শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / জরুরি কথা
০৩/১৯/২০১৮

জরুরি কথা

-

চারদিকটা কুয়াশায় ঘোলাটে হয়ে আছে। একহাত দূরেও নজর চলে না। পাতলা সরের মতো হিম জড়িয়ে আছে ঘাসের ডগায়। পাতলা সর-পাতলা সর- কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল। পাতলা সর-না, ঘন সর- ঘন সর না, ঘন দুধের সর। কথাগুলোন মনে পড়ে, পড়ে না, হিম হিম কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায় বাতাসে। কোথায় যেন ছিল পাতলা সর নাকি ঘন সর ভাবতে ভাবতে মাথাটায় আবার গোলমাল লেগে যায়। হাত বাড়িয়ে মতিয়াকে খোঁজে সে। নেই! কোথায় গেল? এই সময়টা শালী কাছে থাকলে জিজ্ঞাসা করা যেত। কিন্তু ঐ যে চরিত্রের দোষ-!
এমনিতে তো মানুষে বলে না- ‘ঐ হাবু তোর বউয়ের চরিত্র খারাপ’ তা হোক খারাপ- তার মতো মাথা খারাপ লোকের বউয়ের চরিত্র খারাপ হলে আর বলার কি আছে?
তবে চলে আসবে ঠিকই, ঘণ্টাদুয়েক বাদে ঠিকই এসে বসবে হারুর পাশে। একটু নরম করে চাইবেও হারুর পানে। তখন কি আর রাগ করে থাকা যাবে?
উঠেই পড়ল হারু। রোগা গায়ে চাদরটা জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল খানিক। ঘোলাটে ভাবনা। কিছুতেই পরিষ্কার হয় না। ভাবনাগুলো। আষাঢ়, মাসের পূর্ণিমার মতো, ফুটি ফুটি করে কিন্তু ফুটে ওঠে না যেন।
কি যেন মনে পড়বার ছিল হারুর। কি যেন অনেক কথা-কি যেন খুব জরুরি কথা-।
খানিক চেষ্টা করে ‘দুত্তোর’ বলে হাঁটা ধরল হারু গণক পাড়ার দিকে।
রাজশাহী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এখন ছাঁকা তেলে পুরী ভাজা হচ্ছে, সেই সঙ্গে ছোলার ডালের ঘণ্ট। গিয়ে দাঁড়ালেই হলো। ক্যাশ বাক্সের পেছন থেকে মদন ময়রা হাঁক দেবে-
‘ওই মন্টু হারুর নাস্তা দে’ যা-’ মন্টু ছোঁড়াটা মহা হারামি- দিতে গা করে না- বরং দাঁত কেলিয়ে হাসে। বলে,
‘মাগনা খাবি, নাকি পয়সা দিতে পারবি-?’
‘তোর কিরে শালা, তোর বাপেরটা খাচ্ছি?’ চেঁচায় হারু।
মনে মনে আরও খারাপ গালি দেয় হারু, ‘স্কাউন্ড্রেল’
‘সান-অব-আ বীচ’ ও বলে, তারপর আবার ভাবতে থাকে, ‘কি হলো এটা- এ কথাগুলোনের মানেটা কি?’ এগুলো কি গালাগালি না অন্য কোনো কথা? হারুর মাথায় খপাৎ করে এই কথাগুলো লাফ দিয়ে পড়ল কেন? ভাবতে ভাবতে মাথাটা ভেবড়ে যাবার আগেই ছোঁড়াটা এসে এক থাবা ডাল আর চারখানা লুচি ভরা পলিথিনের ঠোঙটা হাতে ধরিয়ে দেয়।
‘বউয়ের পাউরুটি?’ হাত বাড়ায় হারু।
‘যা ব্যাটা বউ কই তোর?’
‘আছে- পাউরুটি দে?’ হাত বাড়ায় হারু।
‘কই ডাক আগে বউকে, তারপর দেব-।’
‘এই শালা বাঞ্চোৎ, বাস্টার্ড, দে পাউরুটি বলছি!
‘না দিলে কি করবি রে শালা-?’
‘লুঙ্গি খুলে ফেলব কিন্তু লুঙ্গি খুলে ফেলব-’ হুমকি দেয় হারু।
মদন চেঁচিয়ে ওঠে,
‘ওই ছোঁড়া, একটা বন দিয়ে ঝামেলা মেটা না- সক্কাল বেলা কি শুরু করলি?’ মন্টু বনরুটিটা ছুড়ে দেয়। রুটি কুড়িয়ে নিয়েও গালি দিতে থাকে হারু। সাত সকালে বউ নিয়ে এত দিকদারি কারো ভালো লাগে? মতিয়ার পুরি সহ্য হয় না-। তাই সব সময় একটা বনরুটি অথবা হাফ পাউরুটি চাইতে হয় হারুর। না, তা নিয়েও হেনস্থা হতে হবে।


পুরি-ডাল খেয়ে হারু বড় মসজিদের সামনে আসে। স্ট্যান্ডার্ড মেডিকেলের ঝাঁপ তুলছে শামসু। এখনও বাচ্চু ভাই আসেনি। থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে হারু, বাচ্চু ভাই এলে এক কাপ চা পাবে। লোকটা ভালো। হ্যাঁ বাচ্চু ভাই লোকটা ভালো, কখনো বউ নিয়ে খেপায় না তাকে। বরং ভালো মুখে জিজ্ঞাসা করে,
‘কি রে হারু তোর মতিয়া কেমন আছে?’
তো, একদিন হারু বলেছিল-
‘আজ খুব পিটেছিগো বাচ্চু ভাই- শালী মোটে কথা শোনে না-।’ বাচ্চু ভাই শুনে ভারি ‘আহা-উহু’ করল। যেন তার গায়েই ব্যথাটা লেগেছে- তারপর বলল, ‘আর মারিসনে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিস-।’ তারপর নাবিস্কো বিস্কুটের একটা প্যাকেট দিল মতিয়ার জন্য। সেই থেকে বাচ্চু ভাইকেই বউ সম্পর্কে দু’একটা মনের কথা বলে হারু। অন্যরাতো এক একটা হারামি, শুধু নোংরা মুখ করে সুখ পায়।
কার্তিক মাসের হিম ভেঙে রোদ তেজালো হচ্ছে। গা চিটপিট করে হারুর। মাথাটা আবার ভোম মেরে যেতে থাকে। কি- যেন একটা কথা মনে পড়ি-পড়ি করে, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না। খুব জরুরি একটা কথা। কিন্তু হারুর মাথাটা যেন একটা অন্ধ কুয়ো-। কোথায় যেন এক হাঁড়ি পানির মতো জরুরি কথাটা জমা হয়ে আছে কিছুতেই ভেসে উঠছে না। খস খস করে নোংরা নখে চুলগুলো খামচায় হারু-নিজেকেই বলে,
‘সান অব আ বীচ’
আর তখনই বাচ্চু ভাই ডাক দেয়,
‘হারু চা খাবি আয়-!’
হারু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই যে মনে পড়া, মনে না পড়ার টানাপড়েনে তার পরানটা বড় হাঁচোড় পাচোড় করে ‘জরুরি কথাটা’ ভুলে গেলে মুশকিল, তা সে খুব ভালো করেই জানে, কিন্তু আসল মুশকিল হলো জরুরি কথাটাই যে মনে আসে না।
‘আজকে একটু মালাই মারকে চা দিও তো বাচ্চু, ভাই মনটা বড় হেদিয়ে আছে-’
‘কেনরে-? আবার মতিয়ার সঙ্গে ঝগড়া করেছিস-?
‘না গো! কি যেন একটা কথা বুঝলে- খুব জরুরি ভয়ানক দরকারি কথা...’ বিড় বিড় করে হারু।
‘কি কথা রে-?’
‘ঐ তো ঝামেলা- গেলাম ভুলে- কিন্তু একটুও ভোলা উচিত হয়নি জানো? খুব খুবই জরুরি কথা-।
‘সে যাকগে তুই চা খা-।’
‘তাই- খাই-।’

৩.
চা-টা শেষ করার আগেই বর্ণা ম্যাচিং সেন্টারের বাবু ভাই দুজন লোক সঙ্গে করে এনে চেপে ধরল হারুকে।
‘চল ব্যাটা আজ তোর গোছলের দিন।’
‘না গো! আজকে না- মতিয়াকে বলে আসিনি!’
‘ধ্যাৎ, পাগলের ব্যাটা পাগল- মতিয়া তোর জন্য বসে আছে-?’
‘আছে তো-!’
খিক খিক হাসে লোক দুটো-
‘তোর মতিয়া কোনো মরদের সঙ্গে ভেগে গিয়েছে দ্যাখ।’
‘ভাগলেও ফিরবে তো!’ অসহায় হারু বলে, কিন্তু কেউ শোনে না ওর কথা-। টেনে আনে সোনাদিঘির মোড়ে। নেতাই নাপিতের দোকানে একটান মাথা কামায় নাপিতের নতুন এসিসটেন্ট- মাথাটা ছিলে যায় দু’এক জায়গায়, হারু বলে ওঠে-
‘ওহ ইট হার্টস!’ কেউ কান করে শোনে না হারুর কথা-। নিজেরা রসিকতা করে, হাসে- আর গালে ক্ষুর বসায়। হারু নড়ে উঠতে চায়, চেপে ধরে একজন, বলে,
‘নড়বি না গলা পুঁচিয়ে দেব।’ হারু আর নড়ে না- মনে মনে ডাকে।
‘মতিয়া- মতিয়া রে-।’
ন্যাড়া মাথা আর কামানো গাল নিয়ে হারু সোনাদিঘির পুকুরে নামে। ধুুঁধুলের খোসায় লাইফবয় সাবান মাখিয়ে হেঁইয়ো ডালে গোছল করায় একজন। বাবু ভাই বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। এক সময় বলে,
‘এই শালাকে ফাঁসির গোছল দিচ্ছিস নাকি? ওঠা পানি থেকে।’ হারুকে একটা নতুন লুঙ্গি পরিয়ে দেয় তারা। হারু তার চিটচিটে চাদর গায়ে জড়ায়। লোক দুটোকে টাকা দেয় বাবু ভাই। একজন জিজ্ঞেস করে-
‘ওর মাথার ওই দাগটা কিসের গো বাবু ভাই-?’
‘কে জানে? আমি তো জন্ম থেকেই অমন দেখছি-’
‘তা তোমরা কর বটে ওর জন্য-।’
‘আব্বাকে দেখেছি যত্ন করতে- তাই করছি আরকি-!’
‘খালু জান কই পাইছিলেন এইটারে? প্রশ্ন করে অন্য আরেকজন-।
‘মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর, আব্বা আহত হয়ে যে হাসপাতালে ছিলেন সেখান থেকেই নাকি ওকে নিয়ে আসেন। হাসপাতালের খাতায় লেখা ছিল আহত মুক্তিসেনা’ কোনা ঠিকানা ঠাঁই লেখা ছিল না। সেই থেকেই- আছে-! যাইরে, আম্মা আবার এটাকে খেতে না দিয়ে খাবে না-। যত যন্ত্রণা আমার- মতিয়াটা যে কোথায় গেল? এ শালা তো আবার বউকে না পেলে খাবে না-।’
আবার খিক খিক হাসতে থাকে তিনজনেই। হারু পাগলার বউ মতিয়া, কে যে এই কথাটার আমদানি করেছিল? হয়ত গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে লোকে বানিয়েছে; কিন্তু পাগলাকে কে বোঝাবে সে কথা, পাগলা জানে মতিয়া তার বউ, ব্যাস।
বাপ ভাইয়ের বাড়িতে ভালো খাওয়া ছিল আজ। মন ভরে খেয়েছে হারু। আবার দ্যাখো মতিয়াও পৌঁছে গেছিল হারুর আগেই দুজনেই খেয়ে আইঢাই। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে আসে ওরা। আজ রাতে আর খিদে পাবে না। কামানো গাল আর নেড়া মাথায় বেশ হালকা লাগছে হারুর। মাথার মধ্যে দলা বাঁধা অন্ধকারের ঘূর্ণি আর নেই। এই বেশ, রাজশাহী স্টেশনের এককোণে তারা দুজন শুয়ে থাকবে: হারু আর মতিয়া।
শুয়ে শুয়ে হারু কথা বলে মতিয়ার সঙ্গে-
‘হ্যাঁরে মতিয়া তুই কোথায় যাস বলত? ওরা সবাই কত খারাপ কথা বলে জানিস-? ওরা বলে তোর অন্য মরদ আছে- সত্যি নাহ চুপ করে থাকলে তো হবে না- উত্তর দিতে হবে- আমি হচ্ছি গিয়ে তোর স্বামী- স্বামী মানে জানিস? হাজবেন্ড! কিচ্ছু জানিস না তুই। আসলে ওরাই ঠিক বলে, তোর চরিত্র বলে কিচ্ছু নেই। নেহাত আমার মাথাটার মধ্যে গোলমাল বলে তোকে কিছু বলি না নতুবা... হুঁ ... হুঁ মজাটা। টের পেতে তখন। শুধু কথাটা, খুব মনে পড়ছে না বলে- সেই যে জরুরি কথাটা, খুব দরকারি কথা- কিন্তু কি যেন কথাটা-? মনে পড়লেই তোমার হবে বুঝলে।’
পৌষ মাসে রাজশাহীতে শীত পড়ে জব্বর। আইল্যান্ডের উপর কুঁকড়ে মুকড়ে ঘুমাচ্ছিল মতিয়া আর হারু। কে যেন রাতে এসে একখানা কম্বল গায়ের উপর দিয়ে গেল। প্রতিবছরই রাতের বেলা কারা যেন কম্বল গায়ে দিয়ে যায় আবার দ্যাখো পরদিনই কে যেন চুরি করে নেয়। ভারি আমোদ পায় হারু। ফি বছর কম্বলের চোর পুলিশ খেলা। নতুন কম্বলের ওম খুব। হারু আরাম করে ঘুমিয়ে গেল পা ছড়িয়ে।
ভোরের আজানের আগেই ঘুম ভেঙে গেল হারুর। কোলের মধ্যে-ই কিরে বাবা-। ছোট ছোট ন্যাদোশ ন্যাদোশ থলথল তুলতুলে চারটে ছানা। একটা আর একটার পিঠের উপর ওঠার জন্য হাঁকপাক করছে আর চিৎপটাং গড়িয়ে পড়ছে। তড়াক করে উঠে বসল হারু। মতিয়া করুণ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল- কুঁই। তারপর নরম করে তার দাড়ি ভরা গালটা চেটে দিল।
হারুর মাথায় ভোমরার মতো ভোম ধরল যেন। ছোট্ট একটা জোনাকি পোকার আলোর মতো- তারপর শরতের জোছনার মতো-
তার ওপর ঝলসে ওঠা সূর্যের মতো মনে পড়ল হারুর। ঘোলাটে অন্ধকর সরে গিয়ে মনে পড়তে লাগল সবকিছু।
ধানমন্ডির একটা বিশাল দোতলা বাড়ি। বোগেনভিলার লতায় থোপা থোপা লাল ফুল। ঢাকা কলেজে পড়ে হারুন নামের সদ্য যুবক-। তার প্রিয় পোস্য এ্যালসেসিয়াসান কুকর জুডি। ঝুড়ির মধ্যে ন্যাদোশ ন্যাদোশ নরম গোল গোল চারটে বাচ্চা- হারুন খেলত বাচ্চাদের নিয়ে- জুডি গাল চেটে দিতো তার।
তারপর- তারপর উত্তাল আগুন ঝরা সময়-
‘আমাদের আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’
হারুন পালানো বাড়ি থেকে- এলএমজিটা শক্ত হাতে ধরে ছুটছে সে- খবর পৌঁঁছাতে হবে। জরুরি। ভীষণ জরুরি খবর- পাকিস্তানি শত্রুরা পৌঁছে গেছে। আপাতত পিছু হটতে হবে- নতুবা মারা যাবে অনেক যোদ্ধা- পিছু হটো সাবধান-সাবধান ছুটছে হারুন ছুট ছুট কানের পিছনে একটা ধাক্কা লাগল- হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে-কে যেন টেনেহিঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল দূরে-। কোথায় কোনো দূরে-, ডুবে যেতে লাগল হারুন-।
উহ! মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা করছে হরুর। বন্যার পানির মতো আসছে ছবির পর ছবি- ফাস্ট ফরোয়ার্ড ছবি। হারু গোঙাতে থাকে।
চলে যাও-
চলে যাও পুরনো ছবি।
হারু পুরোনো ছবিতে নেই, হারুন হারিয়ে গেছে। কুয়োর গভীর তলে লুকিয়ে থাকা দরকারি কথা ছায়া ছায়া হারিয়ে যাওয়া জীবনে নয় হারু বাঁচবে চায় এই জীবনে-।
হারু বাঁচবে তার এই জীবনে, হারু পাগল বউ মতিয়া কুকুির- এই তো সুখে সংসার বাচ্চু ভাইয়ের চা, বাবু ভাই-এর ভাত আর ছেনাল মতিয়া- হারু পাগলা এতেই খুশি, শুধু যদি কম্বলটা চুরি না যায় তো!!