বৃহস্পতিবার,১৫ নভেম্বর ২০১৮
হোম / খাবার-দাবার / পুরান ঢাকার প্রিয় চটপটি-ফুচকা
০১/২৩/২০১৮

পুরান ঢাকার প্রিয় চটপটি-ফুচকা

-

ঢাকার সর্বাধিক প্রিয় মুখরোচক খাবারের মধ্যে চটপটি-ফুচকা অন্যতম। জিভে জলআনা খাবারের মধ্যে চটপটি-ফুচকার চাইতে বোধকরি আর কিছু নেই।

শুধু ছোটরা না সব বয়েসী মানুষের পছন্দের তালিকাতে চটপটি-ফুচকা পছন্দের শীর্ষে। সাধারণত ঢাকায় ৬০ দশকের দিকে লোক সমাগম বেশি হতো এমন জায়গাগুলোতে চটপটি-ফুচকার দোকান দেখা যেত যেমন মাঠের পাশে, স্টেডিয়াম সংলগ্ন, স্কুলের গেট, পার্কের গেট ইত্যাদি স্থানে। বিকেল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত দূর-দূরান্ত থেকে সেই সমস্ত জায়গাগুলোতে চটপটি-ফুচকার স্বাদ নিতে নানা পেশার আর শ্রেণির মানুষ ছুটে আসতেন।

চটপটির প্রধান উপাদান মটরডাল যা সিদ্ধ করা হয়, সাথে কাবুলি, সিদ্ধ আলু কুচি, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, মরিচ, ডিম, তেঁতুল, লেবু ও নানা মশলার সংমিশ্রণ। আর ফুচকা তৈরিতে ময়দা, সুজি, তালমাখনা হচ্ছে প্রধান উপাদান। পাপড় সদৃশ গোলাকার মচমচে ফুচকাতে সিদ্ধ মটর, আলু, ডিম, মরিচ, ধনেপাতা, পেঁয়াজ ও মশলার সংমিশ্রণে পুরভরা হয় যাতে তেঁতুলের ও লেবুপানির টক দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই তেঁতুলের টক আলাদা গ্লাসে জিরা, বিটলবণ আর মশলার মিশ্রণে দেয়া হয় আরও স্বাদ বাড়াতে। উপমহাদেশের অনেক স্থানে ফুচকার নাম, আকার ও পরিবেশনের পার্থক্য থাকলেও আমাদের আদি ঢাকার চটপটি/ফুচকা এইভাবেই জনপ্রিয়। ফুচকাকে ভারতের অনেক স্থানে পানি পুরি, কেরালায় দই ফুচকা, গোলা গোপ্পা নানা নামে ডাকা হয়।

মটরডালের তৈরি ঘুগনি যা সিদ্ধ করে নরম মন্ড করে বিক্রি করা হয় তা ঢাকাতে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে রমজানে এটি ছাড়া পুরান ঢাকার আদি মানুষের প্রিয় মুড়িমাখা সুস্বাদু হয় না যেন। দ্রুত ও ঝটপট এই মুখরোচক খাবার প্রস্তুত করা যায় বলেই আদি থেকে এর চটপটি নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ঢাকার অন্যতম সেরা চটপটি-ফুচকার নাম বলতে গেলে প্রথমেই আরমানিটোলায় অবস্থিত বিখ্যাত তারা মসজিদের পাশে জুম্মন মামার দোকানের নাম আসবে। উনার এই চটপটি-ফুচকা বিক্রির ইতিহাস বেশ পুরোনো। নিজেদের ঘরে বানানো ফুচকায় তৈরি তাদের চমৎকার চটপটি-ফুচকার কোনো তুলনা নেই বললেই চলে। বিকেল থেকেই তার দোকানটির সামনে ভিড় লেগেই থাকে আর রাত অবধি চলে বিরামহীন চটপটি-ফুচকা বিক্রি। এই দোকানটির তৈরি আলুর চপও বেশ জনপ্রিয়। জুম্মন মামার চটপটি-ফুচকার পরিবেশনাও বেশ লোভনীয় আর মজাদার।

পুরান ঢাকাজুড়ে রয়েছে নানা জনপ্রিয় চটপটি-ফুচকার দোকান তন্মধ্যে গেন্ডারিয়া ধূপখোলা মাঠের বেশ কয়েকটি দোকান মাঠের প্রবেশদ্বার আলোকিত করে রাখে রাত পর্যন্ত। কয়েকটি দোকান পরপর ও পাশাপাশি থাকাতে আগত চটপটি-ফুচকাপ্রেমিরা বেছে নেন তাদের নিজস্ব দোকানটি। অদূরেই আছে মুরগিটোলা নূপুর জসিমের মজাদার চটপটি-ফুচকা আর আরো আছে একই স্থানে মসজিদসংলগ্ন শওকত মোল্লার চটপটি-ফুচকা। এই চটপটি একটু ব্যতিক্রম যাতে ঘুগনি আর ছোলার সমন্বয়ে ভিন্নতা আনা হয়েছে তার সাথে থাকে রান্না করা মজাদার আলু। দই ফুচকা আর ফাটাফাটি ফুচকা নামে তাদের চটপটি এলাকাতে বেশ জনপ্রিয়।

লক্ষ্মীবাজার থেকে সদরঘাট অনেক স্বনামধন্য স্কুল আর কলেজের জন্মস্থান আর পুরো এলাকা জুড়েই রয়েছে নানা মুখরোচক চটপটি আর ফুচকার দোকান। সোহরাওয়ার্দী কলেজের গেট, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল আর কবি নজরুল থেকে জগন্নাথ কলেজসংলগ্ন এলাকাতে রয়েছে অনেক পুরোনো চটপটির দোকান। নর্থব্রুক হল রোড আর বাংলাবাজারে বিকেল হলেই লাল-হলুদ কাপড় পেঁচানো গাড়িতে নির্ধারিত স্থানে হাজির হন প্রিয় চটপটির গাড়ি। চকবাজার মোড়ে চটপটি বেশ জনপ্রিয় আর চকবাজারের দোকানিরা সহ মালামাল খরিদ করতে আসা অনেক ক্রেতারা মজাদার চটপটি-ফুচকার স্বাদ নিতে কখনো ভোলেন না।

বর্তমানে মুখরোচক খাবারের মধ্যে চটপটির নাম আসবে প্রথমেই। কিন্তু এই লোভনীয় খাবার অনেক ক্ষেত্রেই শরীর খারাপের কারন হয়ে দাড়াতে পারে - বিশেষ করে পেটের অসুখ, যদি না সেটা যথাযথভাবে আর ভালো পরিবেশে প্রস্তুত না করা হয়। যেহেতু বড়রা ছাড়াও স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে চটপটি-ফুচকা বেশ জনপ্রিয় তাই স্বাস্থ্যগত কারণে অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রতিনিয়ত এই খাবার খেতে বারণ করেন। তবুও প্রিয় চটপটি-ফুচকার টানে মানুষ ছুটে যান আর সন্ধ্যে হলেই দেখা যায় ঢাকার অনেক গলির মাথা আর রাজপথে নির্দিষ্ট স্থানে চটপটিওয়ালা তার চাকার গাড়িতে আলো জ্বালিয়ে ব্যস্ত হাতে তুলে দিচ্ছেন ছোট টকভরা গ্লাসের সাথে প্রিয় চটপটি অথবা ফুচকা।

লেখাঃ মোহাম্মদ ওয়াসিম; ক্রিয়েটর ফেসবুক পেজঃ PURAN DHAKAR KHABAR
ছবিঃ মোহাম্মদ ওয়াসিম/ইন্টারনেট