শনিবার,১৭ নভেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / বছর জুড়ে অর্জনে নারীরা
০১/০২/২০১৮

বছর জুড়ে অর্জনে নারীরা

-

দেখতে দেখতে চলে গেল একটি আনন্দ ও গৌরবময় বছর। পাশাপাশি রেখে গিয়েছে অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি ও অলংকৃত করেছে আমাদের অর্জনের খাতাটি। আমাদের দেশের মেয়েদের অর্জন, তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো সত্যিই অনুপ্রেরণা এবং অহংকারের।

অনূর্ধ্ব-১৫ মেয়েদের সাফ জয়
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে একের পর এক সাফল্যের জোয়ার বয়ে আনছে দেশের মেয়েরা। তারই ধারাবাহিকতায় বছরের একেবারে শেষদিকে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ঘরে তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ফাইনালে শক্তিশালী ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেশের মানুষদের জন্য মুঠোভরা আনন্দ উপহার দেয় এই মেয়েরা।

প্রতিযোগিতায় দাপটের সাথে খেলেছে তারা, নামের পাশে ‘অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন’ কথাটা তারই পরিচায়ক। বিপক্ষ দলগুলোর উপর তারা এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে গুনে গুনে মোট ১৩ বার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে তারা। এই সাফল্যের মহার্ঘ্য আরো বেড়ে যাবে যখন জানবেন বিপরীতে একটি গোলও হজম করেনি বাংলাদেশ অ-১৫ নারী দল। প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত খেলা আঁখি খাতুন, শামসুন্নাহার, মনিকা চাকমা, ইয়াসমিন নীলা এবং মাহমুদা আক্তারদের হাত ধরে দেশের প্রমীলা ফুটবল যে অনেক দূর এগিয়ে যাবে তা নিয়ে এখন আপাদমস্তক নৈরাশ্যবাদীরও সন্দেহের অবকাশ নেই।

সায়মা ওয়াজেদ
২০১৭ সালের আরও একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র সায়মা ওয়াজেদ। এপ্রিল মাসে বিশ্ব অটিজম দিবসের ঠিক আগের দিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ‘অটিজম বিষয়ক চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি। সায়মা ওয়াজেদের আরও একটি পরিচয় দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে তিনি। বাংলাদেশ অটিজম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনেকদিন ধরেই কাজ করে আসছিলেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশে অটিজম মোকাবেলা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সূচনা ফাউন্দেশনের সভাপতি হিসেবে অনেকদিন ধরে কাজ করছেন সায়মা ওয়াজেদ। তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ২০১১ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অটিজম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুস্থিত হয়।

সোনিয়া বশির কবির
মেধা এবং পরিশ্রমের সমন্বয়ে যে কজন বাংলাদেশী নারী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত তার মধ্যে একজন সোনিয়া বশির কবির। টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাকে নিয়োজিত করেছে বেশ আগেই। চলতি বছর আরো তিনটি দেশ- নেপাল, ভুটান এবং লাওসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত হয়েছেন তিনি। নতুন দায়িত্বে সামনের দিনগুলোতে এই চারটি দেশে মাইক্রোসফটের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের কাজ করবেন তিনি এবং এই লক্ষ্যে যাবতীয় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়াটা তার উপরই নির্ভর করবে। মাইক্রোসফটে কাজের পাশাপাশি সোনিয়া বশির কবির জাতিসংঘের আওতাভুক্ত টেকনোলজি ব্যাংক ফর ডেভেলপড কান্ট্রিজ (এলডিসিএস)-এর গভর্নিং কাউন্সিল মেম্বার হিসেবে কাজ করে চলেছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলি সপ্তাহে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) সংক্রান্ত সেরা ১০ পথিকৃতের একজন হিসেবে ইউ এন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট সোনিয়া বশির কবিরকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রার পথে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করা এই নারী এ বছরও ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর এবং আগামী দিনগুলোতেও নিয়ে আসবেন নতুন পরিবর্তন।

মাহমুদাঃ নাসার নতুন নক্ষত্র
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা নাসা থেকে ‘ইনভেন্টর অফ দ্যা ইয়ার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন বাংলাদেশের মাহমুদা সুলতানা। ন্যানো মেটারিয়ালের ভূমিকা বৃদ্ধি করে মহাকাশে ব্যবহার উপযোগী অভিনব ডিটেক্টর যন্ত্রপাতির নির্মাণ কৌশল ও প্রয়োগ উদ্ভাবনের জন্য ২০১৭ সালে নাসার কনিষ্ঠ এই রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার আই আর ডি ‘ইনভেন্টর অফ দ্যা ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হন।

মাহমুদা বলেন, “গডার্ডে আসার পর কাউকে গ্রাফিন নিয়ে বাস্তবে কোনো কাজ করতে না দেখে আমার মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু নিত্যনতুন প্রয়োগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি মহাকাশে গ্রাফিনের সকল উপযোগিতা বের করতে চাইছিলাম।” বর্তমানে তিনি বিভিন্ন ন্যানোটেক কাউন্সিলে নাসার প্রতিনিধিত্ব করছেন।

দুঃসাহসিক নারী বৈমানিক নাইমা ও তামান্না
৭ বছর ধরে নানারকম প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও কঠিন পরিবেশের সাথে লড়াই করে বাংলাদেশের প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে যোগ দিয়েছেন দুজন নারী বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক ও তামান্না-ই-লুতফী। চলার পথের সমস্ত বাধাকে উপেক্ষা করে নারীদের প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। বুনেছেন সফলতার গল্প আর পাশাপাশি দেশের জন্য নিয়ে এসেছেন প্রশংসার ঝুলি।

দেশের দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকাতে বিমান উড্ডয়নের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন তারা। তাই কঙ্গোর দুর্গম এলাকা অথবা বৈরী পরিবেশ কোনটি নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না তারা। যে-কোনো প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করে তারা এটাই প্রমাণ করেছেন যে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ একজন নারীকেও পুরুষের মতো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অফিসাররা কঙ্গোতে সেবা দিচ্ছেন। এই ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে কাজ করে যাবেন বলে জানান এই দুই বৈমানিক।

শারমিনঃ একজন সাহসী মেয়ে
“বিয়ের ব্যাপারে শুরুতেই মাকে না করে দিই। কিন্তু মা কিছুতেই এটা মানেননি বরং চাপ প্রয়োগ করেছেন। শারীরিক নির্যাতন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করি আত্মহনন করে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত হবো। আবার ভাবি, এটাও হবে হেরে যাওয়া। “এভাবেই নিজের গল্প বলছিলেন ঝালকাঠির মেয়ে শারমিন। ২০১৫ সালে নবম শ্রেণি পড়ুয়া শারমিনকে বিয়ের আগেই জোরপূর্বক ছেলের সাথে একঘরে থাকতে বাধ্য করেন তার মা।

নানা বাধা-বিপত্তির পর ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট সহপাঠী নাদিয়ার সহযোগিতায় মা ও কথিত স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে শারমিন। শারমিনের এই অদম্য সাহসিকতার জন্য সাহসিকতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ (আইডব্লিউসি) ২০১৭’ পুরস্কার পেয়েছে শারমিন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০০৭ সাল থেকে সাহসিকতার জন্য নারীদের এই মর্যাদা দিয়ে আসছে। নতুন করে আবার জীবন শুরু করা শারমিনের লক্ষ্য দেশ থেকে বাল্যবিবাহ নামের বিষবৃক্ষের গোড়া সমূলে উৎখাত করা। এমন শারমিনদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, ভাল থাকবে এ দেশের নারীরা।

- রাজিয়া সুলতানা