সোমবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অমর একুশের স্মৃতিচিহ্ন
০২/২০/২০১৮

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অমর একুশের স্মৃতিচিহ্ন

-

জাতিগতভাবে বেশ সমৃদ্ধ ইতিহাস আমাদের। নিজ অধিকার আদায়ের দাবিতে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা যে-সংগ্রাম করেছেন বিশ্বের নানাপ্রান্তের বঞ্চিত মানুষদের জন্য তা অনুকরণীয় বলা চলে। মাসটা যখন ফেব্রুয়ারি তখন ২১শের গৌরবময় অধ্যায় স্মরণ না করলেই নয়। জাতীয় জীবনে ভাষা আন্দোলনের মাহাত্ম্য অনুধাবন কম-বেশি আমরা সবাই করতে পারি। এই লেখায় অমর একুশের প্রভাব একটু ভিন্ন আঙ্গিকে শৈল্পিক চিত্রায়নের মাধ্যমে দেখা যাক।

৫২-এর উত্তাল দিনগুলোতে প্রাণের বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্যই রাস্তায় নেমেছিল এদেশের মানুষ। আন্দোলন যখন ভাষা নিয়ে, বলার অপেক্ষা রাখে না দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা চলচ্চিত্রের মতো শৈল্পিক ক্ষেত্রগুলোতে ৫২-এর প্রভাব ব্যাপক। ৫২-কে কেন্দ্র করে তাই কবিতা, গান, গল্প-উপন্যাস, নাটকসহ শিল্পের নানা শাখায় কালজয়ী সৃষ্টি রয়েছে, যার মাধ্যমে আমাদের শিল্পাঙ্গন হয়েছে আরো সমৃদ্ধ। এমনই কিছু অনন্য সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

একুশের গান
২১শে ফেব্রুয়ারি মানেই বাড়ি-ঘর, রাস্তায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের ধ্বনি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই গানটি এক কথায় ৫২-এর রক্তমাখা সেই দিনটির সুরময় উপাখ্যান। সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর রচনায় গানটিতে চূড়ান্ত সুর প্রদান করেন প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদ। একুশের স্মৃতিচারণ, শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের বর্ণনা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান কিংবা জাতিগত একক
সত্ত্বার পরিচয়-কী নেই এই গানে! এই গানটি ছাড়াও গীতিকার আব্দুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’-এর কথা বলা যায়। গানটির আগ্রাসীভঙ্গি অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্তপ্ত স্লোগানের মতো কাজ করেছে যুগে যুগে। আর এর স্বরূপ ‘ওরা কথায় কথায় শেকল পরায় আমার হাতে-পায়ে’-লাইনটির মাধ্যমেই পাঠক ঠিকই বুঝতে পারবেন।

একুশের কবিতা
ভাষাসৈনিক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা। ৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারির পরপরই এই কবিতা রচনা করেন তিনি এবং তৎকালীন সময়ে তরুণ সমাজে তা প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ তৈরির পথে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি পরবর্তীসময় কবি শামসুর রাহমান রচিত ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমাকে মাল্য দেবে দাও’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের ‘সভ্যতার মণিমধ্যে’-কবিতাগুলোতে অমর একুশের কথা উঠে এসেছে বারবার।

উপন্যাসের পাতায় একুশে ফেব্রুয়ারি
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান রচনা করেন ‘আরেক ফাল্গুন’ নামের উপন্যাসটি। মাত্র তিনদিন ও দুইরাতের বর্ণনাকে ঘিরে কাহিনি রচিত হয় এই উপন্যাসে। প্রথম দুদিন ধরে একুশ পালনের প্রস্তুতি এবং তৃতীয় দিনে তার চূড়ান্ত পরিণতির যে উপাখ্যান জহির রায়হান লিখেছেন তাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের পাতায় এরপর বহুবার উঠে এসেছে ১৯৫২। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামেই অনবদ্য আরেকটি উপন্যাস রচনা করেন তিনি। এছাড়া শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’ এবং সেলিনা হোসেনের ‘নিরুত্তর ঘণ্টাধ্বনি’ একুশের বার্তা নিয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রে ভাষা আন্দোলন
ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে রচিত নাটকের কথা বলতে গেলে মুনীর চৌধুরী রচিত ‘কবর’ নাটকের কথা বলতেই হবে। ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কবরে পুঁতে ফেলাকে কেন্দ্র করে এক ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে অনেকটা রূপকের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরেন মুনীর চৌধুরী, যা যুগ যুগ ধরে শিহরিত করেছে দর্শকদের।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য এক ক্ল্যাসিক জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’। এই ছবিতে ব্যবহৃত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’, ‘এ খাঁচা ভাঙ্গব আমি কেমন করে’ কিংবা পরবর্তীসময় জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পাওয়া ‘আমার সোনার বাংলা’ গান এ দেশের স্বকীয়তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর সঙ্গে অনেকটা ব্যঙ্গ-রসাত্মক প্লটে কাহিনি ও অভিনয়ের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন তথাপি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও এসেছে বারবার।

গল্প, কবিতা, উপন্যাস, চলচ্চিত্র- মোদ্দাকথা শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ২১শে ফেব্রুয়ারি দখল করে নিয়েছে পরম শ্রদ্ধার একটি স্থান।

- নাইব মো. রিদোয়ান