটি’র লক্ষণঃ
এ-সমস্যার লক্ষণ সাধারণত তিন পর্যায়ে দেখা যায়। আবেগের ক্ষেত্রে, আচরণের ক্ষেত্রে এবং শারীরিক ক্ষেত্রে।

আবেগগত লক্ষণঃ অতিমাত্রায় আত্মসচেতনতা এবং নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে সর্বক্ষণ চিন্তা।

আচরণগত লক্ষণঃ সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বর্জন, নিরিবিলি হয়ে যাওয়া, কাছের কোনো বন্ধুকে সামাজিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে ঢাল বানানো এবং মাদকাসক্তি।

দৈহিক লক্ষণঃ হাত পায়ের তালু ঘামা, উচ্চমাত্রায় হৃৎকম্পন, শরীর ঘামা এবং শরীর কাঁপা।

সোশ্যাল এ্যাংজাইটি থেকে মুক্তি পেতে
আপনি যদি নিজের মধ্যে উপরোক্ত লক্ষণগুলো দেখতে পান তাহলে মোটেও আরো বেশি গর্তে ঠেলে দেবেন না নিজেকে। বরং যা করবেন তা হলোঃ

সমস্যাটি স্বীকার করে নিন
অনেকেই আছেন নিজের ভেতরে থাকা সমস্যার কথা স্বীকার করতে চান না। নিজের কাছেই তারা স্বীকারোক্তি দেন না। এটি কিন্তু করা যাবে না। প্রথমেই নিজের ভেতরের সমস্যাটি স্বীকার করে নিন। তাতে সমাধান খোঁজার পথ সুগম হবে। সাথে এটাও ভাবুন যে, এধরনের সমস্যাতে শুধু আপনি একাই পড়ে নেই। এমন আরো অনেকেই আছেন।

চিন্তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন
আপনার চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করুন। চিন্তা যদি নেতিবাচক দিকে ধাবিত হতে শুরু করে তবে বুঝতে পারামাত্র রাশ টেনে ধরুন। ধরুন, আজকে আপনার একটি ইন্টারভিউ আছে। আপনার অবচেতন মনে কাজ করছে আজকের ইন্টারভিউ খুব বাজে হবে। এখন আপনার যদি চিন্তার ব্যাপারে সতর্কতা থাকে তবে সেখানেই চিন্তাটা থামিয়ে দিন। নিজেকে ভাবতে বাধ্য করুন যে, ‘আমি ভালো কিছু আশা করছি। কিন্তু ফলাফল কি হবে জানি না। খারাপ কিছু হলেও মেনে নেয়ার চেষ্টা করব।’

শুরুটা আপনিই করুন
কারো সাথে কথা বলতে সংকোচ? আলাপটা একবার শুরু করেই দেখুন না! পরিচিত মানুষদের সাথেই সামাজিকতার প্রথম পাঠ নিন। যার সাথে কথা বলছেন তার পছন্দের বিষয় নিয়ে শুরু করুন। দেখবেন সংকোচ আর দ্বিধার মেঘ ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। অপরিচিত কেউ হলে তার সাথে আলাপ শুরু করুন সাধারণ কোনো চলতি বিষয়বস্তু নিয়ে। অবশ্যই ব্যক্তিগত বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করবেন না।

মোকাবেলা করুন আপনার ভয়কে
আপনি ভয়কে ভয় পেলে সেটি আরো চেপে ধরবে। সুতরাং চেষ্টা করুন ভয়কে হারিয়ে দিতে।
মানুষ আপনাকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করে এমন ভাবনাকে টক্কর দিয়ে হারিয়ে দিন।
প্রেজেন্টেশনে ভয়? একা একা অথবা বন্ধুদের আড্ডায় তবে হয়ে যাক নিজের ভয়কে হারানোর প্রতিযোগিতা। আড্ডায়ই প্রেজেন্টেশন প্র্যাকটিস করে ফেলুন খানিকটা।
শিখতে চেষ্টা করুন ‘এক্সট্রোভার্ট’ বা বহির্মুখীদের কাছ থেকে। তারা কিভাবে মানুষের সাথে মেশে দেখুন। সামাজিকতায় দক্ষ বন্ধুদের সাথে সময় কাটান বেশি।

দম নিন
মনে হচ্ছে পারবেন না? দাঁড়ান। চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস টানুন যতটা সম্ভব। ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। কি? এখনো কি মনে হচ্ছে পারবেন না? দিনের নির্দিষ্ট সময়ে শরীরকে বিশ্রাম দিন। যোগব্যায়াম দু একটা আসন শিখে নিয়ে নিয়মিত চর্চা করুন। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। সঞ্চিত হবে সাহস এবং মানসিক শক্তি।

পরামর্শ নিন
এসব কিছু করার সাধ্যে না কুলোলেও সমস্যা নেই। বিশেষজ্ঞ কারো সাহায্য নিন। মনস্তাত্বিকগণ আছেন। তাদের কাছে গিয়ে খুলে বলুন আপনার সমস্যা। তারা হয়তো আপনার সমস্যাটা আরো ভালোভাবে বুঝবেন। সাহায্যও করতে পারবেন আরো ভালোভাবে।

- আহমাদ সাঈদ
ছবিঃ এইচ এম আকিব