মঙ্গলবার,২২ মে ২০১৮
হোম / ফিচার / জয় করুন নিজের পৃথিবী
০৫/০৩/২০১৮

জয় করুন নিজের পৃথিবী

- শারমিন শামস

"How can we judge them of marriage and in America we teen pregnancy from 12-19 years old? At least they are married."

নারী অধিকারবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক নিউজপোর্টালে বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিয়ে একটি নিবন্ধের নিচে এক আমেরিকানের কমেন্ট এটি। হতাশা থেকে মন্তব্যটির জন্ম বলাবাহুল্য। কিংবা অজ্ঞতা, চিন্তার অভাব। যে-বয়সে এদেশে বাল্যবিবাহ হয়, সেই বয়সে বিয়ে কী, সংসার কী, যৌনজীবন কী – এসব সম্পর্কে কোনো ধারণাই থাকে না এদেশের বালিকাবধূদের। আমেরিকায় অবাধ স্বাধীনতা আর মেলামেশার সুযোগ নিয়ে যে টিনএজাররা গর্ভবতী হচ্ছে, তারা নিঃসন্দেহে অল্পবয়সের ভ্রান্তি আর অপরিপক্কতার শিকার। কিন্তু এদেশের বাল্যবিবাহ হওয়া মেয়েদের সাথে হাটে বেঁচে দেওয়া অবোধ পশুর কোনো পার্থক্য নাই। নিতান্ত শিশুবয়সে এসব মেয়েদের বাবা নিজের আর্থিক অসচ্ছলতার দোহাই দিয়ে সন্তানকে বেঁচে দেন বিয়ের বাজারে। শিশুদের হাতপা বাধা। শিশুরা বিক্রি হয়। শিশুরা অত্যাচারিত হয়। বাল্যবিবাহ বাবা-মায়ের করা অপরাধ, যার শাস্তি হওয়া উচিত কঠোর। একটি শিশুকে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের মুখোমুখি করার জন্য এসব বাবা-মায়ের শাস্তিপ্রাপ্য। এ তো গেল, বাল্যবিবাহের কথা। কিন্তু যেসব মেয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পার করে, এমন কি আরো বড় ডিগ্রি নিয়ে বাবা-মা’র বেছে নেওয়া পাত্রকে চোখ বুজে মালা পরায়, এবং বিয়ের পর অপরিচিত সেই স্বামী আর শ্বশুড়বাড়ির নানা অত্যাচার সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে নিয়ত লুকাতে থাকে, নিজের সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে থাকে, স্বামীর চাহিদা মতো যৌতুকের টাকা যোগাতে থাকে। সেই সব ডিগ্রিধারী মেয়েরাও কি আদৌ জানে বিয়ে শব্দের প্রকৃত অর্থ? বিয়ের কথাবার্তা শুরুর থেকে পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে চরম অপমান, লাঞ্ছনা আর মিথ্যাচারের মধ্যদিয়ে নিজেকে প্রবাহিত করতে এতটুকু পিছপা হয় কি তারা? একটি সচ্ছল, সুন্দর পাত্রের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার জন্য কী না করে এদেশের কোটি কোটি মেয়ে! যার শত ভাগের একভাগও যদি তারা নিজেকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য ব্যয় করতো, তবে আজ চিত্রটাই হতো অন্যরকম। এদেশের মেয়েদের মনমানসিকতার তিমির যাত্রার একটা চিত্র ভালো করে পাওয়া যায় পার্লারগুলোতে গেলে, ফিটনেস জিমে গেলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু গ্রুপে গেলে। কালো রং ফর্সা করতে, জিরো ফিগার বানাতে উদগ্রীব এসব মেয়ের নিত্যকার চাহিদা এমন পোশাক এমন মেকআপ এমন অলংকার, যা তাকে প্রেমিকের চোখে, স্বামীর চোখে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে। এরা তাদের শ্যামলা রং নিয়ে বিব্রত, লজ্জিত এবং অপরাধবোধে ভোগে, মুটিয়ে যাওয়া নিয়ে বিষণ্ণ দিন কাটায়। এরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। পাস করে নিজের ক্যারিয়ার তৈরির কথা এদের মাথায় নেই। মাথায় আছে সুদর্শন পয়সাওয়ালা পাত্রের চিন্তা। ফলে নিজেরা জোটাতে না পারলে বাবা-মায়ের হাত ধরে টুপ করে তাতে ঝুলে পড়তে বিন্দুমাত্র সময় নেয় না এরা। পাত্র জোটাতে কড়া মেকআপে ছবি তোলে, পাত্র পক্ষের সামনে ধীর পায়ে হেঁটে যায় এবং কখনো কখনো প্রবাসী পাত্রকে না দেখেই বিনাবাক্য ব্যয়ে বিয়েতে মত দেয়। এই ২০১৫ সালে এ ঘটনাগুলো রূপ কথার মতোই হবার কথা ছিল। হয় নাই। এদেশের নারীর আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে। কিন্তু তা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে। বিয়ে ও সংসার এবং সন্তান প্রশ্নে অধিকাংশ নারী এখনো গত শতাব্দীর হাল ধরে আছে। এখনো তাদের শৈশব পুতুলের রান্নাবাটি খেলার ভিতরে স্বপ্ন গেঁথে রাখে, সংসার আর সন্তানের। যেখানে নিজের অস্তিত্ব, নিজের একান্ত আমিত্ব পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সে নিজেই। কিন্তু জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধোঁয়াশা নিয়ে তৈরি হওয়া এক-একটা স্বপ্ন ধসে পড়ে মুহূর্তেই। আর্থিকভাবে পরনির্ভরশীলতা এবং বাস্তবতাবিবর্জিত জ্ঞান তাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায় কোন অন্ধকারে, যেখানে দামি মেকআপ আর ঝলমলে শাড়ি গয়নার কোনো অস্তিত্ব নাই। আমার শৈশবের বন্ধু দীর্ঘ সাত বছর স্বামীর অমানুষিক অত্যাচার সয়েছে। স্বামীর পরকীয়ার অপমান মেনে নিয়ে ঘর করেছে। আমি যখন তাকে প্রশ্ন করেছি, কেন? তার উত্তর ছিল, তাওতো একটা স্বামী বলে জিনিস আছে। রাতের বেলা বাচ্চার দুধটা, ওষুধটা আনতে আমাকে বাইরে যাওয়া লাগছে না। বাজার করতে হচ্ছে না। আমি হতভম্ব! অবশেষে অত্যাচারের মাত্রা যখন পৌঁছালো বাথরুমে আটকে মারধোর, গলা টিপে ধরা, তখন সে বেরিয়ে এল সেই সম্পর্ক থেকে। এখন দিব্যি আছে। বাজার করছে, রাতের বেলা ওষুধ কিনছে। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। মানুষ অভ্যাসের দাস। নিজেকে নারীত্বের আবরণে পুরে যে উদ্ভট জীবন বেছে নেয় এদেশের মেয়েরা, তাই তাকে ঠেলে দেয় অত্যাচার আর নিপীড়নের দিকে। নারীর মুক্তির পথ খুলবে, যখন নারী চাইবে। তার ওপরে সংঘটিত অপরাধ, অত্যাচার ঘুচবে, যখন সে রুখে দাঁড়াবে। তার আগে কোনোদিন নয়। পথে বেরোলে সববয়সের পুরুষ যখন নারীর দিকে নোংরা দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয়, পাল্টা দৃষ্টি ছুঁড়ে দিন সেই সব পুরুষের দিকে। ওদের চোখে চোখ রাখুন। দেখবেন নিমেষেই মিইয়ে গিয়েছে ওরা। যারা নোংরা হাতে স্পর্শ করলো, ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে চেপে ধরুন সেই হাত। যারা অশোভন ইঙ্গিত করছে, নানাভাবে উত্যক্ত করছে, আইনগত ব্যবস্থা নিন। ভয় পাবেন না। কিচ্ছু হাসিল হবে না এতে। মাথা উঁচু করে পথচলুন। আপনার চলাই বলে দেবে আপনার আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদাবোধের কথা। কাজ হবে এতেই। জেগে উঠুন, প্রতিবাদ করুন। সাহসী হোন। আপনি সেই মানুষ, যে মৃত হয়ে বেঁচে আছে। আপনি তো সেই জন, যার হারানোর কিছু নেই। অতএব রুখে দাঁড়ান। অর্জন আসবে। আসবেই। নিজের পথ নিজের তৈরি করুন। কেউ আপনার হয়ে তা করে দেবে না। নির্যাতনের বিচার চাইতে যাবার আগে নির্যাতন প্রতিহত করুন। নিজেকে মেকআপের আড়ালে ঢেকে পোশাকে সজ্জায় মুড়ে মূল্যবান করতে চাইছেন যারা, তাদের বলি, পাশাপাশি নিজের অন্ন নিজে উপার্জনের চিন্তাটাও করুন। নিজের জীবনজীবিকার পথ খুঁজে নিন। যখনই আর্থিক ভাবে কারো ওপর নির্ভরশীল হতে হয়, বঞ্চনা আর লাঞ্চনার খড়গ নেমে আসে তখনই। বুঝতে শিখুন। এই বিশাল পৃথিবীতে প্রত্যেকটি জীব কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মেছে। নিজের ক্ষমতা, দক্ষতা আর প্রতিভাকে কাজে লাগান। সংসার আর সন্তানের পাশাপাশি যে একান্ত মানুষ, সেই মানুষের জন্ম যেন বৃথা না যায়। এই উপলব্ধি, এই বোধ যেদিন এদেশের প্রতিটা মেয়ের ভিতরে জেগে উঠবে, সেদিন সমাজ থেকে নারীনির্যাতন শব্দটি উঠে যাবে। নারীর সচেতনতা আর প্রতিবাদী রূপ প্রতিষ্ঠা করবে আইনের শাসন আর সামাজিক ন্যায় বিচারও। বাল্যবিবাহ বন্ধে চাই আইনের শাসন, সরকারের কঠোর অবস্থান ও হস্তক্ষেপ। আর কোটি কোটি প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চশিক্ষিত নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধে চাই নারীর সচেতনতা, নারীর অসীম সাহস আর তার নিজের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মানবোধ। নারীই জয় করবে নারীর পৃথিবী। আর কেউ নয়।