শনিবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / বিনোদন / হালদানদী পাড়ের মানুষের গল্প
১২/১৮/২০১৭

হালদানদী পাড়ের মানুষের গল্প

-

একটি নদীর বোবা কান্না আর তার দুই পাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখের অনুভূতি নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘হালদা’। প্রতীক্ষিত আর আলোচিত এ ছবিটি গত ১লা ডিসেম্বর সারাদেশে মুক্তি পেল। ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে ‘হালদা’।

এক কথায় ‘হালদা’ হলো নদী আর তার পাড়ের মানুষদের জীবনের উপাখ্যান। গতানুগতিক সিনেমার ভিড়ে ‘হালদা’ এক সম্ভাবনা আর আশার নাম। মৌলিক স্টোরি, অনন্য সিনেমাটোগ্রাফী আর সূক্ষ্ম অনূভুতির অসাধারণ প্রকাশ- সব মিলিয়ে হালদা যেন একটি চলচ্চিত্রের চেয়েও বেশি কিছু। দক্ষ হাতের শিল্পিত চিত্রায়নে তৌকির আহমেদ আরও একবার বাজিমাত করলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বদনাতলী পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া ৮১ কি.মি. লম্বা হালদা নদী চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি জনপদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে পরেছে। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র বিশুদ্ধ কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বলে সমাদৃত হালদায় মা মাছের ডিম সংগ্রহ করে জেলেদের বছরের একটি লম্বা সময়ের জীবিকা নির্বাহ হয়। কিন্তু দূষণ আর দখলদারদের করাল থাবায় হালদা আজ মৃতপ্রায়- এমন বার্তার মাধ্যমেই শুরু হয় হালদা কাহিনি।

হালদাপাড়ের একজন জেলে মনু মিয়া (ফজলুর রহমান বাবু)। প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ শিকার নিষিদ্ধ হওয়ায় সে মহাজনের কাছে ঋণ করে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমায় মাছ শিকারে। মাঝসমুদ্রে তার দল ডাকাতের কবলে পড়ে, অনেকেই নিহত হলেও মনু মিয়ার দলের এক সদস্য বদির (মোশাররফ করিম) সাহসিকতায় তারা দুজন প্রাণে বেঁচে ফিরে। মা-বাবা, ঠিকানাহীন বদির প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনু মিয়ার পরিবার বদিকে তাদের ঘরেই স্থান দেয়। এদিকে মনু মিয়ার একমাত্র মেয়ে হাসুর (নুসরাত ইমরোজ তিশা) সাথে বদির মন দেয়ানেয়া ঘটে যায়, শুরু হয় অপূর্ব এক ভালোবাসার গল্প।

এদিকে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও মনু মিয়া পড়ে কঠিন বিপদে। ঋণ আর ট্রলারের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করার জন্য মহাজন তাকে একমাস সময় বেঁধে দেয়। এমন সময় সে হাসুর বিয়ে এলাকার প্রভাবশালী নাদের চৌধুরীর সাথে দিয়ে ঋণমুক্তির প্রস্তাব পায়। ভালোবাসার গল্পটি বাঁক নেয় নতুন দিকে। শেষমেশ হাসু আর বদির ভালোবাসার গল্পের কী ঘটে তা জানতে ছবিটি না দেখলেই নয়।

এসব প্রান্তিক মানুষের জীবন ও তাদের মধ্যে ভালোবাসার অনুভূতির এক অপূর্ব চিত্রায়ন তৌকির আহমেদ ফুটিয়ে তুলেছেন এই ছবিতে। মূলত ‘হালদা’ হলো বৈচিত্র্যময় অনুভূতির স্রোতের এক জীবনকাহিনি। চরিত্রের বৈপরীত্য, ছোট ছোট অনূভুতিগুলোর সূক্ষ্ম চিত্রায়ন, সম্পর্কের টানাপড়েন সবকিছুই দক্ষ হাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ কিন্তু জোরালো অনেক ডায়লগের ব্যবহার এই চলচ্চিত্রকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। চলচ্চিত্রে একদিকে যেমন হালদা পাড়ের মানুষের অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তেমনি এদেশের নারীদের চিরাচরিত দুর্ভাগ্য আর দুর্দশাকেও ফোকাস করা হয়েছে।

‘হালদার’ সিনেমাটোগ্রাফীতে তাহির আহমেদ ও এনামুল হক ক্যামেরার অসাধারণ কারসাজি দেখিয়েছেন। হালদার প্রকৃতির অপূর্ব রূপ আর ঘটনার সাথে এর সামঞ্জস্যতা খুব সহজেই চোখে পড়বে। ভারি বর্ষণের সময় বিদ্যুৎ চমকানোর মুহূর্তেই ডায়লগের টেক নেয়া আর সাথে সাসপেন্স আর ইমোশনের সফল মিশ্রণ সবই দক্ষ কাজের প্রমাণ রাখে।

তবে পরিচালকের সাথে মুনশিয়ানায় সমানে সমান টক্কর দিয়েছেন যিনি, তিনি হলেন এই সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টর পিন্টু ঘোষ। হালদার গান আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যাপারে যতই বলা হোক কম হয়ে যাবে। একদিকে ‘গাউসুল আজম বাবা’র মতো আধ্যাত্মিক গান অন্যদিকে ‘গমগম লার’, ‘নোনাজল’, প্রেমের আগুনে’র মতো মনে গভীর আলোড়ন তোলার মতো গান-কী নেই ‘হালদা’র গানগুলোতে? গানের কথা, মিউজিক আর সুর আপনাকে মোহিত করবেই।

“তুমি যতদূরে যাও, তবু তুমি না হারাও
তিয়াস লাগার মতোই তুমি রয়ে যাও,
প্রেমের আগুনে কি তুমিও পুড়াও?”
সাধারণ কথায় ভালোবাসার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ হয়তো একেই বলে।

পরিচালক তৌকির আহমেদের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো দুটি-
১। হালদার জেলেদের জীবনযাপনকে সফলভাবে তুলে ধরা;
২। সিনেমার মাধ্যমে হালদার দূষণের বিরুদ্ধে দেয়া প্রতিবাদী বার্তা।

এই সিনেমাতে একঝাঁক শক্তিশালী অভিনেতা অভিনয় করেছেন, তারা কেউই নিরাশ করেননি। তিশা আর জাহিদ হাসানের অভিনয় আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। স্ট্রং ফিমেল লিডের যে খরা বাংলা সিনেমায় দেখা যায় তা তিশা ঘুচিয়েছেন। সিনেমার লোকেশন সিলেকশনও ভালো। গুলিয়াখালি সি-বীচের মতো অসাধারণ সব স্পট পরিচালক ব্যবহার করেছেন।

সিনেমাটিতে দুর্বল কিছু দিক রয়েছে, তবে তা সামান্যই। পুরো সিনেমাটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বানানো বলে অনেকেরই বুঝতে অসুবিধা হতে পারে, যদিও বাস্তব রূপ দিতে এর প্রয়োজন ছিল। আরেকটি বিষয় হলো সিনেমার এন্ডিং। সিনেমার এক পর্যায়ে এসে দর্শক সহজেই এন্ডিং বুঝে ফেলবেন, এক্ষেত্রে আরো ভিন্নতার সুযোগ ছিল।

প্রকৃতির অপূর্ব রূপ, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আর সাথে অনুভুতির হাজারো বৈচিত্র্যময় স্রোত- সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন মনে দাগ কাটার মতো এই সিনেমাটি উপভোগ করতে প্রিয়জনদের নিয়ে চলে যান নিকটস্থ কোনো সিনেমা হলে।

- তানভীর জাহান