সোমবার,১৮ Jun ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / প্রগতিকে গতি দেওয়ার এখনই সময়
০৩/২০/২০১৮

প্রগতিকে গতি দেওয়ার এখনই সময়

-

স্বপ্না তখনো পার করেনি পুতুলখেলার বয়স। শরীরে তখনো ঠিকঠাক মতো শুরু হয়নি বয়ঃসন্ধিকাল। আট ভাইবোনের সংসারে বিধবা মা স্বপ্নাকে বিয়ে দেন বাল্যবয়সেই। তারপর কয়েক বছর গড়াতেই দুই সন্তানের মা হয়ে পড়েন স্বপ্না। পুরুষপ্রভু নির্লজ্জ স্বামী যৌতুকের জন্য অত্যাচার চালাতে থাকে স্বপ্নার ওপর। যৌতুক পায়, ব্যবসা করে, লস করে। তারপর স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে পালিয়ে চলে যায় স্বপ্নার বীরপুরুষ স্বামী। অথই সাগরে পড়ে কিশোরী স্বপ্না। ভাইয়ের সংসারে জায়গা হওয়া সহজ নয়। কী করবেন বিধবা মা? মাটি কাটার কাজ নেয় স্বপ্না। দাঁড়াতে চায় নিজের পায়ে। একপর্যায়ে শিখে নেয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অটোরিকশা চালিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটোকে স্কুলে পড়িয়ে স্বপ্না প্রমাণ করেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ছিল-প্রগতিকে দাও গতি। সেই প্রগতিকে গতি দেওয়ার কাহিনি আমরা পেতে শুরু করেছি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, স্বপ্নাদের মাধ্যমে। আসলে বাল্যবিবাহের শিকার বেশিরভাগ মেয়ে ভয়ঙ্করভাবে বন্দি হয়ে পড়েন জীবনের শুরুতেই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের সংখ্যা বাংলাদেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সারা পৃথিবীতে কমছে বাল্যবিবাহের হার। ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে ইউনেসকোর হিসাবকে অতিরঞ্জিত বলা হয়েছে। তাদের দাবি, বাল্যবিবাহের হার ৫২ শতাংশের বেশি হবে না। কথা হলো, ৫২ শতাংশও কি কম? বিচলিত করার মতো আরো বিষয় হলো, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বয়সের সীমারেখা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি তবে ভূতের পিঠে সওয়ার হয়েছে? ভূতের পা নাকি উল্টো দিকে থাকে। বাংলাদেশ কি সেই উল্টো পথে চলছে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে? বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে নারীর আকাশ অন্ধকার রেখে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারবে না। একটি সুস্থ সমাজে নারীকে আন্দোলন করতে হয় না তার অধিকারের জন্য। তাই সময় এসেছে সমাজ পাল্টানোর।

মার্চ আমাদের স্বাধীনতার মাস। ‘রক্ত’ই যদি হয় স্বাধীনতার মূল্য, তাহলে স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করেছে। একাত্তরে শহীদ হয়েছেন ত্রিশ লাখ মানুষ, যাঁদের শরীরে মোট রক্তের পরিমাণ দেড় কোটিলিটার-যা কিনা গ্রীষ্ম মৌসুমে পদ্মা নদীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহিত পানির সমান! ত্রিশ লাখ মানুষ যদি হাতে হাত ধরে দাঁড়ায় তবে তার দৈর্ঘ্য হবে এগারো শ’ কিলোমিটার! একটি হিসেবে দেখা গেছে, একাত্তরে যে দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তাঁদের যদি একের ওপর আরেকজনকে শায়িত করা হয়, তবে তার উচ্চতা হবে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার, যা কিনা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি!

আমাদের মননে সবসময় ধারণ করতে হবে স্বাধীনতার এই মূল্য। এ স্বাধীনতাকে সার্থক করতে হলে গঠন করতে হবে একটি বৈষম্যমুক্ত সুন্দর রাষ্ট্র। প্রগতিকে গতি দেওয়ার এখনই সময়।

- তাসমিমা হোসেন