মঙ্গলবার,২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
হোম / সম্পাদকীয় / ফাগুনের আগুন ও আলো
০২/১০/২০১৮

ফাগুনের আগুন ও আলো

-

প্রেমের ফাঁদ নাকি পাতা আছে ভুবনজুড়ে? সেই ফাঁদ হলো দিল্লিকা লাড্ডুর মতো। ফাঁদে পড়লে চেঁচামেচি, না পড়লেও আহাজারি। মানুষ কেন প্রেমে পড়ে, কেন বয়ঃসন্ধিকাল আসে? কেন ফাগুন আসে, ভালোবাসা দিবসের উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে যায় আর সব দিবসকে? একটি রূপকথা শোনা যাক। সৃষ্টির শুরুতে নাকি প্রতিটি প্রাণী নিজেকে দুভাগ করে বংশরক্ষা করত। অ্যামিবার মতো। এ বড় কষ্টের দ্বিখণ্ডন। সব প্রাণী একদিন একজোট হয়ে বিধাতার কাছে আর্জি জানাল, এভাবে নিজেকে দুভাগ করে বংশরক্ষা করার কষ্ট সহ্য হয় না আর। তারা ভিন্ন কোনো উপায় চায়। বিধাতা তখন প্রাণীদের শরীরে উপহার দিলেন একটি নতুন হরমান। সেই হরমোনের ক্ষরণে প্রাণীর মনে জাগতে শুরু করল গভীর প্রেমানুভূতি, যৌনানুভূতি।

হালের বৈজ্ঞানিকরা সেই হরমোনের নাম দিয়েছেন ‘অক্সিটোসিন’। কেউ কেউ তো রাখঢাক না করেই বলেন, আমরা সবাই-ই দাস, অক্সিটোসিনের শ্লেভ। বিধাতাকে তো এই জীবজগৎকে রক্ষা করতে হবে! পান্ডা নামের নাদুস নুদুস প্রাণীটির নাকি অক্সিটোসিন তথা প্রেমানুভূতি খুব কমে অনেক। সেই কারণে তারা নাকি এখন বিলুপ্তির পথে। আমরা বিলুপ্ত হতে চাই না। সুতরাং প্রেমে আমরা পড়বই। পাগলের মতোই পড়ব। প্রেমে পড়ে ব্যর্থ হলে এই কিছুদিন আগেও আমরা কেউ পাবর্তী হতাম, কেউ দেবদাস। কিন্তু এই প্রজন্মই এখন প্রেম ভেঙে গেলে মেসেঞ্জারের রগরগে চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট নিয়ে রাখে। সেই স্ক্রিনশট নিয়ে একটি সময় শুরু করে এলোপাথারি কাদা ছোড়াছুড়ি। এসব ‘বড় প্রেমের’ প্রেমিক-প্রেমিকারা অবশ্য সান্ত্বনা পেতে পারেন শরৎচন্দ্রের বয়ান শুনে, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়।’ বিখ্যাত ফরাসি কবি গতিয়ে অবশ্য মনে করেন, ‘একমাত্র ভালোবাসা সারাতে পারে সব রোগ।’ আবার সর্বমান্য দার্শনিক প্লেটো বলেন, ‘প্রেম হলো মানসিক ব্যাধি।’ অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাবিয়েছেন এইভাবে-‘প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।’

সর্বনাশই বটে। কিন্তু ভালোবাসায় যে সর্বনাশ, সবাই জেনেশুনেই পান করতে ব্যাকুল সেই বিষ। এই কারণে ভ্যালেন্টাইন ডে এখন হয়ে উঠেছে কর্পোরেট বাণিজ্যের অত্যন্ত হট আইটেম। ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে ২০০৫ সালে কেবল আমেরিকাতেই বিক্রি হয়েছে ১২.৮ বিলিয়ন ডলারের উপহার সামগ্রী। ১৩ বছরে এই বাজার বড় হয়েছে প্রায় দশ গুণ। আর সারা বিশ্বের হিসেব তুলে ধরলে এর অঙ্ক গিয়ে দাঁড়াবে কয়েক শত ট্রিলিয়ন ডলারে। সুতরাং ভালোবাসা দিবসের প্রবলস্রোতে ভাসবেই এই বিশ্ব। সেই স্রোতে গা ভাসালে ক্ষতি নেই, তবে, হে নারী, নিজের ডিগনিটি হারিয়ে ফেলো না তুমি। ভুলে যেয়ো না, চারিদিকে অনেক গিরগিটি। কোনো আঘাতে ভেঙে পড়ো না, ভালোবাসতে শেখো নিজেকেও।

ফাগুনেতে আগুন আছে। সেই আগুনে যেমন উত্তাপ আছে, তেমনি আছে স্নিগ্ধ আলোও। সেই আলোয় আলোকিত করো নিজের হৃদয়।

সবাইকে ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।

- তাসমিমা হোসেন