বৃহস্পতিবার,১৫ নভেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / আসমা জাহাঙ্গীরঃ অধিকার ও সংগ্রামের এক অকুতোভয় কন্ঠ
০৪/২৬/২০১৮

আসমা জাহাঙ্গীরঃ অধিকার ও সংগ্রামের এক অকুতোভয় কন্ঠ

-

পাকিস্তানের স্বনামধন্য ও অকুতোভয় মানবাধিকারকর্মী-আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর ১১ই ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লাহোরের একটি হাসপাতালে মারা যান।

সারাজীবন গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করে যাওয়া ৬৬ বছর বয়সী এই মানবাধিকারকর্মী নারীদের অধিকার আদায়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন সবসময়। ২০০৫ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

২০১৩ সালে তার বাবা মালিক গুলাম জিলানির পক্ষে মরণোত্তর ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ পুরস্কার গ্রহণ করতে ঢাকায় আসেন আসমা জাহাঙ্গীর। বাবা পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা মালিক গুলাম জিলানি যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন সবসময়, তেমনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার বিরুদ্ধে সবসময় অবস্থান নিয়েছিলেন আসমা জাহাঙ্গীর।

২০১৫ সালের নভেম্বরে যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুহম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পরে তাদের জন্য পাকিস্তান সরকারের দুঃখ প্রকাশের কড়া সমালোচক ছিলেন আসমা জাহাঙ্গীর। এতে ওই দুই ব্যক্তি পাকিস্তানের রাজনৈতিক এজেন্ট ছিলেন বলে প্রমাণিত হয় বলে পাকিস্তানের দি ডন পত্রিকার সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন তিনি।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোনো গণহত্যা হয়নি বলে দাবি করলে সেসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকা তদন্তে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন তদন্ত পর্ষদের দাবিও তোলেন আসমা জাহাঙ্গীর।

২০১৪ সালে এএফপি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, পাকিস্তানে মানবাধিকার বিষয়ে মানুষের ধ্যানধারণার পরিবর্তন আসছে।

“কোনো এক সময়ে পাকিস্তানে মানবাধিকারকে কোনো বিষয় হিসেবেই ধরা হতো না। এরপর বন্দিদের মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নারীদের অধিকার এক সময় পশ্চিমা ধারণা বলে মনে করা হলেও এ বিষয়ে পাকিস্তানের মানুষ এখন কথা বলছে।”

৩০ বছর বয়স থেকে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন আসমা জাহাঙ্গীর। পাকিস্তানে সেনাশাসন ও কর্তৃপক্ষের কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি।

১৯৮৩ সালে গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কারণে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০০৭ সালে সেনাশাসক দ্বারা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির অপসারণের প্রতিবাদ করায় গৃহবন্দিও করা হয় তাকে।

পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন তিনি। এছাড়া পাকিস্তানের সর্বপ্রথম বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

পাকিস্তানের আদালতে কোনো নারীর দেয়া সাক্ষ্য পুরুষের দেয়া সাক্ষ্যের অর্ধেক সমতুল্য করে প্রণীত আইনের প্রতিবাদ করার জন্য গঠিত উইমেন’স অ্যাকশান ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেরও একজন তিনি।

পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশানের নেতৃত্ব দেয়া প্রথম নারীও তিনি। মানবাধিকারের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করে যাওয়ার জন্য ইউনেস্কো-বিলবাও পুরস্কার লাভ করেন তিনি। এছাড়া ফ্রান্স থেকে অফিসার ডি লা লিজিও ডি অনার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।

ইরানে স্ব স্ব ধর্মপালনের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ রেপোটিয়ার হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড, ২০১০ সালে ফ্রিডম পুরস্কার, হিলাল-ই-ইমতিয়াজ, সিতারা-ই-ইমতিয়াজ, র‌্যামোন ম্যাগসেসাই পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে মার্টিন এনালস পুরস্কার লাভ করেন আসমা জাহাঙ্গীর।

পাঁচ বছর আগে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থার কয়েকজন সদস্য তাকে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ফাঁস হয়ে যাওয়া কিছু গোপন সরকারি নথিপত্রে। তাকে “চুপ করানোর জন্যই” এই পরিকল্পনা করার হয় মন্তব্য করে সেসময় এই ঘটনার পিছনে থাকা শক্তির পরিচয় উদ্ঘাটনে তদন্ত দাবি করে আসমা জাহাঙ্গীর।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে বিবিসি’র একজন সাংবাদিককে জাতিসংঘের র‌্যাপোটিয়ার হিসেবে কাজ করায় বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনার প্রতিবাদ করেন আসমা জাহাঙ্গীর।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাককান আব্বাসি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আইন ও মানবাধিকারকর্মী সম্প্রদায়ের জন্য আসমা জাহাঙ্গীরের মৃত্যু বিশাল ক্ষতি।

নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজায়ী তাকে “গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা” বলে অভিহিত করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ওমার ওয়ারিচ বলেন, আসমা জাহাঙ্গীর কখনই দুর্বল হননি। সমসাময়িক আরেক স্বনামধন্য পাকিস্তানি আইনজীবী সালমান আকরাম রাজা আসমা জাহাঙ্গীরকে তার পরিচিত সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন।

- কাজী শাহরিন হক