সোমবার,১৮ Jun ২০১৮
হোম / ভ্রমণ / নাফ নদীর তীরে
০২/১০/২০১৮

নাফ নদীর তীরে

-

টেকনাফ -- বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ উপজেলা। কক্সবাজার থেকে ৮৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট এলাকার পাশেই আছে নাফ নদী। আর সেই নদী পাড় করলে মায়ানমার। দেশের মাঝখান থেকে এত দূরে গিয়ে সেই টেকনাফে পাড়ি জমালে মনে হবে আসলেও বিদেশে এসে পড়েছেন। আলো-বাতাস সবই যেন বদলে যায় সেখানে। টেকনাফ যাওয়ার পথে দিগন্তজোড়া টাটকা সমুদ্রের বাতাস, পাশে সবুজে আচ্ছন্ন পাহাড় -- এই দুই বিপরীতধর্মী প্রাকৃতিক কারুকার্যের মাঝখান দিয়ে আপনি ছুটে চলবেন দুর্বার গতিতে। শেষে গন্তব্যে পৌঁছানর পর দেখা পাবেন সেই রহস্যময় সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা টেকনাফ।

টেকনাফ যাওয়ার পথে আপনি মানুষের দেখা বেশি পাবেন না। তবে একবার গেলে দেখবেন হরেকরকম মানুষের হরেকরকম ব্যস্ততা। রোদেপোড়া মানুষগুলো কেউ নৌকা থেকে স্থলে নামিয়ে নিচ্ছে গভীর সমুদ্রের মাছ, আর কেউবা অতি হুড়াহুড়ির মধ্যে লঞ্চ বা বোটে তুলে দিচ্ছে টুরিস্টদের। এসব টুরিস্টরা টেকনাফ এসেছে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে যেতে। টেকনাফ এক কথায় বাংলাদেশের স্থল আর সেই স্বর্গীয় সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের সংযোগস্থলের কাজ করে।

নাফ নদী
নাফ নদী বাংলাদেশের সীমান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। মায়ানমারের সাথে সরাসরি সংযোগ থাকায় এই নদী ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক দিক দিয়ে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। টেকনাফ গেলে আপনার অবশ্যই নাফ নদীতে ঘুরে আসতে হবে। সমুদ্রের সাথে সরাসরি সংযোগ থাকায় এই নদীর পানি লবণাক্ত। ছোট ডিঙি নৌকায় বা বোটে করে ঘুরে বেড়ানো যাবে এই নদীতে। টেকনাফের নামকরণ এই নাফ নদী থেকেই হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের মাঝে পাড়ি দিতে আপনারা নাফ নদী থেকেই চলে যাবেন। নদীতে নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা পাবেন নানা জীবজন্তুর। তবে তার থেকেও বেশি চোখে পড়বে সেই নদীর মনভোলানো দৃশ্য। মানুষের চলাফেরা না থাকায় নাফ নদীর তীরে সকল প্রাকৃতিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে কোনো বাঁধা ছাড়া। স্থল-জল কিংবা বাতাস -- তিনের মধ্যেই যেন এক স্পর্শ করার মতো অভূতপূর্ব আবরণ রয়েছে এই নদীর চারদিকে।

মা-থিনের কূপ
টেকনাফ উপজেলার মাঝে আরেকটি স্থান আছে যার নাম মা-থিনের কূপ। মাঘ রাজার মেয়ের নাম ছিল মা-থিন। লোকে বলে বহুকাল আগে এই স্থানে মা-থিন পানি তুলতে এসে দেখা পেয়েছিল ধিরাজ নামের এক সুদর্শন পুলিশ অফিসারের। তারা দুজনে ভালোবেসে ফেলে একে অন্যকে। মাঘ রাজা নিজ মেয়েকে এক হিন্দু ছেলের সাথে বিয়ে দিতে প্রথমে রাজি না থাকলেও, পরবর্তীসময় মেয়ের আবদারে না করতে পারেনি। মা-থিন প্রস্তুত বিয়ের জন্য, তবে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ধিরাজের বাবা। মাঘ মেয়ের সাথে হিন্দু ছেলের বিয়ে কোনোভাবেই মানবে না উনি। ধিরাজ বাধ্য হয় কলাকাতা ফেরত যাওয়ার জন্য। আর মা-থিন অপেক্ষা করে ধিরাজের জন্য। সেই ধিরাজ আর ফেরেনি মা-থিনের কাছে। মনের দুঃখে, মা-থিন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই কূপের পাশে। টেকনাফের লোকমুখে এই কাহিনি শুনবেন সবসময়। সেই মা-থিনের কূপ আজও সংরক্ষিত আছে পরম যত্নে। টেকনাফ গেলে ভালোবাসার এই দৃশ্যমান স্থাপনা অবশ্যই দেখে আসবেন।

কীভাবে যাবেন
কক্সবাজার জেলাশহর থেকে রোমাঞ্চকর জিপ রাইড করে টেকনাফ যাওয়া যায়। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে নিজ গাড়িতে চেপেও যেতে পারবেন বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ উপজেলায়। টেকনাফ টু সেন্ট মার্টিন্স টুরিস্ট প্যাকেজ আছে বহু। একেবারে সব শেষ করে আসতে চাইলে সাশ্রয়ী এই ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। আগেই বলে দেই টেকনাফ ভ্রমণের আকর্ষণ অতুলনীয়। লং ড্রাইভে যাওয়ার আগে ক্যামেরা অবশ্যই নিয়ে নিবেন দৃশ্যগুলোকে ধারণ করে রাখার জন্য।

কি করবেন
টেকনাফের মূল আকর্ষণ নাফ নদী। দেখার মতো অনেক কিছু আছে। বিশ্রামের জন্য সরকারি বিশ্রামাগার কিংবা হোটেল-মোটেল বেছে নিতে পারেন। তাছাড়া উপজেলার মাঝেই আছে বার্মিজ পণ্যের বাজার। নদীর তীরে বসে দৃশ্য দেখতে দেখতে দিন কাটিয়ে দিতে পারবেন টেকনাফ গেলে।

কখন যাবেন
শীত মৌসুমে টেকনাফ গেলে ঝড় তুফানের সম্ভাবনা সবচাইতে কম। তাছাড়া সমুদ্রের পারে শীতের হাওয়া বেশ আরামদায়ক। শীতে গেলে আপনার লাভ আছে বটে, তবে অন্য মৌসুমেও টেকনাফের রূপের ঘাটতি হয় না। বছরের যেকোনো সময় পাড়ি জমাতে পারবেন সেখানে।

- কাজী মাহ্দী আমিন