রবিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / ফুটবল দর্শন, ফুটবলের দর্শন
০৭/০২/২০১৮

ফুটবল দর্শন, ফুটবলের দর্শন

-

চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বরে আমরা কাঁপতে থাকি। কোথায় আর্জেন্টিনা, কোথায় ব্রাজিল বা নাইজেরিয়া আর মিশর-সেটা আমরা নাও জানতে পারি। কিন্তু মেসি, নেইমার, সালাহদের নিয়ে আমাদের মাতামাতির সীমা থাকে না। ক্যামেরুন নামের আফ্রিকার কোনো এক অখ্যাত দেশ একবার আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে রাতারাতি বিশ্বখ্যাত হয়ে গিয়েছিল।

বিশ্বের প্রায় তিনশ’ কোটি মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন, প্রিয় দলের জয়ে খুশিতে ভাসেন, পরাজয়ে ডোবেন অশ্রুজলে। দর্শক বা সমর্থক হিসেবে বাংলাদেশের মানুষও বিশ্বকাপ ফুটবলের ব্যাপারে অত্যন্ত ক্রেজি। কিন্তু মাত্র তিন লাখ জনসংখ্যার দেশ আইসল্যান্ড বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও ১৬ কোটির দেশ হিসেবে আমরা পড়ে আছি আলোকবর্ষ দূরত্বে। ফিফার ফুটবল র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৯৯৩ সালে আমাদের অবস্থান ছিল ১১৬, আর বর্তমানে ১৯৪। আইসল্যান্ড বুঝিয়ে দেয় ভালো ফুটবল টিম তৈরি করতে তিন লাখ জনসংখ্যাও খুব কম নয়। ফুটবল খেলা দেখার জন্য একসময় বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের হাটেবাজারেও ঢোল বাজিয়ে প্রচার চালানো হতো। সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু ২০১১ সালে যখন দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের জন্য বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ চালু হলো তখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও উঠে আসতে শুরু করল বিরল সব প্রতিভা। এমন একজন প্রতিভাধর কিশোরী কলসিন্দুরের মারিয়া মান্ডাকে আমরা এবার অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কারে ভূষিত করি। সম্প্রতি হংকংয়ে অনুষ্ঠিত চার জাতি জকি গার্লস ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ কাপে বাংলাদেশের এই অনূর্ধ্ব ১৫ নারী ফুটবল দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। এই নারী ফুটবল দলটিই চ্যাম্পিয়ন হয় ২০১৫ ও ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসেও। আমাদের নারীরা যে সুযোগ পেলে অভাবিত সব বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেন, তার উদাহরণের শেষ নেই। বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রীড়াতে নারীরা ন্যূনতম সুযোগসুবিধা না পেয়েও অসম্ভব সব বিজয় ছিনিয়ে আনছে। গত ১০ জুন ক্রিকেটে এশিয়া কাপ জিতেছে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ফুটবলে শারীরিক শক্তির বিশেষ ভূমিকা আছে। যে কারণে কৃষ্ণাঙ্গ-সমৃদ্ধ আফ্রিকার ফুটবল দল বিশ্বকাপে প্রতিবারই কোনো না কোনো চমক দেখায়। তবে ফুটবল এখন অনেক জটিল হিসেব-নিকেশের খেলা। খেলোয়াড়দের মধ্যে সঠিক সমন্বয়, বলের গতি ও যাত্রাপথ সম্পর্কে আগাম ধারণা, বলের নির্দিষ্ট কোণে পায়ের সঠিক শট মেরে কোনাকুনিভাবে বল পাঠানো-এসবের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা। ফুটবলের একটি গভীর দার্শনিক দিকও আছে। দলভুক্ত এগারোজনেরই আন্তরিকতা ও কৌশলগত প্রচেষ্টার ভেতরেই জয় আসে ফুটবলে। অর্থাৎ মানুষকে এককভাবে চলার চেয়ে দলগত সুশৃঙ্খলভাবে চলার ‘শিক্ষা’ দেয় ফুটবল খেলা। ফুটবলের এই ‘টিম স্পিরিট’ যদি আমাদের জাতীয় জীবনেও কাজে লাগানো যায়, আমরা নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি উন্নতির সোপানে পা রাখব।

ফুটবলের শৃঙ্খলা আর একতার শিক্ষা ছুঁয়ে যাক আমাদের মানস-জগতে।

সবাই সুস্থ ও সুন্দর থাকুন।

- তাসমিমা হোসেন