মঙ্গলবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / দেবযানীর উড়োজাহাজ
০৫/২০/২০১৮

দেবযানীর উড়োজাহাজ

বাংলাদেশের দেবযানী জার্মানিতে গড়ছেন পরিবেশবান্ধব বিমান

-

"স্বামী যখন কল্পনার সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন এবং সূর্যমন্ডলের ঘনফল তুলাদন্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাল-ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন।" - নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে গত শতকে বলে যাওয়া বেগম রোকেয়ার কথাগুলো এখনো অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবতা। যদিও রন্ধন কুশলতাকে এখন মোটেই মামুলি বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। তবে রন্ধনশালার দায়িত্ব সামলে নিয়ে এর পাশাপাশি ধূমকেতুর গতি নির্ণয়ের মতো বিষয়ে আজকালের নারীরাও কম যান না।

এই লেখার বিষয় রোকেয়া নয়, দেবযানী নামের অন্য এক নারী। চট্রগ্রামের মেয়ে দেবযানী ঘোষ দেশের গন্ডি পেরিয়ে নাম করেছেন সুদূর জার্মান দেশে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানি ও এদেশের পত্রিকায় তাঁর নাম বারবার এসেছে পৃথিবীর প্রথম কার্বন নিঃসরণমুক্ত বিমান তৈরি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে। ‘এইচওয়াই ফোর’ নামের কার্বন নিঃসরণমুক্ত চার আসনের এ উড়োজাহাজ জার্মানির স্টুটগার্ট বিমানবন্দরে প্রথম উড়ে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। কার্বন নিঃসরণমুক্ত, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক কম শব্দ দূষণকারী এই বিমান বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল জার্মানির উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট মহলে। সেই থেকে শুরু। তারপর আস্তে আস্তে আরো উন্নত করে গেছেন ‘এইচওয়াই ফোর’কে। এইচওয়াই-৪-এর উড়াল দেখতে জার্মানির গণমাধ্যম, বিজ্ঞানী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্রান্সপোর্ট কমিশনার, গবেষণা অংশীদারেরা উপস্থিত ছিলেন বিমানবন্দরে। এই বিমান প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বে আছে জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার (ডিএলআর)। প্রধান গবেষণা অংশীদার ইউনিভার্সিটি অব উল্ম। ইউনিভার্সিটি অব উল্মের গবেষণা দলে পিএইচডি গবেষক হিসেবে কাজ করছেন চট্টগ্রামের মেয়ে দেবযানী ঘোষ। দল নেতা ড. জোসেফ কাল্লোসহ এ দলে সদস্যসংখ্যা তিন।

যেভাবে শুরু
দেবযানী স্নাতক করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে স্নাতক হওয়ার পর দেবযানী কিছুদিন শিক্ষকতা করেন চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে। এরপর চলে যান জার্মানি। শুরু থেকেই দেবযানীর ইচ্ছা ছিল পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে কাজ করার। আরডাব্লিউটিএইচ আখেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে যখন গবেষণার বিষয় খুঁজছিলেন দেবযানী, তখন এইচওয়াই-৪-এর ব্যাপারে জানতে পারেন। এখন তাঁর পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবেই কাজ করছেন এই উড়োজাহাজের উন্নতিতে।

দেবযানীর গবেষণার গুরুত্ব
ঠিক এই সময়ে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যখন সবচেয়ে বেশি কথা হয়, তখন আমরা অনেকেই হয়ত জানি না কার্বন নিঃসরণের বড় একটি উৎস হচ্ছে বিমান চলাচল। বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ইতোমধ্যে বাজারে চলে এসেছে। কিন্তু উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতি দেবযানী ও তাঁর দলের হাত ধরেই। সাধারণত উড়োজাহাজে জ্বালানি হিসেবে যেসব গ্যাস এবং জেট ফুয়েল ব্যবহার করা হয় তা থেকে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দিনে দিনে বিমানের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে কার্বন নিঃসরণ। আর এই কার্বন নিঃসরণ কমানোর চিন্তা থেকেই এইচওয়াই-৪ বিমানের ভাবনা শুরু করেন দেবযানী ও তাঁর দল। চেষ্টা ছিল এমন উড়োজাহাজ তৈরি করার, যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে।

এইচওয়াই-৪ হাইব্রিড বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ। জ্বালানি কোষ (ফুয়েল সেল) ও ব্যাটারি এই বিমানের প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। ফুয়েল সেল সরাসরি হাইড্রোজেন এবং বাতাসের অক্সিজেন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে এই বিদ্যুৎ দিয়ে বিমান চলে।

এছাড়া ফুয়েল সেল এবং ব্যাটারির ডিসি বিদ্যুৎকে এসিতে রূপান্তর করার জন্য একটা সম্পূর্ণ নতুন সিলিকন কার্বাইডের পাওয়ার ইলেকট্রনিকস আর্কিটেকচার তৈরি করেছেন দেবযানী। বিমানটি এমনভাবে ডিজাইন করে হয়েছে যার ফলে এর ওজনও হবে হালকা। আর্কিটেকচার তৈরির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রাংশ এবং পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের মধ্যে একটা ইন্টারফেসও তৈরি করেছেন দেবযানী যা এ ধরনের পরিবেশবান্ধব বিমান প্রস্তুতের দ্বার উন্মোচন করেছে।

সিএনএন-এর মতো নামকরা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। মেয়ে বলে দেবযানী কোথাও আটকে থাকেননি। ডিঙিয়ে গেছেন সব বাধা। আর এজন্যেই দেবযানী হয়ে উঠেছেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব, একজন অনন্যা।

- রিয়াদুন্নবী শেখ