বুধবার,২১ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / দুঃখভুক মৃত্যুময় দিন
১২/১৯/২০১৭

দুঃখভুক মৃত্যুময় দিন

- রুমা মোদক

দুঃখটা কেমন সাগরের গভীরতা নিয়ে টেনে নেয় আমাকে আরো গহিন খাদের মধ্যসমুদ্রে। বারান্দায় গড়াগড়ি যাওয়া ভাদ্রের খরখরে রোদটা জানালা টপকে ঘরে ঢুকে পড়ে, আক্রমণটা কেমন প্রথম মিলনের ব্যথাময় সুখ হয়ে উঠে আজ। এই বাড়ির সামনে জমে থাকা পুরানো বৃষ্টির একটুখানি জল, অগভীর অপ্রশস্ত জেনেও যাকে ট্রেনের জানালায় চকিতে দেখা অতল অথৈ দীঘি মনে হয়, দরজায় দাঁড়ানো শিউলিগাছের রৌদ্রধোয়া পাতাগুলোকে মনে হয় সদ্যস্নাতা নববধূ, সারা অঙ্গে জ্বলজ্বল করছে যার রাতের সোহাগ। আলমিরা খুঁজে হাতের লেখা নীল মলাটের কবিতা লেখার ডায়েরিটা খুঁজে নিই, দীর্ঘদিনের অব্যবহারে রংটা মলিন, ভাঁজে ভাঁজে জীর্ণতার ছাপ, ভ্যাপসা গন্ধ। তবু এটি পড়ব আবার আজ।

সুখের জীবনে ভীষণ অসুখী লাগতে থাকে নিজেকে। এই চাওয়ার চেয়েও বেশি পাওয়ার উপচেপড়া জীবনের ব্যাগ, ভিতরে ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংক লকারের রিসিট, এটিএম কার্ড সব কী যে অসহ্য লাগে আজ, কী যে অসহ্য, এই এমডিগিরি, স্টাফদের কারণ অকারণ ঘ্যানঘ্যান, সকাল-সন্ধ্যা এই বিত্ত-বৈভবের সংসারে ফেরা, ফিরোজের নিত্য মাতাল আর কৃত্রিম সোহাগ, সবকিছু নিয়ে জীবনটা আজ বড় অসহ্য হয়ে উঠে আমার কাছে। ছকে বাঁধা নিশ্চিত নিরাপত্তাময় জীবনের সহস্র দিনের আজ এই একটি দিন আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠে। আপাত দেখা এই সুখের জোয়ারে ভাসতে থাকা আমাকে ভূতে কিলাতে থাকে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।

হ্যাঁ আজ আমার একটা নিজস্ব আইডেন্টিটি রয়েছে, ফিরোজের করে দেয়া ব্যবস্থায় তার আইটি সেক্টরে বস আমি, আমার জীবনে একজন টাকার কুমীর ফিরোজ রয়েছে, রয়েছে রিয়া নামের আত্মজা আর একটা কারো খবর কেউ না রাখা টাকার পাহাড়ে সাজানো সংসার, যে গৎবাঁধা সংসারে প্রতিদিন আবার ফিরতে হয় আমার। ফিরি। অভ্যাসমতো ফিরি, নিয়মমতো ফিরি। শুধু একটা কবিতার ডায়েরি এই গৎবাঁধা জীবনটাকে এলোমেলো করে দেয় মাঝে মাঝে। এরপরের সমস্ত কিছু জানার আগে যে বিষয়টি জানা দরকার, সেটি হলো এই যে, আমি গড়পড়তা একটু সুন্দরী। গায়ের রং একেবারে যাকে বল দুধে-আলতায় না হলেও শ্যামলা নয়। তবে লম্বায় আশপাশের নারীদের চেয়ে ইঞ্চি কয়েক বেশি, বুকে পেটে কোমরে ইঞ্চির মাপও গড়পড়তার চেয়ে আকর্ষণীয়। দুয়ে মিলে ব্যাপারটা এমনই যে একশোজনের মাঝে দাঁড়ালে আমার দিকেই যাবে অনিচ্ছুক কিংবা ইচ্ছুক দৃষ্টি। এটিই তো যথেষ্ট আমার নিশ্চিত নির্ভার নির্ভাবনার তথাকথিত সম্পন্ন জীবন কাটানোর জন্যে অথচ কিনা এই উপচেপড়া প্রাচুর্যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি কবিতার ডায়েরি?

প্রকৃতিপ্রদত্ত এই সৌন্দর্য যে সংকট হয়ে উঠতে পারে, তা যখন আমি বুঝতে শিখেছি, তখনো আমি আমার সম্পদের মর্যাদা বুঝতে শিখিনি। কিন্তু সংকটটা বুঝলাম সেদিন, যেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসগর চাচার কোল থেকে আমাদের বারো এবং দশ বছরের দু’বোনকে কানে ধরে টেনে নিয়ে আব্বা পাশের ঘরে নামতা মুখস্থ করাতে বসালেন। তীব্র ঘুমের চাপ সামলে, মরণপণ কষ্টে চোখ খুলে আমরা দু বোন যতই নামতা মুখস্থ করি, ততই আব্বা পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা আম্মার হি হি হাসির রিনঝিন শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে পিঠে সপাং সপাং বেত মারেন। ভালো করে পড়। ভালো করে। এর চেয়ে ভালো আর কী করে পড়া যায়, যে এক ঘণ্টায় আমাদের সতেরোর ঘরের নামতা মুখস্থ হয়ে যায়, আমরা জানি না। কিন্তু জানি আসগর চাচার এলোমেলো হাতের গতি যে আমাদের শরীরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়, অসহ্য দুঃসহ লাগলেও আম্মার প্রশ্রয়ে আর চকলেট চিপসের লোভে আমরা রোজ তা সহ্য করে যাই, আজ আব্বার সপাং সপাং বেতের বাড়ি তা থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছে। আমাদের দু’বোনের অশ্রুর ফোঁটায় নামতা বইয়ের নিউজপ্রিন্ট ভিজে যায়, পাশের ঘরে আম্মার রিনিঝিনি হাসির আওয়াজ থামে না। আব্বার রাগ থমথমে লাল আগুনচোখা মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আমরা আব্বার অসহায়ত্ব টের পাই। সবরকম ব্যবসায় ফেল মেরে আমার আব্বা এখন আসগর চাচার টাকায় নতুন ব্যবসা খুলেছেন। টাকা চাচার, শ্রম আব্বার। লাভ অর্ধেক অর্ধেক। সেই লাভের অর্ধেক টাকার ভাগের সাথে আরো অনেক কিছুর ভাগকে জায়েজ করে নিবেন, আব্বা সেটা আগে বুঝেননি।

অসুখ নিয়ে অফিস যেতে বাধ সাধে ইচ্ছেরা। আজ মাসের এক তারিখ, স্টাফদের বেতন। হোক অসন্তোষ। ফুঁসুক জোয়ারের জল, আজ আমার কবিতায় ডুবে মরার দিন। মোবাইলগুলো বন্ধ করে দেই। ছুটি দিয়ে দেই ঝি-বাবুর্চিদের। ফিরোজ শুনে যতই রাগ করুক, কবিতাতেই ডুবে যাবো আজ, অথৈ ডুবে যাবো। যেভাবে ডুবতে চেয়েছিলাম সেই ভুল করার সুখের বেলায়। খুব প্রিয় খুব কাক্সিক্ষত ভুল করা একটি কবিতার ডায়েরিতে আজ নাক-মুখ ডুবিয়ে মরে থাকব আমি। অচেনা সুখে মরে থাকব, এই একঘেয়ে জীবনে বেঁচে উঠার জন্য মরে থাকব। আর সন্ধ্যায় ফিরোজের কাছে একগাদা মিথ্যে বলে ধরা খেয়ে নিরুপায় ভাগ্যহত কর্ণের মতো রথের চাকা দেবে যাবে। কোনো কারণ খুঁজে পাবো না দর্শানোর। বীর কর্ণের মতো মৃত্যুক আলিঙ্গন করব আমি।

আজ অফিস যাব না, টেবিলে খাবার দেব না। যা হবার হবে, কোন নিয়ম নেই আজ, আজ সব অনিয়ম, সব। অনিয়মটাই নিয়ম হোক আজ আমার জীবনে। হোক না। কেবল আজ, আজই কেবল। ভাদ্রের তালপাকা রোদ আছড়ে পড়ে চোখে মুখে আমি জানালা ধরে দাঁড়াই কবিতাটা আওড়ে আওড়ে, অসুখের কষ্টটা আবারো নড়ে চড়ে উঠে বুকের গহিনে, কী মধুর তার কষ্ট, কী আনন্দময় তার যন্ত্রণা, কী তীব্র তার স্মৃতি। জানালার নিচ দিয়ে ব্যস্ত শহর যায়, দূর থেকে দু’একটা রিকশার টুংটাং পাশ ঘেষে যেনো পিয়ানো বাজায় বনেদি সুরে, দোকানের সাটার খোলা শব্দটা বোধ হয় নূপুরের নিক্কন, গত জন্মে ফেলে আসা কোন নাচঘরে নর্তকীর। রাস্তার পাশে উবু হয়ে থাকা আবর্জনার পাহাড়টা আজ কেমন অনুশোচনায় নতজানু নিকটের গন্ধরাজের ঝোঁপের কাছে। ফুলে ফুলে সাদা গাছটা, সবুজ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে যেন আমার অসহ্য অসুখে।

জানালা থেকে সরে আসি লুকিং গ্লাসের সামনে, কতদিন দুবেণি বাঁধি না, অপ্রশস্ত ওড়নায় নারীচিহ্ন লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা কবেই মুক্তি দিয়েছে আমাকে! কোনো কিছুই হিসেব করতে হয় না আমার। কবে থেকে? হিসেবটা শেষ করার আগেই দেখি প্রথম যৌবনের কাঙ্ক্ষিত অসুখ হত্যা করে অনাকাঙ্ক্ষিত সুখ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ফিরোজ, বাহ, এভাবে তোমাকে দেখিনিতো কোনোদিন! তার মুখে ঝুলতে থাকে লাম্পট্যের গাম্ভীর্য...আর আমি দু-টনি এসি থেকে আসা হিমেল বাতাসে হারিয়ে যেতে থাকি বিশ বছর আগের মফস্বলের এক কলেজে। যেখানে আমার আরেকটা ঠিক জীবনের মতো জীবন ছিল। আম্মা-আব্বার তীব্র অশান্তিময় সংসারে তখন আমার এক টুকরো সুখ ছিল ভাড়া বাসাটির কলতলায়, টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি সংগ্রহের তাড়া আমাকে তাড়া করে ফিরত সারাদিন। সেখান থকে চোখে পড়ে যে নিপাট ভালোছেলেটির দৃষ্টি, সে দৃষ্টি আমায় সারারাত ঘুমাতে দেয় না। বাড়ির মালিকের কাজের বুয়ার ছেলে সে, পিতৃহীন অনাথ। নেহাৎ মেধাবী বলে দয়া করে স্কুল কলেজ পাঠানো ছেলে সে। নইলে বাজার করা, দরকার মতো নুন-তেল কিনে আনাই নির্ধারিত দায়িত্ব তার। তেল চপচপে চুলে, পেটের উপর বেল্ট লাগিয়ে প্যান্ট পরে সাইকেল চালিয়ে কলেজ যাবার মধ্যে এমন কী যে ছিল আমার মতো সুন্দরী মেয়ে তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলাম সাঁতার না-জানা আনাড়ির মতো। সৌন্দর্যের খ্যাতিতে আমাকে যখন ঘরে রাখাই দায়। দিনে গণ্ডাখানেক বিয়ার প্রস্তাব আসে আর আমার আম্মা আমাকে আরো ভালোর নিলামে তুলে দিয়ে ঠোঁট বেকিয়ে ঘরে চলে যান। আর সেই সুযোগেই আমি একদিন ঢুকে যাই সেই আশ্রিত ছেলেটির ঘরে। কবিতা লিখে সে- ‘কবিতার দুটি লাইনের মধ্যে এতটুকু শূন্যস্থান রাখতে হয় যেন তার মধ্যে একটা সূর্য উঠতে পারে’। বাহানা কবিতা শোনার, আমি মুগ্ধ শ্রোতা তার। অনুরক্ত তার মুক্তার মতো হস্তাক্ষরের। কিন্তু সেদিন ঘরে ঢুকতেই ছিটকিনি তুলে দেয় সে, জাপটে ধরে আমাকে, তখনই হঠাৎ চরাচর অন্ধকার করে লোডশেডিং নামে, উন্মাদ চুম্বনে চুম্বনে আমাকে বিধ্বস্ত করে দেয়। তার প্রথম চুম্বনে আমি একজন পুরুষের স্পর্শ পেয়েছি, সেদিন আমার সমস্ত নারীত্বজুড়ে। আমি সেদিন প্রথম শিহরণে নারী হয়ে উঠা বুঝতে পেরেছি। তারপর থেকে কী যে হয়, উন্মাদপ্রায় অবস্থা আমার... রাতে ঘুম আসে না, ঐ বাড়ির বারান্দায় আর কারো ছায়া দেখলে মনে হয় সে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো যে কোনো ছেলের দিকে তাকালে মনে হয় সে...আমার বুক কাঁপতে থাকে সারাবেলা আবার ঝাঁপ দিতে সেই ঔষ্ঠ্যের আগুনে। কী হলো তোমার, ফিরোজের দমবন্ধ আলিঙ্গনে আগুনের নদীতে পুড়ে যাওয়ার লোভ থেকে সামলে নেই নিজেকে। হৃদয়ের গহিন থেকে কবিতার ডায়েরিটি মরে যাওয়ার ডাক দেয় আমাকে। আমি তৈরি হই। তীব্র আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠি। আপাতত উজাড় করে দেই ফিরোজকে।

২.
মনোয়ার এসি চালিয়ে জানালার ঝালর উঠিয়ে দিলে ব্যস্ত দিন শুরু হয়। আমি শেষবারের মতো আইপ্যাড অন করে এপয়নমেন্ট শিডিউল চেক করে নিই। চায়ের কাপটা টান দিতে দিতে শুনতে পাই পরিচিত কণ্ঠ। কী ম্যাডাম কেমন আছেন? চোখ তুলে দেখি এনায়েত করিম, ফিরোজের সব সম্ভবের জাদুকর। নগদ-তরল থেকে থানা-পুলিশ, তুড়ি মেরে সেরে দেয় সে। জানতে চায় কেমন আছি, উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করি না, মুচকি হাসি। বুঝতে পারি আমার উত্তর দেয়া না দেয়ায় কিছু যায় আসে না। সে আসবে বসবে, আমাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে, থাইল্যান্ড ব্যাংকক যাবার ইশারা দেবে, বাসায় গিয়ে বললে ফিরোজ মুচকি হাসবে। মেনে নেয়া সব অভ্যাস-সয়ে যাওয়া অভব্যতা আজ কেমন রোষে কামড়ে ধরে, অভব্য হয়ে যাই আমি। এনায়েত করিম সামনে এসে বসলে কোনো ভনিতা ছাড়াই বলি- আপনি আমার অফিসে আর আসবেন না। এনায়েত করিম চুপসে যায় জন্মদিনের বাসি বেলুনের মতো। প্রেমালাপ আশা না করলেও সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না আমার এই কথার জন্য, তার এই অপ্রস্তুত চুপসে যাওয়া এক অপার্থিব শান্তি এনে দেয় আমার মনে। তার ফিরে যাবার ছায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসি, মনে মনে বলি, কত আর নকল এ যাপন জীবনের? ভিতরে কবিতা রেখে পার্থিব বিত্ত-বৈভবে মুখ গুঁজে থাকা! মোবাইলটা হাতে নিই, ফিরোজকে একটা ফোন করা দরকার। ঘটনাটা ওকে বলে রাখি। থতমত খেয়ে তোতলাতে থাকে ফিরোজ। আমার ভিতরটা কেমন হালকা লাগে ঠিকানাহীন ওড়ে যাওয়া পালকের মতো। এসির ঠান্ডা বাতাসের সাথে মিষ্টি এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ স্বস্তির তৃপ্তি নিয়ে জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। সাহসী হচ্ছি আমি, হোকনা অবেলায়, তবু প্রায়শ্চিত্ত করি আমি। আমার আকাক্সিক্ষত জীবনে ফিরি।

মচমচ আওয়াজ তুলে নিজের অশালীন উপস্থিতি জানান দেয় ফিরোজ। দরজা লক করে একনাগাড়ে উগড়ে দিতে থাকে হাভাতে ছাউনি থেকে আমাকে তুলে আনার পুনঃপুন আওড়ানো ইতিহাসসহ এনায়েত করিমকে অপমান করার ফলে তার কী কী ক্ষতি হতে পারে সবিস্তার ইতিবৃত্ত। ফিরোজের কথার ঢাল বেয়ে নামা তীব্র স্রোতের তোড়ে আমি আবার হারিয়ে যাই অতীতে, এই দুঃসহ বর্তমান থেকে বিচ্যুত হয়ে, বাহারি আলোর ঔজ্জ্বল্য থেকে ফিলিপস বাতির নীচে।

বাড়িওয়ালার মূল বাড়ির বাইরের দিকে ফেলে রাখা ফেলনা ঘরটির আধোয়া গন্ধময় বিছানায় বসে বসে কবিতা শুনি আমি, আমার কোলে মাথা রেখে পড়ে যায় আশ্রিত পুরুষ ‘কেননা মানুষ জীবনভর নিজের লাশের পেছনে দৌড়ায়, সে লাশের যত কাছে যায়, লাশ তত দূরে সরে যায়/ লোকটা তাও দৌড়াতে থাকে’। যদিও আমার জানা ছিল যতক্ষণ আসগর চাচা ঘরে থাকবেন না, মা আমায় খুঁজবেন না, আর বাবাও ইদানীং অজানা কারণে গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন, তবুও সেদিন মা হঠাৎ দরজায় নড়বড়ে খিল ভেঙে আশ্রিত পুরুষটিকে আমার কোলে নিশ্চিত আশ্রয়ে শায়িত দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন। চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে সে রাতে ঘরে নেন বটে, কিন্তু সাতটি রাত পার করেন না। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদের সাথে কাবিন করিয়ে দেয়। কোটি টাকার সম্পদ যার, তার বয়স দ্বিগুণ হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় কোনো শত্রুও সেদিন তা বলতে আসেনি। স্বামীর বাড়ি থেকে দেওয়া গা ভর্তি অলংকার দেখে অতিথি অভ্যাগত সবার বরং চোখ টাটিয়েছে। মায়ের টনটনে হিসেব বড় বেশি অভ্রান্ত হয়ে অতঃপর দেখা দিয়েছে আমার জীবনে। হ্যাঁ বাইরে থেকে যতটা দেখে সমাজ-সংসার।

কিন্তু মায়ের মতোই পুনরাবৃত্ত জীবনে আমি কাকে বলি এ অসুখের কথা! কেন শুনবে এই এ নিয়মের পৃথিবী আমার অনিয়মের অসুস্থতা, কবিতার সাথে আমার বাস! সুখে থাকতে ভূতে কিলানোর এ অসুখ বড়োই মূল্যহীন তাদের কাছে! ফিরোজ গর্জাতে থাকে। আর সে বর্বর গর্জনে বেরিয়ে আসতে থাকে আমার মা সহ আমারো অতীতের কাসুন্দি। বেশ্যার ঘরে বেশ্যাই হয়। বেশ্যাদের আবার সতীপনা-ফিরোজের আক্রমণ হিংস্র করে আমাকে হঠাৎ, তীব্র ক্ষেপে উঠি, টেবিল থেকে ছুঁড়ে মারি পানির গ্লাস-বোতল, পুরো অফিস কাঁপিয়ে ঝনঝন শব্দে টুকরোগুলো অসহায় ছড়িয়ে যায় ঘরময়, আমি চিৎকার করে বলি, আমি আর তোমার ঘর করব না। গেট আউট। ফিরোজ দরজার লক বন্ধ করে টিপে ধরে প্রথমে আমার মুখ, তারপর গলা- চুপ, চুপ, আস্তে, আস্তে সারা অফিস শুনিয়ো না যে তুমি একটা বেশ্যা! আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার জিব বের হয়ে আসতে থাকে। শুনেছি বাড়িওয়ালার আশ্রিত পুরুষটিকে যখন ফ্যানে ঝুলন্ত দড়ি কেটে নামানো হয় তখনো তার জিবটা বেরিয়েছিল সামনের দিকে, চোখ দুটো বিস্ফোরিত। বিস্ফোরিত হতে থাকে আমার চোখও। নিশ্বাস নিতে পারি না। আমি বুঝতে পারি না আমি কি মরে যাচ্ছি? অস্থির হাত পা দাপানো বন্ধ করে আমি ভাবি, আমি কি আমার কবিতার কাছে যাচ্ছি??

[কবিতাংশগুলো কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা থেকে নেয়া।]