রবিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / শহীদ মিনারঃ রক্ত দিয়ে কেনা অধিকারের সৌধ
০২/২০/২০১৮

শহীদ মিনারঃ রক্ত দিয়ে কেনা অধিকারের সৌধ

-

শহীদ মিনার। নামটা শুনলেই কেমন একটা শিহরন জাগে বুকে। রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, জব্বারদের বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতির এই মিনার বাঙালি জাতির স্বাতন্ত্র্যের এক মহান প্রতীক। পবিত্রতার প্রতীক সাদা রঙের স্তম্ভগুলো যেমন আমাদের অন্তরে শহীদের পবিত্র আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগায়, তেমনি মাঝের লাল বৃত্ত আমাদেরকে প্রেরণা দেয় আত্মত্যাগের। এই শহীদ মিনারের পেছনে লুকিয়ে আছে ত্যাগ, বিরহ আর বেদনার পাশাপাশি মহান এক গৌরবগাথা।

১৯৫২-র রক্তঝরা দুপুর। আগের দিন জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে স্বাপ্নিক তারুণ্য ছুটল মিছিলে। লক্ষ্য একটাই- বাঙালির প্রাণের ভাষাকে অবমাননা করার মতো ধৃষ্টতার সমুচিত জবাব দেয়া। এমনও ভেবেছে কেউ? ভাষার জন্য এতটা করা। ও মা! এ যে মায়ের ভাষা। হ্যাঁ, বাংলার অদম্য তরুণদল সেদিন দেখিয়েছিল কীভাবে রক্ত দিয়ে অধিকার কিনতে হয়।

মিছিল চলছিল। হঠাৎই প্রচন্ড ঠা ঠা শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড আর ফেস্টুন হাতে দামাল ছেলের ক’জন লুটিয়ে পড়েন মুহূর্তেই। তৎক্ষণাৎ ইতিহাসের বুকে রক্ত দিয়ে লেখা হয়ে যায় এক দারুণ ইতিহাস।

শহীদদের সঙ্গীরা শপথ নিলো শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরি হবে স্মৃতিস্তম্ভ। ২৩শে ফেব্রুয়ারির বিকেল বেলা শুরু হলো শহীদ মিনার তৈরির কাজ। বদরুল আলম আর সাঈদ হায়দারের করা নকশায় জিএস শরফুদ্দিনের (যিনি পরবর্তীসময় ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে পরিচিতি পান) তদারকিতে দুজন রাজমিস্ত্রীর হাতে নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতির প্রথম স্তম্ভ। ইট-বালি নেয়া হয় মেডিকেল কলেজের সম্প্রসারণের জন্য রাখা মজুদ থেকে। আর সিমেন্ট আসে পুরান ঢাকার পিয়ারু সরদারের গুদাম থেকে। সেদিন রাতের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হোস্টেলের বার নম্বর শেডের পূর্ব প্রান্তে, কোণাকুণিভাবে হোস্টেলের মধ্যবর্তী রাস্তার গা-ঘেঁষে শহীদদের রক্তভেজা স্থানে সগৌরবে অস্তিত্ব জানান দেয় ১০ ফুট লম্বা ৬ ফুট চওড়া শহীদদের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়ানো মিনার।

খবরের কাগজে আসে শহীদ মিনার তৈরির সংবাদ। শাসকের চোখে রক্ত ছলকে ওঠে বাঙালিদের দমাতে না পারার ক্ষোভ ও অপমানে। ২৪শে ফেব্রুয়ারির সকালে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ অনাড়ম্বরভাবে উদ্বোধন হয় শহীদ শফিউলের পিতার হাতে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি সকাল দশটায় দৈনিক আজাদের তৎকালীন সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের হাতে শহীদ মিনার উদ্বোধিত হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। এবার ছাত্র, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের লোকের বিপুল সমাবেশ হয়। তবে শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু এড়ানো গেল না। কেননা কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া তৈরি হওয়া ইট সিমেন্টের সাদামাটা এই স্তম্ভ তাদের সিংহাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছিল বারবার। সেদিন বিকেলেই সরকার পুলিশ আর সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ছাত্রদেরকে হোস্টেলে অবরুদ্ধ করে গুঁড়িয়ে দেয় সদ্যনির্মিত শহীদ মিনারটি।

তারপর? তারপরের গল্প শুধু বাঙালির উত্থানের গল্প। শহীদদের স্মৃতি মুছে দেবে পাকিস্তানি জালিম শাসক? তা তো হয়ইনি। উলটো তাদের এমন আগ্রাসী মনোভাব বাংলার সাধারণ মানুষদের মনে শহীদদের স্মৃতি চিরজাগরুক করে দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত হতে থাকে শহীদ মিনার। ১৯৫৩ সাল থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার অবশেষে বাধ্য হয় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। ৫৭ সালে ভাস্কর হামিদুজ্জামানের করা নকশা অনুসারে শুরু হয় বর্তমান শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ। ’৫৮-তে জারী হলো সামরিক আইন। শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজও থেমে যায়।

চার বছর বন্ধ থাকার পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আযম খান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর থাকাকালীন ১৯৬২ সালে পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এবার গোটা কাজ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বর্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির ওপর। শিল্পী হামিদুর রহমান আর তার সহকারী ভাস্কর নভেরা আহমেদের পরিকল্পনা ছিল অনেক কিছু দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটিকে সাজানোর। ছিল জাদুঘর, ম্যুরাল, ফোয়ারা আর ভাষাশহীদ সন্তানের মৃতদেহ কোলে মায়ের ভাস্কর্য যুক্ত করে সুন্দর একটি কমপ্লেক্স বানানোর স্বপ্ন। কিন্তু এখানেও বাঁধ সেধেছে স্বৈরাচারী সরকার। অবশেষে মূল নকশা ছেঁটে-কেটে সংক্ষিপ্তরূপেই নির্মাণ কাজ শেষ করা হয় প্রেরণাদায়ক এ স্মৃতিস্তম্ভের। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালের শুরুতে। ঐ বছরই ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগ স্বীকার করা শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগমকে দিয়ে নতুন শহীদ মিনারের উদ্বোধন হয়।

মাথার ওপর গনগনে সূর্যকে সাক্ষী রেখে ফাল্গুনের পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া বিছানো রাজপথে এ মাটির যে সন্তানেরা মাথা উঁচু করে বিদায় নিয়েছিল তারা যেন ফাল্গুনে ফুটে থাকা পলাশ শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার মতোই উজ্জ্বল আর সূর্যের মতো তেজোদ্দীপ্ত, চিরভাস্বর।

- আহমাদ সাঈদ রোদ্দুর