শনিবার,১৭ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / গড়ে উঠুক এক মানবিক বিশ্ব
০৪/২১/২০১৮

গড়ে উঠুক এক মানবিক বিশ্ব

-

প্রাচীনকালে যুদ্ধের মধ্যে এক ধরনের নীতি-নৈতিকতা ছিল। আমরা প্রাচীন ক্লাসিক সাহিত্যে এর অনেক উদাহরণ দেখতে পাই। কিন্তু আধুনিক বিশ্বযুদ্ধে জেতার জন্য কোনো নীতি-নৈতিকতারই ধার ধারে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। পাক হানাদার বাহিনী আমাদের মনোবল ভাঙার জন্য যেসব অতিঘৃণ্য উপায় বের করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাঙালি নারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন-ধর্ষণ। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। তবে সম্প্রতি নতুন নতুন গবেষণায় এই তথ্যও উঠে এসেছে যে, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা প্রচলিত সংখ্যা দ্বিগুণও হতে পারে।

এসব নারীদের মধ্যে আমরা পরবর্তীসময়ে এমন সব বীরাঙ্গনার পরিচয় জানতে পেরেছি, যাঁদের কাহিনি শুনলে আমাদের আত্মা কেঁপে ওঠে, শরীর শিউরে ওঠে। এমনই এক বীরাঙ্গনা নারী ছিলেন কাঁকন বিবি। তিনি এখন অতীত। গত ২১ মার্চ তাঁকে আমরা হারিয়েছি চিরতরে। এই বীর খাসিয়া নারী একাত্তরে সেক্টর পাঁচের গুপ্তচরে হিসেবে কাজ করেছেন। সেক্টর কমান্ডার তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন শত্রুক্যাম্পের খবরাখবর নিয়ে আসার। কাঁকন বিবি সফল হয়েছিলেন পাঁচবার, একবার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর যে নির্মম অত্যাচার চরতে থাকে তাঁর ওপর, কৃষ্ণবর্ণের শরীরে সেই দাগগুলো ছিল মৃত্যুর আগেও স্পষ্ট। ২০১৫ সালের স্বাধীনতা দিবসে বর্তমান সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করে। এটা অনেক বড় একটি অর্জন। দুঃখের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীর প্রকৃত হিসাব নেই কারও কাছেই। ইতোমধ্যে তাঁদের অনেকে মারাও গেছেন। এখনো যারা বেঁচে আছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের অণুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

অনন্যার এবারের সংখ্যায় সম্পত্তি আইনে নারীদের অংশের হিসেব নিয়ে রয়েছে একটি বিশেষ প্রতিবেদন। এ ব্যাপারে ছোট্ট করে বলা যায়, একজন ব্যক্তির কোনো পুত্রসন্তান নেই, কেবল কন্যাসন্তান থাকার কারণে ওই ব্যক্তির সম্পত্তির ভাগ পাবেন তার ভাইয়ের ছেলেরাও। কেন? সন্তানরা কেবল কন্যা বলে? অথচ ওই ব্যক্তি যা করেছেন, তার সবই তাঁর একক পরিশ্রমের ফসল, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নয়। আধুনিক সময়ে অসংখ্য মানুষ এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বসবাস করছেন। আইনকে তো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। নইলে সেই আইনে জটিলতা দেখে দেবেই।

সারা বিশ্বেই এখন দিকে দিকে উড়ছে নারীদের বিজয়কেতন। বাংলাদেশে আড়াই দশক আগেও বছরে দশজন আলোচিত নারী খুঁজে পাওয়া খুব সহজ ছিল না। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলতে হয়, এখন চোখ-কান খোলা রাখলে সারা বছরে শতাধিক আলোচিত নারীকেও খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। পাক্ষিক অনন্যা গত ৭ এপ্রিল সম্মাননা জ্ঞাপন করেছে ২০১৭ সালের আলোচিত শীর্ষদশ নারীকে। এই সম্মাননার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের নারীসমাজের ভেতরে যদি সামান্য উৎসাহেরও জোগান দিতে পারে, সেটা অনন্যার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, একটুখানি উৎসাহে, সাহসে, ভাঙতে পারছে বাঁধার কঠিন পাহাড়।

নারীর সহযোগী হয়ে উঠতে হবে গোটা বিশ্বকে, গড়ে তুলতে হবে এক মানবিক বিশ্ব।

- তাসমিমা হোসেন