শনিবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
০৩/০৬/২০১৮

আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?

-

দিনটি ছিল ভালোবাসার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি স্কুলে সেদিন নৃশংস ঘৃণা নিয়ে ঢুকে পড়ে ১৯ বছরের এক তরুণ। নিকোলাস ক্রুজ নামের তরুণটি স্কুলে ঢুকে শুরু করে এলোপাথাড়ি গোলাগুলি। মুহূর্তে ঝরে পড়ে ১৭টি কোমল তাজা প্রাণ।

কী ভয়ঙ্কর কথা-মার্কিন মুলুকে বন্দুকধারীর হামলায় প্রতিবছর মৃত্যু হয় অন্তত ৩৩ হাজার মানুষের। গত এক বছরে কেবলমাত্র স্কুলে ঢুকে কোনো বন্দুকধারীর হামলার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৮টি। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডায় যে ঘটনা ঘটেছে, তা তৈরি করেছে একটি নতুন মাত্রা। এর আগে দেখা যেত, স্কুলে হামলার পর সামান্য কিছু প্রতিবাদ হতো, আর সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই তা ভুলেও যেত সবাই। কিন্তু এবার ফ্লোরিডায় যেদিন ঘটনাটি ঘটে, সেদিন বিকেল থেকেই ছাত্রছাত্রীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকে এবং শুরু হয় প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ বড় আকার ধারণ করে। আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরাও শামিল হয় প্রতিবাদে। যোগ দেয় বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন। তাদের প্রত্যেকেরই দাবি, সুরক্ষার অধিকার রয়েছে সমস্ত নাগরিকের। ফলে, অবিলম্বে অস্ত্রের খোলাবাজার বন্ধ করতে হবে। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মার্কিন রাজনৈতিক দলগুলির যোগাযোগ এখন আর গোপন নেই। আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মানুষের জীবন বা মানবাধিকারের বিষয়ে খুব কমই গুরুত্ব দেন। কিন্তু যদি জেগে ওঠে ছাত্র-জনতা, তখন তার রূপ কেমন হয়, সেটা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে। ছাত্রদের আন্দোলনের রূপ আমরা দেখেছি বায়ান্নতে, পুরো পাকিস্তান আমলে, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে, সর্বশেষ ২০১৩ সালে শাহবাগে। সুতরাং এতদিন ধরে রাজনীতিকরা যা করে উঠতে পারেননি, ফ্লোরিডার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তা করে দেখাতে পারছে। এই প্রতিবাদের শেষ দেখেই ঘরে ফিরুক তারা।

মার্চ মানে নারী অধিকারের মাস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আসীন। অথচ মাত্র শত বছর আগেও এসব কল্পনা করা যেত না। অথচ মানবসমাজ এক সময় ছিল মাতৃতান্ত্রিক। নারীর পরিচয়ে সন্তান বড় হতো। পাশাপাশি, কৃষিকাজ নিয়ন্ত্রণ করত নারীরা। অ্যাঙ্গেলস মনে করেন, নারী এবং পুরুষের কাজের পরিধি নিয়েই সূত্রপাত হয় শ্রম-বিভাজনের।

আধুনিক সময়ে নারীর অধিকার নিয়ে প্রথম কণ্ঠস্বর দেখা যায় ১৬৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। ওই সময় মার্গারেট ব্রেন্ট নামক এক নারী ম্যারিল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশের দাবি করেন। কিন্তু, পুরুষরা তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেয়। ১৭৯৩ সালে ফরাসি নাট্যকার ও বিপ্লবী অলিম্পে দ্যা গগসকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। কারণ এই মহীয়সী নারী ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে নারী অধিকারের ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘নারী জেগে ওঠো; তোমার অধিকারকে আবিষ্কার করো।’ মৃত্যুর আগে গগস বলে গেছেন একটি ঐতিহাসিক কথা-‘নারীর যদি ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার অধিকার থাকে, তবে কেন থাকবে না পার্লামেন্টে যাবার অধিকার?’

এই বাংলায় ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’র বিরুদ্ধে রেনেসাঁসের ভূমিকা পালন করেন বেগম রোকেয়া। এছাড়া রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, তেভাগা, নানকা, টংক বিদ্রোহসহ আরো বিভিন্ন সংগ্রামে ব্রিটিশভারতে নারীরা ছিলেন অত্যন্ত প্রতিবাদী।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ তাই তো। সুতরাং আমাদের তো জাগতেই হবে। নইলে সকাল হবে কীভাবে?

- তাসমিমা হোসেন