সোমবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীঃ সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি
০৩/২৫/২০১৮

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীঃ সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি

-

‘আমার যে এখনো সাফল্য এসেছে সেটা কিন্তু নয়। সুনাম হলেই যে সাফল্য হবে, তা কিন্তু নয়’, বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী।

মুক্তিযুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়া প্রিয়ভাষিণী নিজেকে সফল দাবি না করতে পারেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাঁকে মনে রাখবে সফল একজন যোদ্ধা হিসেবেই, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে আমরণ। প্রিয়ভাষিণী যুদ্ধ করেছিলেন হানাদারদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে। তাদের পরাজয়ের পর তার যুদ্ধ ছিল হানাদারদের এদেশিয় দোসরদের বিরুদ্ধে। সংসারজীবনে তাঁকে অব্যাহত রাখতে হয়েছিল সংগ্রাম। কখনো অর্থাভাবে পড়ে ধরেছিলেন সংসারের হাল। কখনোবা নিজের সামাজিক মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে লড়তে হয়েছে সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে।

আজ এই লেখনীর মাধ্যমে আমরা বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি সেই মহীয়সী নারীকে।

জন্ম এবং শিক্ষাজীবন
প্রিয়ভাষিণীর জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে নানার বাড়িতে। ‘ফেয়ারি কুইন’ নামের সেই বাড়িতেই শিল্প-সাহিত্যের পরিমন্ডলে তাঁর বেড়ে ওঠা। সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং রওশন হাসিনা দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন প্রিয়ভাষিণী। তাঁর নানা এডভোকেট আবদুল হালিম ছিলেন তৎকালীন রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। একসময় কংগ্রেস করতেন। দেশভাগের পর ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট সরকার আমলে স্পিকার হয়েছিলেন। কর্মসূত্রে নানা খুলনা থেকে ঢাকায় এলে প্রিয়ভাষিণীও আসেন তাঁর সাথে। এখানে তিনি প্রথমে ভর্তি হন টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে এবং পরবর্তীতে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে। এই স্কুলে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে। পরবর্তীসময় খুলনায় ফিরে গিয়ে পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাশ করেন।

কর্মজীবন
সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রিয়ভাষিণীর কর্মজীবন ছিল এককথায় বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য। কর্মজীবনে তিনি স্কুলে শিক্ষকতা থেকে শুরু করে কাজ করেছেন টেলিফোন অপারেটর হিসেবেও। ইউএনডিপি, ইউএনআইসিইএফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাসের মতো প্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। জীবনের শেষাংশে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্যসাধারণ এক ভাস্কর ও কারুশিল্পী।

সংসার জীবন
প্রিয়ভাষিণী প্রথমবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৬৩ সালে। কিন্তু তাঁর সে সংসার স্থায়ী হয়েছিল মাত্র আট বছর। ১৯৭২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করেন সরকারি কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ আহমেদকে। এই মানুষটিই ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রিয়ভাষিণীর প্রেরণা। স্ত্রীর দুঃসময়ে তিনি ভলোবেসে সাহস যুগিয়েছেন। ছয় সন্তানের জননী প্রিয়ভাষিনী সন্তানদের সবাইকেই মানুষ করেছেন নিজের হাতে।

প্রিয়ভাষিণীর সংগ্রাম
একাত্তরের ভয়াল দিনগুলোতে বাংলার লাখো মেয়ের মতো প্রিয়ভাষিণীর জীবনেও দুর্যোগ নেমে আসে। হানাদার বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। সেখানে তাঁর ওপর চলে অকথ্যা নির্যাতন। ফিরে আসার পর দেখলেন আপন, বহুদিনের চেনা মানুষগুলোই তাঁকে এড়িয়ে চলছে, ঠেলে দিচ্ছে দূরে। হানাদারদের ক্যাম্পে তাঁর সাথে কি হয়েছিল তা তিনি দীর্ঘ আটাশ বছর কাউকে জানাননি। কিন্তু একসময় তাঁর লড়াকু সত্তাই তাঁকে মুখ খুলতে প্রেরণা দিল। নিজের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি লাখো নির্যাতিত নারীর পক্ষে তিনি উচ্চারণ করলেন, “যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।” যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। সাহসের সঙ্গে বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ওপর চলা দুঃসহ নির্যাতনের।

ভাস্কর হয়ে ওঠার গল্প
প্রিয়ভাষিণীর শিল্পের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল নানাবাড়িতে বেড়ে ওঠার সেই সময়টাতেই। মাত্র নয় বছর বয়সেই বীণাপাণি স্কুলে পড়াকালীন তাঁর ভাস্কর্য প্রতিভা উন্মোচিত হয়। ১৯৫৯ সালে প্রিয়ভাষিণী যখন দৌলতপুর গার্লস স্কুলের ছাত্রী তখন তাঁর পরিচয় হয়েছিল প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানেরর সাথে। তবে তিনি তখনো অতটা বিখ্যাত হয়ে উঠেননি। ২৬ বছর পর এসএম সুলতান যখন খ্যাতির শীর্ষে তখন তাঁর সাথে কাকতালীয়ভাবে আবার দেখা হয় প্রিয়ভাষিণীর। এস এম সুলতানের উৎসাহ আর প্রেরণাতেই তিনি মনযোগ দেন ভাস্কর্য সৃষ্টিতে। একসময় খ্যাতিও পান ভাস্কর হিসেবে। তার শিল্পকর্ম বিখ্যাত মূলত এর সহজলভ্য এবং প্রকৃতিনির্ভর উপকরণের জন্য।

পুরস্কার-সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য ত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নিপীড়িত নারীদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় তাঁর অনন্য অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করে ২০১৬ সালের ১১ই অগাস্ট। ২০১০ সালে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। এছাড়া ২০০৪ সালে ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ ম্যাগাজিন তাঁকে ‘হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করে। গুনী এই শিল্পী ও ব্যক্তিত্বকে ১৯৯৯ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এছাড়াও কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আরো পেয়েছেন ‘চাদেরনাথ পদক’, ওয়াইডাব্লিউসিএ’র রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার। ৪ই জানুয়ারি, ২০১৮ এই ভাস্কর্যশিল্পী লাভ করেন সুলতান স্বর্ণপদক।

আত্মজীবনী
প্রিয়ভাষিণীর আত্মজীবনী ‘নিন্দিত নন্দন’ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায়।

তাঁর চলে যাওয়া
দীর্ঘদিন ধরেই একের পর এক অসুখ এসে বাসা বাঁধছিল প্রিয়ভাষিণীর শরীরে। অবশেষে ৬ মার্চ, ২০১৮, মঙ্গলবার, বেলা পৌনে ১টায় রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালের সিসিইউতে ৭১ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংগ্রামী নারী।

আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া এই নারী কখনোই হতাশাকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি সবসময় সম্ভাবনাকেই বড় করে দেখেছেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর সে মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। স্বদেশকে তিনি ভালোবাসতেন মনেপ্রাণে। আর তাইতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে নির্যাতিত হয়েও কখনও মাথা হেঁট করেননি। বরং সাহসের সাথে প্রতিবাদ করেছেন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে। অধিকার চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়তদের।

অন্যায়-নিপীড়নের বিরুদ্ধে এমন সাহসী পদক্ষেপই প্রিয়ভাষিণীকে করে তুলেছে সবার প্রিয় ও সম্মানীয়। আর তাইতো তিনি চিরজাগরূক থাকবেন এদেশের মানুষের অন্তরে। চিরদিন। চিরকাল।

- সাজ্জাদুর রহমান
ছবিঃ দ্য ডেইলি স্টার/ইন্টারনেট