শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / ফিচার / ‘আমার কাজই আমার পরিচয়’ - আনুশে হোসেন
০৪/২২/২০১৮

‘আমার কাজই আমার পরিচয়’ - আনুশে হোসেন

-

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত একটি নাম আনুশে হোসেন। লেখক, সাংবাদিক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা বহন করা এই নারী সম্প্রতি অনন্যার মুখোমুখি হয়েছেন। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে আনুশে হোসেনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গিবাদসহ নানাবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত।

প্রশ্নঃ সিএনএন-এর মতো বিশ্বনন্দিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করাটা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো ব্যাপার। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আপনাকে নিশ্চয়ই অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে। সিএনএনসহ আপনার পেশাদার জীবনের নানাদিক সম্পর্কে জানতে চাই।

আনুশেঃ সিএনএন-এ আমি একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং লেখক-কন্ট্রিবিউটর রাইটার হিসেবে কাজ করছি। তবে আমেরিকান মিডিয়াজগতে এটাই আমার একমাত্র কাজ নয়। সিএনএন-এর সাথে শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালে, ওয়ান-টাইম গেস্ট হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। হাতের কাছে এত বড় সুযোগ এলে অবশ্যই তা গ্রহণ করে সেখান থেকে নিজের সেরাটা বের করে আনা উচিত। আমি তখন আমেরিকান সমাজে ইসলামবিরোধী যে মনোভাব তৈরি হচ্ছিল তা নিয়ে কাজ করছিলাম। ওই সময়ই সিএনএন থেকে ফোন এসেছিল। ইউএস কেবল নেটওয়ার্কে কাজের সুযোগ পাওয়া আমার লক্ষ্য ছিল এবং তা অর্জন করাটা অবশ্যই আমার জন্য বড় ব্যাপার। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, নারী হিসেবে এবং ভিন্ন বর্ণের মানুষ হয়ে ক্যারিয়ারে এমন মাইলস্টোন স্পর্শ করাটা বেশ কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এখন তা আমার ক্যারিয়ারের সম্পদ বলা চলে, বর্তমানে এটাই আমার পরিচয় বহন করে।
মানুষ সবসময় আপনাকে একটা ক্যাটাগরির মধ্যে ফেলে বিচার করতে চাইবে। তাই এখনো নিজের অবস্থানে থেকে লড়তে হচ্ছে যাতে করে রাজনীতি, লিঙ্গ বা ধর্মের মতো বিষয় নিয়ে আমি যথাযথ স্টোরি তুলে ধরতে পারি। একই সঙ্গে সবকিছুতে ইসলামিক মতাদর্শ কিংবা ভিন্ন বর্ণের একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি না আনার ব্যাপারও রয়েছে। দিনশেষে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে মানসম্পন্ন কাজ উপস্থাপন করাটাই মূল ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নিজেকে আমি একজন কাজপাগল মানুষ হিসেবে দেখি এবং সেজন্য কঠোর পরিশ্রমও করি। কোনো কিছু নিয়ে আমার ভয় নেই। আমি বিশ্বাস করি যে, কোনো কাজে যখনই সুযোগ আসে নিজের সেরাটা দেওয়া উচিত এবং সফল হতে হলে আপনাকে তা করতেই হবে।

প্রশ্নঃ আপনি নিজেকে একজন সাংবাদিক মনে করেন? সাংবাদিকতা বলতে প্রধানত রিপোর্টিং করাই কি বোঝায়? আপনার কাজের সঙ্গে এর সম্পৃক্তটা সম্পর্কে বলুন।

আনুশেঃ অনলাইন মিডিয়ার বদৌলতে সাংবাদিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে। তবে সংজ্ঞাগত দিক থেকে চিন্তা করলে রিপোর্ট করা এবং নিউজ লেখাকে সাংবাদিকতা বলে। হ্যাঁ, আমি টেলিভিশন, অনলাইন এবং প্রিন্ট-মিডিয়ার মতো ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিকতা করছি। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে নিজের পছন্দমতো কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তবে রিপোর্টিং-এর চেয়েও এডিটোরিয়াল এবং রাজনৈতিক ধারাভাষ্যে আমাকে বেশি কাজ করতে হয়। যখন আমি কাজটা শুরু করি তখন আমাকে ফোবর্সের জন্য নারীউদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের একের পর এক ইন্টারভিউ করতে হতো। আমি কাজটা অনেক ভালোবাসতাম। একই সঙ্গে নারীদের গল্প নিজের ভাষায় উপস্থাপন করতেও আমি ভালোবাসি। তাই দিনশেষে একজন লেখক হিসেবে পরিচিত হতে পছন্দ করি।

প্রশ্নঃ আপনার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কখনো উঠে এসেছে কি? বাংলাদেশ সম্পর্কে বাইরের দেশের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তা জানতে চাই।

আনুশে হোসেনঃ হলি আর্টিজানের সেই মর্মান্তিক হামলার পর আমি তা নিয়ে সিএনএন-এ লিখেছি, এমএসএনবিসি এবং সিবিএস নিউজসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সব নেটওয়ার্কে তা তুলেও ধরেছি। বর্তমানে আমি নিউইয়র্কভিত্তিক বাংলা চ্যানেল টিবিএন টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গেও কাজ করছি। নিজেকে ওয়াশিংটনভিত্তিক একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে মনে করে এসেছি এবং আমার পরিচয় নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, কারণ আমার কাজই আমার পরিচয়।

তবে একই সাথে বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে আমি গর্ব বোধ করি এবং নিজের শেকড়ের কথা মনে রাখা আমার জন্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছি, যার সদস্যরা রাজনীতি এবং জনমানুষের সঙ্গে যুক্ত। আমি আমার পারিবারিক ঐতিহ্য, বাবা-মা এবং দাদা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। বাংলাদেশকে আমি সবসময় একটি মুসলিমপ্রধান গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করি, যেখানে পদে পদে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে দেশটির নারীসমাজ।

প্রশ্নঃ এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। এটা কি সত্য যে অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র কেনা অনেক সহজ?

আনুশেঃ আমেরিকাতে গান (আগ্নেয়াস্ত্র) কালচার সত্যিই বেশ ভীতিকর এবং একই সঙ্গে ব্যতিক্রমও বটে। এত বছর এখানে থেকেও বুঝতে পারলাম না আমেরিকানরা কেন তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এতটা মাতামাতি করে। আমেরিকান সংবিধানে যখন সাধারণ মানুষকে অস্ত্র বহন করার অধিকার দেওয়া হয়েছিল তখন দেশটি ছিল একেবারে নতুন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তখন হয়তো অস্ত্রের দরকার ছিল, যা এখন একেবারেই জরুরি না। গড়পড়তা একজন আমেরিকানের ১৫টির মতো মেশিনগানের কেন দরকার হবে! এটা তো যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়!

অবাক করার মতো ব্যাপার হলো আমেরিকাতে অস্ত্র কেনার চেয়ে ঢের কঠিন কাজ হলো এক প্যাকেট সিগারেট কেনা! এর পরিণতিতে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে এখন।

প্রশ্নঃ: গান-কন্ট্রোল (আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ) এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রচেষ্টা কি সফল হতে যাচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে আরো শক্তিশালী আইন এবং নীতিমালা কি গ্রহণ করা হবে?

আনুশেঃ ফ্লোরিডায় সন্ত্রাসী হামলার পর পার্কল্যান্ডের শিক্ষার্থীদের ‘নেভার এগেইন’ আন্দোলন নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। আমেরিকাতে এমন শক্তিশালী এবং দৃঢ় আন্দোলন এর আগে দেখিনি। আমেরিকান ছেলেমেয়েরা এভাবে স্কুল-পাবলিক প্লেস বা অন্য কোথাও সহিংসতার ইতি দেখতে চায়। যে-কাজটা দেশটির প্রবীণ সমাজ করতে পারেনি তা এই শিক্ষার্থীরা করে দেখাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে তরুণরাই ইতিবাচক সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ষাটের দশকে আমেরিকার সিভিল রাইট মুভমেন্টেও তা দেখা গিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সা¤প্রতিক শাহবাগ আন্দোলনেও তা প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। তরুণদের জয় অনিবার্য, আমেরিকাতেও তরুণদের মাধ্যমে অস্ত্রের অপব্যবহার বন্ধ হবে এবং শক্ত আইন জারি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

প্রশ্নঃ প্রফেসর জাফর ইকবালের উপর চালানো সাম্প্রতিক হামলায় আরো একবার স্পটলাইটে এসেছে জঙ্গিবাদ। শুধু বাংলাদেশ নয়, আমেরিকার মতো দিনে দিনে আরো খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠা রাষ্ট্রের কাছে এটা তো সবসময়ই চিন্তার বিষয়। এ সমস্যা থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

আনুশেঃ প্রায় প্রত্যেক সমাজেই ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে চরমপন্থী ভাবধারার মানুষ রয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের আজীবন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, কারণ প্রত্যেক সমাজে কোনো না কোনো অংশ থাকবেই যারা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের ওপর ধর্মান্ধ নীতিমালা চাপিয়ে দিতে চাইবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সব চরমপন্থীদের একটি কমন উদ্দেশ্য হলো নারীর অধিকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

প্রশ্নঃ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে গান-কন্ট্রোল নিয়ে পুরুষদের থেকে নারীরা বেশি সরব এবং সক্রিয়। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

আনুশেঃ আমি নিজেই “মম’স ডিমান্ড অ্যাকশন ফর গান কন্ট্রোল ইন আমেরিকা” নামের একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। একেবারে জড়িত না থাকার পরেও অন্যান্য সকল সহিংসতার মতো গানশুটিংয়ে নারীরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কেননা আমাদের সন্তান, পরিবারের সদস্যরা এতে মারা যাচ্ছে।

প্রশ্নঃ ফ্লোরিডা ট্র্যাজেডির পর গান-কন্ট্রোল নিয়ে আবার জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটিতে অস্ত্রের যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধের জন্য আপনি-সহ এই ক্ষেত্রটির বিশেষজ্ঞরা গত কয়েক বছর ধরে বলছেন। কিন্তু সরকার এবং প্রশাসন এ ব্যাপারে বরাবর উদাসীন থেকে গিয়েছে। বিষয়টি এভাবে অবহেলা করার কারণ কি?

আনুশেঃ এককথায় বললে, টাকা। আমেরিকার ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) একটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রুপ, জায়গামতো লবিং করার ক্ষমতাও তাদের আছে। তারা অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করে এবং পলিটিশিয়ানদের পকেটে প্রচুর টাকা ঢালে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই তো তারা ৩০ মিলিয়ন ডলার দিল। যখনই পলিটিকাল সাপোর্ট দরকার হয়, এনআরএ তা কিনে নেয়।

প্রশ্নঃ আজকের মতো শেষ প্রশ্ন। ‘মি-টু ক্যাম্পেইন’ আমেরিকায় বেশ সফল হয়েছে। এর পেছনে কারণ কী বলে মনে করেন?

আনুশেঃ যৌনহয়রানি এবং নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংস আচরণের প্রতিবাদ করা এই আন্দোলন এখন হয়তো শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে, তবে বিষয়টি একেবারে নতুন কিছু নয়। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভিন্ন বর্ণ এবং দরিদ্র অবস্থা থেকে উঠে আসা নারীরা কর্মক্ষেত্রে চরমভাবে যৌনহয়রানি, বেতনবৈষম্য এবং অনৈতিক কারণে চাকরিচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনার শিকার হন।

#মিটু আন্দোলনের সবচেয়ে পজিটিভ দিক হলো, এটি হলিউডের সাদা চামড়ার ধনী নারীদের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। ক্ষমতাবান পুরুষদের এখন বুঝতে হবে যখন একজন নারী ‘না’ বলেন তখন তার মানে না-ছাড়া অন্য কিছুই নয়, তার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সম্মান জানাতেই হবে।

- নাসিফ রাফসান